১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাংলাদেশের ক্রিকেট সাফল্যে পাক-গাত্রদাহ

  • মানস ঘোষ

বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলোয়াড়রা বাঘের বাচ্চার মতো খেলে নিজেদের দেশকে যেভাবে সংবাদের শিরোনামে তুলে এনেছে, তা অনেক ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার রেকর্ডকেও ম্লান করে দিয়েছে। মাত্র ১৬ বছর আন্তর্জাতিক স্তরে ক্রিকেট খেলে ওপার বাংলার ছেলেরা যে কৃতিত্ব অর্জন করেছে তা রীতিমতো ঈর্ষণীয়। পশ্চিম পাকিস্তানের মতো ক্রিকেট খেলা কোনকালেই ওপার বাংলায় জনপ্রিয় ছিল না। পশ্চিম পাকিস্তানের মহম্মদ নিসার, আবদুল হাফিজ কারদার বা হানিফ মহম্মদ বা এপার বাংলার স্যুটে ব্যানার্জী, কিংবা পঙ্কজ রায়ের মতো প্রতিভার আবির্ভাব ওপার বাংলায় ঘটেনি। এই রকম প্রতিকূল পরিবেশেও ওপার বাংলার বাঙালীরা যেভাবে ক্রিকেটের চর্চায় মেতে উঠেছে, তা এপার বাংলার কাছে শিক্ষণীয়।

বাংলাদেশ ক্রিকেট দল দক্ষিণ আফ্রিকার মতো এক অগ্রণী ক্রিকেট খেলিয়ে দেশকে যেভাবে হেলায় ২-১ ম্যাচে একদিনের খেলায় পরাজিত করল, তা থেকে পরিষ্কার বাংলাদেশ ক্রিকেট খেলায় আর ফেলনা দেশ নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে একদিনের সিরিজ জিতে বাংলাদেশ প্রমাণ করল ভারতের বিরুদ্ধে ২-১ ম্যাচে জেতাটা কোন আকস্মিক ব্যাপার বা ফ্লুক ছিল না। আর পাকিস্তানে যারা বাংলাদেশের কাছে ভারতের হারকে ‘গট আপ’ বলে চালাতে চাইছিলেন, তাদের মুখে বাংলাদেশের দামাল ছেলেরা রীতিমতো ঝামা ঘষে দিয়েছে। কারণ, পাকিস্তানের পত্র-পত্রিকায় এমন হাস্যকর কথাও লেখা হয়েছে যে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার ঢাকা সফরের পর দেশে ফিরে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডকে নাকি নিদান দেন, বাংলাদেশ সফরের সময় বিরাট কোহলির দল যেন বাংলাদেশের কাছে হেরে ফেরে। যাতে পাকিস্তান আইসিসির চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে খেলতে না পারে। পাক মিডিয়ার এও দাবি, মোদি নাকি ঢাকায় থাকাকালীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এই ধরনের আশ্বাস দিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আরও উন্নত করা।

কারণ, মেলবোর্নে বিশ্বকাপ ম্যাচে বাংলাদেশ বিদেশী আম্পায়ারদের পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্তের জন্য ভারতের কাছে হেরেছে বলে বাংলাদেশে একটা ধারণা গড়ে ওঠে এবং তা নিয়ে ভারতবিরোধী প্রচারও তুঙ্গে ওঠে। এমনকি শাসক দলের এক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীও ওই ভারতবিরোধী প্রচারে গা ভাসান। এমনকি তিনি বিবৃতি দিয়ে বলেন, বাংলাদেশকে জোর করে হারানো হয়েছে। আইসিসিতে ভারতের দাদাগিরির ফলে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার কোন সুযোগ ছিল না বলে এটা সে দেশের ধারণা। এ কারণে বাংলাদেশে, বিশেষ করে যুবকদের মধ্যে তৈরি হওয়া ভারতবিরোধী মনোভাব দূর করার জন্য ভারত বাংলাদেশের কাছে ইচ্ছা করে হারে, পাকিস্তানী মিডিয়ার এটাই ছিল বার্তা।

