২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দরপতনের বৃত্তে স্বর্ণের বিশ্ববাজার

  • সোনার দর আরও কমার আভাস;###;দেশের বাজারে সামান্য কমলেও প্রভাব নেই ;###;আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দামের ফারাক প্রায় ৮ হাজার টাকা

রহিম শেখ ॥ বিশ্ববাজারে সোনার দাম এই মুহূর্তে ব্যাপক পড়তির দিকে। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ববাজারে সোনার যে দর ছিল, এখন তার চেয়েও কম। ২০১১ সালের তুলনায় ৪০ শতাংশ পড়ে গেছে সোনার দর। প্রতি আউন্স সোনার দর এখন ১১শ’ ডলারের নিচে। এই পতন টানা ১২ দিন। ১৯৯৬ সালের পর এই প্রথম এ রকম টানা দরপতন হলো। চলতি বছরে সোনার দাম আরও কমবে বলে আভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা। এই অবস্থায় দেশের বাজারে ভরিপ্রতি সোনার দাম দেড় হাজার টাকা কমলেও বিশ্ববাজারের সঙ্গে এখনও দামের ফারাম প্রায় ৮ হাজার টাকা। সোনায় সামান্য পরিমাণে দাম কমলেও ক্রেতাদের এ নিয়ে খুব বেশি আগ্রহ নেই। তবে স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভবিষ্যতে সোনার দাম আরও কমলে অলঙ্কার বিক্রি বাড়বে।

জানা গেছে, গত ছয় বছরে প্রত্যাশার তুলনায় চীনে আমদানি কম এবং মার্কিন ডলারের মান শক্তিশালী হওয়ার কারণেই সোনার দরপতন হয়েছে। সোনা সরবরাহকারী গোল্ড বুলিওন ইন্টারন্যাশনালের সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান বব এ্যাল্ডারম্যান বলেন, ডলারের শক্তিমত্তার সঙ্গে সোনা পরাজিত হচ্ছে। গত সপ্তাহজুড়ে ঝড়ের মতো বয়ে গেছে। এদিকে, গত বৃহস্পতিবার বেশিরভাগ মুদ্রার বিপরীতে ডলারের দাম কমে গেলে সোনার দামে কিছুটা স্বস্তি আসে। তবে অনুমান করা হচ্ছে, আগামী কয়েক মাসে ডলারের দাম বেড়ে যাবে। এক বছরের ব্যবধানে বিশ্বের বিভিন্ন মুদ্রার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের দর বেড়েছে ২০ শতাংশ। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডারেল রিজাভ’-এর নির্ধারিত বর্তমান সুদহার ০.২৫ শতাংশ। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের চেয়ারম্যান জ্যানেট ইলেন এ বছরের শেষ দিকে সুদের হার বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। এদিকে আগের তুলনায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় সোনা উৎপাদনকারী দেশটি ধীরগতিতে সোনা মজুদ করছে। এতে সোনাশিল্পে বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের ফলেও সোনায় আঘাত পড়েছে। পশ্চিম বিশ্বের সঙ্গে ইরানের যুগান্তকারী পরমাণু চুক্তির ফলে সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলটিতে সংঘর্ষের আশঙ্কা কমে যায়। অথচ সেই আশঙ্কার ফলে অধিক হারে সোনা ও তেলের বাণিজ্য হতো। একইভাবে শেষ মুহূর্তে এসে গ্রীসের সঙ্গে ঋণদাতাদের চুক্তি হয়। ফলে দেশটি ইউরোজোনেই থেকে যায়। বিনিয়োগকারীরা এখন গ্রীসের বেরিয়ে যাওয়া নিয়ে আশঙ্কা করছে না। বব এ্যাল্ডারম্যান বলেন, নতুন আর্থিক পুনরুদ্ধার সহায়তার ফলে ক্ষতির আশঙ্কা কমে যায়। এটা সোনার জন্য ভাল নয়।

সোনার বিশ্ববাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে এর দর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। ওই সময় প্রতি আউন্স সোনার দাম ঠেকে এক হাজার ৯০০ ডলারে। গত সোমবার পাঁচ বছরের মধ্যে সাংহাই ও নিউইয়র্কে দাম কমে এক হাজার ৮৬ ডলারে নামে। দাম আরও কমার আশঙ্কায় মুহূর্তের মধ্যেই ওই দিন ৫৭ টন সোনা বিক্রি হয়। গত সোমবার যখন চীনের সাংহাই ও যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক স্টক মার্কেট খোলে, তার মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে ১৩০ কোটি ডলারে হাত বদল হয়ে যায় ৩৩ টন সোনা। ওই সময়ের মধ্যেই আগের দিনের চেয়ে আউন্সপ্রতি দর ৪৮ ডলার কমে দাঁড়ায় এক হাজার ৮৬ ডলারে। প্রথম মিনিটের মধ্যেই দর কমে দুইবার সার্কিট ব্রেকার স্পর্শ করে দাম। সাংহাই ও নিউইয়র্কে সোমবার এক দিনেই লেনদেন সোনার ৩৩ লাখ লট শেয়ার। এর আগে জুলাই মাসে গড়ে প্রতিদিন সোনার শেয়ারের মাত্র ৩০ হাজার লট হাত বদল হয়েছে। এদিকে সোনার দরপতনের ফলে গোল্ড মাইনিং ইন্ডাস্ট্রিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। বিশ্বের বৃহত্তম সোনা উত্তোলক কোম্পানি ব্যারিক গোল্ডের শেয়ারের দাম ১৫ শতাংশ কমেছে, যা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সোমবার লন্ডনের র‌্যানগোল্ড রিসোর্সেসের লেনদেন শেষ হয়েছে ৪.৭ শতাংশ পতনের মধ্য দিয়ে।

