১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রবাসী জীবন ॥ মনে পড়ে বাংলাদেশ

  • বাঙালী থাকতে খাদ্য তালিকায় টাকি মাছের ভর্তা আর ডাল

সাত সাগর আর তের নদীর পাড়ে স্বপ্নে দেখা রাজকন্যাকে দেখতে ময়ূরপঙ্খী ভিড়িয়ে দেয়ার দিন ফুরিয়েছে। যা পাড়ি দেয়া ছিল কল্পনায় তা এখন অনেক কাছে। আজকের ইংল্যান্ডকে (যার পরিচিতি ওই দেশের রাজধানী লন্ডন নামে) বলা হতো বিলাত। লন্ডন থেকে কেউ দেশে ফিরলে তিনি বিলাত ফেরত। ওই বিলাত যেতে সময় লাগতো প্রায় তিন মাস। আর আমেরিকা! সে তো মহা স্বপ্নের দেশ। গত শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে আমেরিকা লন্ডনের নাম শুনলে তা যেন ছিল আরেক পৃথিবী। ওই সময়ে যে পরিবারের সদস্য বিলাত যেতে পারতেন সেই পরিবার ছিল সমাজে অতি উন্নত। বলা হতো বংশীয় ও বনেদি পরিবার। ৭০-৮০ দশকে তৎকালীন টেলিগ্রাফ এ্যান্ড টেলিফোন (টিএ্যান্ডটি) বোর্ড বর্তমানে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) পাবলিক কল অফিসে বিদেশে কথা বলার লাইন দেখে ধারণা করা যেত অনেকের আত্মীয়-স্বজন বিদেশ বিভূঁইয়ে আছে। বনেদি পরিবারের পাশাপাশি শিক্ষিত উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লেখাপড়ার জন্য এবং বড় চাকরির সুবাদে বিদেশে পাড়ি জমাতেন। শিক্ষার ক্ষেত্রে স্কলারশিপ (বৃত্তি) ছিল মুখ্য। ৮০ দশকের মধ্যভাগে মধ্যপ্রাচ্য, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে শ্রমিক নেয়া শুরু হলে দেশজুড়ে হৈচৈ পড়ে যায়। আরব দেশগুলোর মধ্যে দুবাইয়ের নাম এত বেশি উচ্চারিত হয় যে মানুষের মুখে মুখে ফেরে। টেলিভিশন একটি নাটকের সংলাপও জনপ্রিয়তা পায় ‘মামু ট্যাকা দেন দুবাই যামু’। এর মধ্যেই আসে আরেক স্বপ্নের হাতছানি আমেরিকার ডাইভারসিটি ভিসা (ডিভি) লটারি। এ যেন সোনার হরিণ পাওয়ার অপূর্ব সুযোগ। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এই ডিভি লটারি আবেদনের জন্য মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। দেড় ইঞ্চি বাই দেড় ইঞ্চি ছবি (ডিভি ফর্মে এই মাপের ছবি লাগত) তোলার জন্য ফটো স্টুডিওর সামনে লাইন ধরে থাকে মানুষ। স্বপ্নের দেশ আমেরকিা যাওয়ার কী জোশ...। টানা কয়েক বছর (ডিভি-১ থেকে ডিভি-৫ লটারি পর্যন্ত) হিড়িক চলে। এরপর আমেরিকা গমন আর সহজ হয় না। ইউরোপের দেশগুলোতে যাওয়া আগে থেকেই কঠিন ছিল (এখনও আছে)। কেবল আরব দেশে গমন যে পর্যায়ে ছিল তাই আছে। বিশেষ করে সৌদি আরব কাতার দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই এখন শ্রমিক নিচ্ছে। হালে এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মালয়েশিয়া। সিঙ্গাপুর থাইল্যান্ড কোরিয়া জাপান অস্ট্রেলিয়া সুইডেনসহ দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপের অনেক দেশেই বাঙালীদের বসবাস। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বাংলা ভাষাভাষীরা এখন অনেক দেশেই বড় অবস্থান করে নিয়েছে। অনেক বাংলাদেশী ইউরোপ আমেরিকায় দক্ষতা দেখিয়ে সুনাম অর্জন করেছে। বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার রানীরপাড়া গ্রামের রাফেউল আলম এমডি পিএইচডি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেকসাসের ন্যাশনাল জুইস হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন ও গবেষণা করছেন। তিনি এ্যালার্জির ওপর গবেষণা করে মার্কিন সরকারের পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি বিয়ে করেছেন পোল্যান্ডের মেয়েকে। তাদের দুই সন্তান। ঢাকার মোহাম্মদপুর শেখেরটেক পিসিকালচার হাউজিং সোসাইটির তরুণ রুবাইয়াৎ হাসান তমাল বেসরকারী এয়ারলাইন্স নভো এয়ারের ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। তাদের গ্রামের বাড়ি বগুড়ার সারিয়াকান্দি। বিয়ে করেন দিনাজপুরের মেয়ে ইয়াসমিন জেরিন দীপাকে। বছর দুয়েক আগে এই দম্পতি নিজেদের যোগ্যতায় পাড়ি দিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। প্রবাস থেকে জানালেন, তাদের জীবন কাটছে সুন্দর। টেকসাসের এক শহরে থাকেন। নির্ধারিত সময়ে চাকরির পর এ্যাপার্টমেন্টে ফিরে সময় হলে স্কাইপিতে ঢাকায় মা নাজরিন বাবা আবদুস সালাম ও বড়ভাই তানভীর ভাবি টপির সঙ্গে কথা বলেন। তার খালাতো বোন নওরীন ঢাকায় শেখেরটেকে তাদেরই বাসায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। তার সঙ্গে কথা বলে সকলের খোঁজখবর নেন। প্রবাসে নিজেদেরও খবর দেন। ঈদের দিনে তমাল যা জানাল তা হলো- আমাদের দেশে যখন ঈদের সকাল তখন টেকসাসে ঈদের দিন শেষ হয়ে রাত পড়েছে। ঈদের সেমাই তারাও খেয়েছে। অতিথি আপ্যায়নও করেছে। প্রবাস জীবনে প্রথম খুশির খবর জানালÑ মাস কয়েক পরই তাদের ঘরে নতুন অতিথি আসছে। যে জন্মেই দেখবে বিদেশ পাবে মার্কিন নাগরিকত্ব। তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তির এই যুগে দূর এখন কত কাছে। কাছে দূরের সেই দেশে দীর্ঘদিনের প্রবাসী এক বয়স্ক বাঙালীর সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়ে মমত্বে আত্মীয়ের বন্ধন গড়ে নিয়েছেন। তার মাধ্যমে এই দম্পতি নতুন গাড়ি কিনেছে। বিদেশ বিভূঁইয়ে কত অচেনা চেনা হয়ে গভীর মমত্বে গেথে যায়। বিপদে-আপদে তারাই সেখানে হয় আপন। বগুড়ার সারিয়াকান্দির নিজবলাইল গ্রামের তরুণ রাহাতিন হাসান তানজিন বছর পাঁচেক আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গেছে। বিয়ে-থা করেনি এখনও। বগুড়ার সেউজগাড়ির মেয়ে নিলুফার পান্না মিতা জুলজির জেনেটিকস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এমফিল করে প্রথমে জাপান ও পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান। প্রায় দেড়যুগ ধরে মার্কিন প্রবাসী। তার স্বামী ড. মোফাজ্জল হোসেন এইডস বিষয়ে গবেষণা করছেন। তাদের চার ছেলেমেয়ে। নিউইয়র্ক প্রবাসী নিলুফার পান্না মিতার কথা- এত বছর বিদেশে আছেন তবু মন টানে না। বার বার ছুটে যেতে ইচ্ছে করে বাংলাদেশে। সুযোগ পেলেই তিনি দেশে আসেন কাউকে না জানিয়ে। সবাই তাকে দেখে অবাক হয়। এভাবেই সে দেশকে ভালবাসার সুখ খুঁজে নিয়েছে। বগুড়ার ছেলে ডাঃ সুপ্রিয় রায়। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাস করে সাইকোলজিস্ট হয়েছেন। দেশে থেকেই অনলাইনে বিদেশে লেখাপড়া করে পরীক্ষা দিয়ে কৃতকার্য হলে লন্ডনে যান। লন্ডনের বড় হাসপাতালে তার চাকরি জোটে। কয়েকদিনের জন্য দেশে ফিরে প্রণয়ের মানুষকে পরিণয়ে বেঁধে উড়াল দেন লন্ডনে। সাত বছর ধরে সেখানে আছেন। পরিবারের সদস্য দুই থেকে চার হয়েছে।