পাকিস্তানী মিডিয়ায় বাংলাদেশ-পাকিস্তান ও বাংলাদেশ-ভারতের ম্যাচের ফলাফল নিয়ে যেসব খবর ও টিকাটিপ্পনী প্রকাশিত হয়েছে, তাতে পাকিস্তানী বিরূপ মনোভাবের প্রতিচ্ছবি সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশের ছেলেরা যে ভাল খেলে পাকিস্তান ও ভারতকে হারিয়েছে, সেই বাহবাটা পাকিস্তানীরা বাংলাদেশী ক্রিকেটারদের দেয়নি। ভারতের সব মিডিয়াই কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সাফল্য ও কৃতিত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেছে। ভারতের প্রায় সব সংবাদমাধ্যমেই বাংলাদেশ ক্রিকেট দল সম্পর্কে একটাই বক্তব্য ছিল, সেটা হলো ওপার বাংলার ছেলেরা যোগ্য দল হিসেবে প্রতিটি বিভাগে পারদর্শিতার পরিচয় দিয়ে এই জয় হাসিল করেছে। প্রশংসার দিক থেকে ভারতীয় মিডিয়া কোন কার্পণ্য করেনি। বাংলাদেশের সাফল্যকে কোনভাবে খাটো করে দেখাবার চেষ্টা করেনি। আমিও ভারতীয় বাঙালী হিসেবে ক্রিকেট জগতে বাংলাদেশের এই উত্থানে রীতিমতো গর্বিত। বাংলাদেশের সাফল্যে আমাদের হীনম্মন্যতার কোন স্থান নেই। কিন্তু হীনম্মন্যতার ছাপ স্পষ্ট পাকিস্তানের মিডিয়া ও ক্রিকেট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে। বিশেষ করে ‘দ্য ডন’-এর মতো ঐতিহ্যশালী ইংরেজী দৈনিকে যে লেখা প্রকাশিত হয়েছে, তা নিকৃষ্ট পাকিস্তানী মানসিকতার প্রকাশ। ৪৪ বছর আগে মুক্তিযুদ্ধে বাঙালীদের কাছে হেরে গিয়ে পাকিস্তানীদের কাছে বাংলাদেশ যে এখনও গাত্রদাহের কারণ, তা ওই লেখার ছত্রে ছত্রে স্পষ্ট।

আমি জানি না, কোন বাংলাদেশী পাঠক ডনের ওই সংখ্যাটি পড়েছেন কিনা। কারণ ওই পত্রিকার এক নামজাদা কলমচি নাদিম এফ পরাচা, যিনি বিদ্রƒপাত্মক লেখার জন্য দেশে-বিদেশে প্রচুর সুনাম কুড়িয়েছেন, যার লেখা শিক্ষিত পাকিস্তানীদের প্রচুর চিন্তার খোরাক জোগায়, সেই তিনি পাকিস্তানী ক্রিকেট দলের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরের সময় তিনটি টি-টোয়েন্টি খেলায় গো-হারা হারের আসল কারণগুলো ব্যাখ্যা না করে এমন এক উদ্ভট ও ব্যঙ্গাত্মক লেখা লিখেছেন, যার প্রতিটি শব্দে বাঙালী ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ঝরে পড়েছে। লেখাটির শিরোনাম ‘বাংলায় বিপর্যয়’। পাকিস্তান যে তার ৩-০ হারকে খেলোয়াড়সুলভ মানসিকতা নিয়ে মেনে নিতে পারেনি, তা পরাচার লেখার প্রতিটি লাইনে ফুটে উঠেছে এবং টি-টোয়েন্টি সিরিজের হারকে ’৭১-র মুক্তিযুদ্ধে হারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। লেখক লেখাটি শুরু করেছেন ‘ঙঁঃৎধমব, ঙঁঃৎধমব, ঙঁঃৎধমব,’ (অবমাননাকর), এভাবে। বাংলাদেশের কাছে সিরিজ হেরে যাওয়ায় পাকিস্তানের মানসম্মান, পরাচালিখেছেন ‘ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছে।’ তারপরেই তাঁর প্রশ্ন ‘কেমন করে পাকিস্তানীদের দল বাঙালীদেরÑ বাংলাদেশের কাছে এমন লজ্জাজনকভাবে হারে? শ্লেষের সুরে তিনি লিখেছেন, ‘কারণ কি এটাই যে, আমরা পাকিস্তানীরা বাংলাদেশী লোকদের চেয়ে বেশি মাংসাশী? বাঙালীদের চেয়ে আমরা বেশি করে মাংস খাই। তারপর তিনি হারের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘আমাদের হেরে যাওয়া উচিত হয়নি। কিন্তু ওডিআই সিরিজের সময় আমাদের খেলোয়াড়দের মাংসের বদলে শুধু বাঙালী মাছ ও সবজি খেতে বাধ্য করা হয়েছিল, সে জন্য তারা ম্যাচের সময়ে উ™£ান্ত ও হতভম্ব হয়ে পড়ে। মাছ ও সবজি খাওয়া কি পাকিস্তানের মতো চ্যাম্পিয়ন ক্রিকেটারদের সাজে?’ তার আরও মন্তব্য, আমাদের খেলোয়াড়দের বাংলাদেশী ক্রিকেটারদের কাছে হারার কোন প্রশ্নই ওঠে না। কারণ আমরা ওই বাঙালীদের চেয়ে অনেক বেশি মাংস খাই। ওডিআই সিরিজের আগের দিন পাকিস্তানী খেলোয়াড়দের ঢাকায় একটি মাছের আদলে তৈরি এক বিশাল রেস্টুরেন্টে নিয়ে গিয়ে বাঙালী মাছ, চিংড়ি ও সবজি খাওয়ানো হয় এবং তারা সেই খাবার খেলও। তারা ১৫ কোটি মাংসাশী পাকিস্তানীর প্রার্থনার কোন তোয়াক্কাই করল না, মর্যাদাই দিল না। পাকিস্তানী খেলোয়াড়রা পূর্ব পাকিস্তানী মৎস্যভোজী বিশ্বাসঘাতকদের মতো হয়ে গেল। তারা গরুর গোস্ত না খেয়ে বাঙালী টুনা, চিংড়ি ও বিশাল পরিমাণে কুমড়ো খেল, যার ফলে পরাজয় অবধারিত হয়ে উঠল।