এদিকে বিশ্ববাজারে সোনার দাম কমায় বাংলাদেশেও বিভিন্ন ধরনের সোনার দাম ভরিপ্রতি সর্বোচ্চ এক হাজার ৫৪০ টাকা পর্যন্ত কমিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতি।

বাজুস সূত্রে জানা যায়, নতুন দাম অনুযায়ী প্রতিভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) ভাল মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেট প্রতিগ্রাম স্বর্ণের দাম ৩ হাজার ৬৮৫ টাকা হলে প্রতিভরি ৪২ হাজার ৯৮১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে প্রতি ভরিতে কমানো হয়েছে ১ হাজার ৫৩৯ টাকা। ২১ ক্যারেট প্রতিগ্রাম স্বর্ণের দাম ৩ হাজার ৫০৫ টাকা হলে প্রতিভরি ৪০ হাজার ৮৮২ টাকা, ১৮ ক্যারেট প্রতিগ্রাম স্বর্ণের দাম ২ হাজার ৯২৫ টাকা হলে প্রতিভরি ৩৪ হাজার ১১৭ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতিগ্রাম স্বর্ণের দাম ১ হাজার ৯৬০ টাকা হলে প্রতিভরি ২২ হাজার ৮৬১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

রূপার দাম প্রতিভরি ৮৫ টাকা হলে প্রতিভরি ২১ ক্যারেট (ক্যাডমিয়াম) রূপার দাম ৯৯১ টাকা। দেশের বাজারে সোনার দাম কমানোর পর ক্রেতাদের সাড়া পাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক খান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাজারে সোনার দাম বাড়ে-কমে। আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুদিন ধরে সোনার দাম কম থাকায় দেশের বাজারেও কমেছে। তবে ঈদের পর দাম কমার কারণে বিষয়টি অনেকে জানে না। ফলে দাম কমার পরও সোনার দোকানগুলোতে ক্রেতাদের তেমন সাড়া পড়েনি। তবে কয়েকদিন পর থেকে ক্রেতাদের সাড়া পড়বে বলে মনে করেন তিনি। আমিন জুয়েলার্সের এক বিক্রয়কর্মী বলেন, দেশে এখন সোনার ব্যবসা খুব বেশি ভাল না। বিয়েসহ বিভিন্ন সামাজিক উৎসব কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ে মন্দাভাব তৈরি হয়েছে। তবে দাম কমার ফলে ক্রেতা আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। মৌচাক মার্কেটের রানা জুয়েলার্সের বিক্রয়কর্মী আহসান হাবিব জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম অনেক কমেছে, সেই তুলনায় দেশের বাজারে তেমন কমানো হয়নি। যদি সোনা মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে আনতে হয় তাহলে দেশের বাজারে সোনার দাম আরও কমাতে হবে। তাহলেই ক্রেতারা সোনার দোকানে ভিড় জমাবে বলে মনে করেন তিনি। বাংলাদেশ, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে সোনা অলঙ্কার হিসেবে ব্যবহার হলেও বিশ্বের মোট সোনার বড় অংশই বিনিয়োগ হিসেবে মজুদ করে বিভিন্ন দেশ, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। তবে মজুদ করা সোনা থেকে কোন লভ্যাংশ মেলে না, সুদও পাওয়া যায় না। দাম বাড়লেই শুধু মুনাফা হয়। কিন্তু দাম কমলে বাজারেও কিছুটা দাম কমে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে শেয়ারবাজারেও পতন ঘটছে। গোল্ডম্যান স্যাক্স জানিয়েছে, সোনার দাম আরও পড়বে। ফলে আতঙ্কিত হয়ে লগ্নিকারীরা সোনা বিক্রি শুরু করেছে, যার ফলে আরও পড়ছে দাম। সংস্থাটির মতে, সোনার দাম হাজার ডলারের ঘরে নেমে আসবে। সম্প্রতি ব্লুমবার্গকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে গোল্ডম্যান স্যাক্সের হেড অব কমোডিটিজ জেফরি কারিই বলেন, সোনার বাজারের বাজে সময় এখনও আসেনি। সোনার প্রতি আউন্সের দর এ বছরের মধ্যেই ১০০০ ডলারের নিচে নামবে।

ডলারের দর বাড়ার কারণে সোনা দিন দিন গুরুত্ব হারাচ্ছে। নেদারল্যান্ডভিত্তিক এবিএন এম্রো ব্যাংক তাদের সাপ্তাহিক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, ২০১৫ সালের শেষ নাগাদ সোনার প্রতি আউন্সের দর ১০০০ ডলারের নিচে নামবে। আর ২০১৬ সালের মধ্যেই তা বিক্রি হবে ৮০০ ডলারে। দ্য টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, সোনার ভবিষ্যত খুব বেশি ভাল নয়। কারণ চীনের অর্থনীতিতে আগের মতো উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে চীনেও ব্যাংক সুদের হার বাড়তে শুরু করেছে। ফলে সোনায় বিনিয়োগকারীরা অর্থ তুলে হয় ব্যাংকে, না হয় অন্য খাতে বিনিয়োগ শুরু করছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে সোনার দাম আরও বেশ কমবে।