ঢাকার মেয়ে সাদিয়া ও তানিয়া। এরাও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গেছে লেখাপড়ার জন্য। তাদের কথা, বিদেশে লেখাপড়ার পাশাপাশি নিজেকে গড়ে নেয়ার চেষ্টা করবে। স্কাইপিতে কথা বলে জানা গেলÑ যারা বিদেশে গেছে তারা বাঙালী লাইফ স্টাইল পাল্টায়নি। এই বিষয়ে রুবাইয়াৎ হাসান তমালের কথা- নিজের দেশে বাংলাদেশীরা যতটা দেশপ্রেমিক বিদেশে গিয়ে তারচেয়ে বেশি হয়ে যায়। তখন অনুভব করা যায় দেশের প্রতি মমত্ববোধ। হয়ত প্রয়োজনে তারা সেই দেশের সিটিজেনশিপ নেয় তবে কখনও ভুলে যায় না তারা বাংলাদেশী নয়। এমন কি সেই দেশের ফিউডাল লাইফ স্টাইলও তারা গ্রহণ করতে পারে না। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, বাঙালীর খাদ্য তালিকায় দেশে যে মেন্যু বিদেশে (আমেরিকা) তার সবই পাওয়া যায়। কেউ যদি মনে করে শাক দিয়ে চর্চরি ও টাকি মাছের ভর্তা খাবে তাও পাবে। বাঙালীর চিরচেনা ডাল বাদ যায় না। দুটো ডালভাত খেয়ে যাওয়ার কথা হয়ত কেউ বলে না, তবে ডালভাত যে সবাই খায় তা লুকানো হয় না। বাঙালী খাবারের আর সব তো আছেই। দূর এখন কত কাছে।

Ñসমুদ্র হক, বগুড়া থেকে