১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভিমত ॥ শব্দ সংক্ষেপণের কালে

  • জাফর ওয়াজেদ

‘পৃথিবী ছোট হয়ে আসছে’ তিন দশক আগের সেøাগানটি আজ সত্যি সত্যি ছোট হয়ে গেছে। তথ্যপ্রযুক্তি তার দু’বাহু মেলে পৃথিবীকে আগলে ধরেছে যেন। সুফল তার যেমন অনেক, কুফলও কম নয় এবং তা ধর্তব্যের মধ্যে। শব্দ সংক্ষেপণের প্রবণতা শুধু বাংলা কেন, আরও অনেক ভাষারই বৈশিষ্ট্য। বাংলার প্রাচীন ভাষার মধ্যপদলোপী সমাস ও একশেষ নামটিতেই তা স্পষ্ট। উপসর্গের আদিস্বর লুপ্তি (পিধান<অপিধান) ইত্যাদি বিভিন্ন বৈয়াকরণিক প্রকরণেও এই প্রবণতার সাক্ষ্য আছে। প্রাচীন গ্রীক ইনস্ক্রিপশন, কোরান ও মধ্যযুগের লাতিন পা-ুলিপিতে এই সংক্ষেপণ সঙ্কেত রয়েছে। কিন্তু তা যৎসামান্যই বলা যায়। পরিবর্তিত যুগের তাগিদে শব্দ সংক্ষেপণ প্রবণতা বেড়েছে। ফোন, এসএমএস, ই-মেইলসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও শব্দ সংক্ষেপণের মাত্রা বেড়েছে। বাংলা ভাষার আরেক বিপত্তি দাঁড়িয়েছে রোমান হরফে লেখা। অমর একুশে বা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় যদিও। কিন্তু এই প্রবণতা রোধে বিকল্প হিসেবে বাংলা ভাষা ব্যবহার কার্যকর করা যায়নি। ফলে ইংরেজীর আধিক্য বেড়েছে। সেই সঙ্গে শব্দ সংক্ষেপণ। নাম সংক্ষিপ্তকরণ তো বেশ পুরনোই।

অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ইংল্যান্ডে শব্দ সংক্ষেপণ প্রবণতাকে ভালভাবে দেখা হতো না। ১৮১১ সালে প্রকাশিত ‘স্পেকটেটর’ সাময়িকীতে জোসেফ এডিসন (১৬৭২-১৭১৯) লিখেছেন, ‘It is perhaps this Humour or speaking no more than we need most which has so miserable curtailed our words... as in mob, rep, pos, incog and the like.’ গ্যালিভারস ট্রাভেলসের লেখক জোনাথন সুইফট (১৬৬৭-১৭৫৫) লিখেছেন, ইংরেজী ভাষার শোধন ও উন্নয়নের জন্য এমন একটি বার্ষিক শব্দ বিতাড়নি পঞ্জি প্রকাশ করা দরকার যার উদ্দেশ্য হবে, ‘To condemn those barbarous mutilations of vowels and syllables.’ তবে এই ঢেউ অপ্রতিরোধী। কোনভাবেই রোধ করা যায়নি। বরং দিন দিন তা বেড়ে যেতেই থাকে। বিশ শতক ছিল ‘এ্যাব্রিভিয়েশন’-এর শতক। অফিস-আদালত, গণমাধ্যম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, বিজ্ঞাপন, জনসংযোগ, প্রকাশনা সর্বত্রই এর রাজত্ব এই একুশ শতকেও শনৈঃশনৈঃ এগিয়ে যাচ্ছে। আর এই সংক্ষেপণ নানা ধরনের হয়ে থাকে। কখনও পূর্বাংশে ছোট হয়ে যায়। টেলিফোন হয়ে যায় ফোন। ইউনিভার্সিটি ভার্সিটিতে ঠাঁই নেয়। আবার কখনও শেষেও ছাঁট হয়। কসমোপলিটান হয় কসমো। কখনও আগে-পিছে দু’দিকেই ছাঁট হয়ে যায়। ইনফ্লুয়েঞ্জা হয়ে যায় ফ্লু। কখনও কখনও সংক্ষেপণটি পর পর অংশবিশেষ নিয়ে। যেমন রাডার হচ্ছে রেডিও ডিটেকশন এ্যান্ড রেনজিং। কখনও তা আদ্যক্ষরেই ঘটে। জেনারেল পোস্ট অফিস হয়ে যায় জিপিও। বাংলাদেশ টেলিভিশন হয় বিটিভি। এই ধাঁচের সংখ্যাই বেশি।