তারপর নাদিম পরাচা মশকরা করে যা লিখেছেন, তা বাংলাদেশের পক্ষে রীতিমতো অপমানজনক। পাকিস্তান ৪৪ বছর পরেও বাংলাদেশের অস্তিত্ব যে মেনে নিতে পারেনি, তা পরাচার লেখা থেকে পরিষ্কার। তিনি লিখেছেন, তাঁর পরিচিত এক পাকিস্তানী খেলোয়াড় ক্রিকেট দলের ম্যানেজার ওয়াকার ইউনুসকে বাঙালীদের কাছে পাকিস্তানের হারের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এতই উত্তেজিত হয়ে ওঠেন যে, ইউনুস তাঁকে টিমের জন্য পাকিস্তান থেকে নিয়ে আসা মাংস থেকে তৈরি বিশেষ ধরনের চাপালি কাবাব খাওয়ার পরামর্শ দেন। তাই শুনে ওই খেলোয়াড় বলে ওঠেন, মৎস্যভোজী বাঙালীদের হাতের রান্না করা কোন খাবার তিনি খাবেন না, যতদিন না বিশ্বাসঘাতক বাঙালীরা আবার পূর্ব পাকিস্তানী হয়ে ওঠে।

তাজ্জবের ব্যাপার, পাকিস্তানী মিডিয়ার এক প্রভাবশালী দৈনিকে বাংলাদেশকে নিয়ে এই ধরনের অসংযমী মন্তব্য সম্বন্ধে ঢাকার কোন মিডিয়ার প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। কিন্তু ভারতকে হারিয়ে সিরিজ জিতে ঢাকার এক দৈনিক ‘প্রথম আলো’ তার (‘রস+আলো’) পত্রিকায় ভারতীয় ক্রিকেটারদের মাথা কামানো ছবি ছেপে অসৌজন্যের নজির স্থাপন করে। অনেকটা পরাচা তাঁর লেখায় যেভাবে বাংলাদেশকে হেয় করে অসম্মান প্রদর্শন করেছেন, ঠিক সেইভাবেই প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান ভারতের প্রতি তাঁর বিদ্বেষ, ঘৃণা ও অসৌজন্যবোধ উগড়ে দিয়েছেন। মতিউর রহমান নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবি করলেও, তাঁর ‘রস+আলো’ পত্রিকায় ভারতীয় ক্রিকেটারদের নিয়ে নিম্নরুচির ছবি ও লেখা প্রকাশ করে পরাচার মতো পাকিস্তানী মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন।

লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক ও দৈনিক স্টেটসম্যান (বাংলা)-এর সম্পাদক