১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চট্টগ্রামে ৩শ’ গার্মেন্টস বিপাকে

  • বন্ধ হয়ে গেছে ১৭টি এ্যাকর্ড ও এ্যালায়েন্সের নির্দেশনা বাস্তবায়নে কঠিন সমস্যা

মোয়াজ্জেমুল হক, চট্টগ্রাম অফিস ॥ চরম অনিশ্চয়তার কবলে পড়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের তিন শ’ গার্মেন্টস। ঢাকায় তাজরীন ফ্যাশনে আগুন এবং রানা প্লাজা ধসের কারণে বেশকিছু গার্মেন্টস কর্মীর মৃত্যুর ঘটনার পর তৈরি পোশাক ক্রেতাদের ক্ষেত্রে যারা ব্র্যান্ড বায়ার হিসেবে পরিচিত তাদের আন্তর্জাতিক দুটি জোট এ্যালায়েন্স ও এ্যাকর্ড-এর নানাবিধ নির্দেশনার কবলে পড়ে এসব গার্মেন্টসের বর্তমানে কাহিল অবস্থা। এসব ব্র্যান্ড বায়ারদের নির্দেশনা অনুযায়ী চিহ্নিত এ তিন শ’ গার্মেন্টসে চলছে বহুমুখী সঙ্কট। এই তিন শ’ গার্মেন্টসের মধ্যে ১৭টি ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। বাকিগুলোও চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। এ্যালায়েন্স ও এ্যাকর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী এরা পর্যাপ্ত পরিসরের নতুন কোন ভবন পাচ্ছে না, পাচ্ছে না ব্যাংক ঋণ। আবার উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রফতানির ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এলসিও গ্রহণ করছে না। বিষয়টি জটিল পরিস্থিতির আবর্তে পড়েছে বলে বিজিএমইএ’র দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

প্রসঙ্গত, তাজরীন ফ্যাশন ও রানা প্লাজার দুঃখজনক ঘটনার পর তৈরি পোশাক ক্রেতাদের ব্র্যান্ড বায়ারদের জোট যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এ্যালায়েন্স এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন দেশভুক্ত এ্যাকর্ড-এর পক্ষ থেকে বাংলাদেশে এসে চালানো হয় গার্মেন্টসগুলো নিয়ে ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় চট্টগ্রামে চলমান ৭৮০ গার্মেন্টসের মধ্যে ৩শ’টিকে বিভিন্ন ত্রুটিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং চার বছরের মধ্যে এসব গার্মেন্টসের চিহ্নিত ত্রুটিসমূহ সারানোর নির্দেশনা প্রদান করা হয়। উক্ত সময় পর্যন্ত এসব বায়ার এসব গার্মেন্টসে উৎপাদিত পণ্য আমদানি বন্ধ রেখেছে। এর ফলে ইতোমধ্যেই এসব গার্মেন্টসের মালিক কর্তৃপক্ষ চীন, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে তাদের পণ্য রফতানি করতে সচেষ্ট হলেও এ্যালায়েন্স ও এ্যাকর্ড-এর জোটভুক্ত বায়াররা পণ্য আমদানিতে অনীহার দৃঢ় অবস্থানে থাকায় আর্থিকভাবে বেকায়দায় পড়েছে। কেননা, বাংলাদেশে উৎপাদিত তৈরি পোশাকের বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ।

বিজিএমইএ সূত্র জানায়, চিহ্নিত তিন শ’ গার্মেন্টসের যেসব ত্রুটি চিহ্নিত করা হয়েছে তা সারাতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। এর পাশাপাশি ব্যাংকিং খাত থেকে আর্থিক ঋণের যে সহযোগিতা প্রয়োজন তাও মিলছে না। ফলে এসব গার্মেন্টস ধুঁকছে। গার্মেন্ট কর্তৃপক্ষগুলো কারখানাকে বাঁচিয়ে রাখতে সাবকন্ট্রাক্টে বা এ্যাকর্ড ও এ্যালায়েন্সভুক্ত দেশের বাইরে পণ্য রফতানির পথ খুঁজে নিচ্ছে।

সূত্র মতে, মানসম্মত গার্মেন্টস কারখানা গড়ে তুলতে অবকাঠামোগত যেসব সুবিধা প্রয়োজন তা সহজেই মিলছে না। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে সুপরিসর ভবনে কারখানা স্থাপন। এছাড়া বিদ্যুত ও গ্যাস সঙ্কট বাংলাদেশে বড় ধরনের একটি সঙ্কটের কারণে প্রতিনিয়ত গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী কারখানায় ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে।