বাংলা শব্দভুবনে খ-ই হয়ে উঠেছে এখন অখ-। এখন সিডি, আইএসডি, এসএমএস, নেট, ই-মেইল, পপ, বাস, ট্যাক্সি, মাইক ইত্যাদি ভগ্নাংশে শব্দ মানুষের মৌখিক ভাষ্যে পরিণত হয়ে আছে। ফ্যাক্স শব্দ যে ভগ্নাংশ তা মনে হয় না অথচ তার ব্যবহার এখনও চলছে। সেই পুরনো গল্প আছে রিক্সাচালক বিশ্ববিদ্যালয় চিনে না, তবে ভার্সিটি বলায় সে অবলীলায় চিনে ফেলে। টেলিভিশনও হয়েছে টিভিতে পরিণত। সাধারণ মানুষ সংসদ ভবন চেনে। শব্দ ছাঁটাই যে সহজ সে তো হরহামেশাই মেলে। বহু বিখ্যাতজনের নামকরণও সংক্ষিপ্ত হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত হয়ে বাংলা কাগজে আ’লীগ আর ইংরেজী কাগজে এএল ছাপা হয়ে আসছে। ইংরেজী এ্যাব্রিভিয়েশনের প্রচলিত অর্থের পাশাপাশি সাঙ্কেতিক অর্থও পাওয়া যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা মঞ্জুভাষণ। যেমন এসি-ডিসি-বিদ্যুত প্রবাহের সঙ্গে তা সম্পৃক্ত আছেই, কিন্তু তার সঙ্কেত উভকামী। অর্থটা বিদ্যুতস্পৃষ্ট হওয়ার মতোই বটে। বঙ্গভাষাতেও আছে এমন শব্দরাজি যেমন, পোপা-পোজপাজ ইত্যাদি।

সংক্ষেপের প্রবণতা এসেছে ইংরেজী থেকে। বাংলায় চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরেই, এমন কিছু শব্দেও ছাঁটাই কাজ হয়ে গেছে। অবলীলাক্রমে এখন ক্রমশ ‘ক্রমে’ লুপ্ত হয়ে তা দাঁড়িয়েছে ‘অবলীলায়’। আগে উপসর্গ সহকারে ‘অনুপ্রাণিত’ হতো পাঠক, এখন ‘প্রাণিত’ হয়। পরিপ্রেক্ষিতের ‘পরি’ উড়ে গেছে, হয়েছে ‘প্রেক্ষিত’। পরির চারদিক অর্থ নাই বা থাকল। ‘প্রশংসাপত্র’ হয়েছে ‘শংসাপত্র’। ‘পুঙ্খানুপুঙ্খ’ হয়েছে ‘অনুপুঙ্খ’। এনপিপি- না পড়ে প-িত। জিএমটিটি মানে জাতে মাতাল তালে ঠিক- ইত্যাদি শব্দরাজির অভাব নেই বাংলায়। মুখে মুখে এসবের জন্ম, আবার মুখেই বিলীন হয়ে যায়।

শব্দ সংক্ষেপণ প্রক্রিয়া অতীতেও চলে এসেছে, এখনও চলছে, আগামীতেও চলবে। এসএমএসের কল্যাণে শব্দ সংক্ষিপ্ত হয়ে এসেছে। আগামীতে এর কী রূপ নেবে সে ভবিতব্যই বলবে। তবে এতে আশঙ্কিত বা আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। যা সংক্ষিপ্ত হওয়ার তা হবেই। কমপ্যাক্ট ডিস্ক না চিনলেও সিডি চেনে। বাঙালী তার ধারণক্ষমতা অনুযায়ী শব্দকে সংক্ষিপ্ত করছে- এটাই বা কম কিসে। মূল কথা তো দ্রুত যোগাযোগ। তা যথাযথভাবে হচ্ছে কিনা- সেটাই দেখার বিষয়।