বিজিএমইএ সূত্র আরও জানায়, এ্যাকর্ড ও এ্যালায়েন্স শুধুমাত্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে যেসব নির্দেশনা প্রদান করেছে তা পৃথিবীর অন্য কোন গার্মেন্টসের জন্য প্রযোজ্য করেনি। এ ব্যাপারে এসব জোটের সঙ্গে সরকার পক্ষে যে স্বাক্ষর করা হয়েছে তাতে বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষের সম্মতিও নেই। এর পরও এসব ব্র্যান্ড বায়ারদের জোট তাদের ইচ্ছামাফিক যে নির্দেশনা বলবৎ করেছে তাতে ক্ষতির মুখে পড়েছে চট্টগ্রামের এই তিন শ’ গার্মেন্টস।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে প্রায় ৫ হাজার গার্মেন্টস রয়েছে। এরমধ্যে প্রায় সাড়ে তিনহাজার সম্পূর্ণ চালু অবস্থায় রয়েছে। অপরদিকে, চট্টগ্রামে রয়েছে ৭৮০টি। এরমধ্যে সম্পূর্ণ চালু অবস্থায় রয়েছে প্রায় সাড়ে ৫শ’। এসব গার্মেন্টসের মধ্যে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ৫ লক্ষাধিক। আর যে তিন শ’ গার্মেন্টস এ্যাকর্ড ও এ্যালায়েন্সের চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত নয় সেগুলোতে রয়েছে দেড় লাখেরও বেশি শ্রমিক। যার অধিকাংশ নারী। বর্তমানে এসব গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতা ও অবকাঠামোগত সুবিধাপ্রাপ্তির অভাবে ব্যাপক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছে। কারণ, এ্যাকর্ড ও এ্যালায়েন্সভুক্ত দেশে তৈরি পোশাক রফতানিতে যেভাবে লাভবান হওয়া যায় সে তুলনায় অন্য দেশগুলোতে তা অনুপস্থিত। এ অবস্থায় এসব গার্মেন্টসকে মানসম্মত করে তোলার ক্ষেত্রে যে সময় ও অন্যান্য দিক নির্দেশনা রয়েছে তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন বেশ কঠিন। যে কারণে মালিকরাও রয়েছে শঙ্কায়। আর শ্রমিকরা রয়েছে উৎকণ্ঠায়।

যোগাযোগ করা হলে বিজিএমইএ’র এক পরিচালক জানান, চিহ্নিত এসব গার্মেন্টসের মালিকের ভোগান্তি এখন চরমে। কারণ একেকটি গার্মেন্টস স্থানান্তরের ক্ষেত্রে ন্যূনতম পক্ষে আট থেকে দশ কোটি টাকা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণও মিলছে না।

মালিকদের এত বিপুলসংখ্যক নগদ অর্থের অপর্যাপ্ততায় তারা ভিন্ন কোন পথও খুঁজে পাচ্ছে না। অনেকেই নিজস্ব ভবন তৈরি করলেও সেগুলোতে মিলছে না বিদ্যুত ও গ্যাস সংযোগ। এ ব্যাপারে বিজিএমইএ’র প্রথম সহসভাপতি নাসির উদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এ্যাকর্ড ও এ্যালায়েন্সের একদিকে কড়া নির্দেশনা, অপরদিকে এসব কারখানা টিকিয়ে রাখা নিয়ে বিজিএমইএ সঙ্কটে পড়েছে। এই বিপুলসংখ্যক গার্মেন্টসকে নতুন ভবনে নেয়া সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। বিজিএমইএ সূত্র জানায়, এ অবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই এসব গার্মেন্টস কারখানা রুগ্ন হয়ে পড়তে বাধ্য। এর ফলে দেশের অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সূত্রমতে, এক্ষেত্রে সরকার ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করলে চিহ্নিত এসব গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষের জন্য সহায়ক ভূমিকা হবে।

উল্লেখ্য, যেসব গার্মেন্টস বিভিন্ন ভবনে ফ্লোর ভাড়া নিয়ে কারখানা চালিয়ে আসছিল অথবা বড় বড় গার্মেন্টস সাবকন্ট্রাক্ট নিয়ে কাজ চালাচ্ছিল এ্যাকর্ড ও এ্যালায়েন্স এগুলোকে ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর পরও এগুলোতে উৎপাদন এখনও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। তবে জোটগুলোর অবস্থান পরিবর্তন না হলে এসব কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে বাধ্য; যা হবে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতি।