২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কারাগারে বসেই ওরা নিয়ন্ত্রণ করছে আন্ডারওয়ার্ল্ড ॥ কারা প্রশাসন জিম্মি!

কারাগারে বসেই ওরা নিয়ন্ত্রণ করছে আন্ডারওয়ার্ল্ড ॥ কারা প্রশাসন জিম্মি!
  • উর্ধতন কর্মকর্তাদের পরিবারকে হত্যার হুমকি পর্যন্ত দেয় এসব শীর্ষ সন্ত্রাসী ;###;অধস্তন এক শ্রেণীর কর্মকর্তা কর্মচারীর সঙ্গে রয়েছে তাদের যোগসাজশ;###;মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় জনবল কর্তৃপক্ষের নেই

মশিউর রহমান খান ॥ কারাগারে বসেই বিভিন্ন ভয়ানক অপরাধ করে চলছে বন্দীরা। চাঞ্চল্যকর নানা অপরাধে আটক বন্দীদের তুলনায় কারা নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিতরা কম দক্ষ ও অনভিজ্ঞ হওয়ায় নিত্যনতুন কৌশল গ্রহণ করে বিভিন্ন প্রকার অপরাধ করছে এসব কারাবন্দী। আদালতের রায়ে সাজাপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন ভয়ঙ্কর বন্দীরাই এসব অপরাধ করছে। প্রতিনিয়তই কারাবন্দীরা তাদের অপরাধের ধরন পাল্টাচ্ছে। কারা কর্তৃপক্ষ শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রতিদিনই এসব অপরাধের বিচার ও শাস্তি প্রয়োগ করছে। তবে বিভিন্ন মামলায় আটক কয়েদী শীর্ষ সন্ত্রাসী, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি, চোরাকারবারী, একাধিক মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি, চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা, বিভিন্ন মামলায় একাধিকবার কারাগারে আসা বন্দীরাই বেশি অপরাধ সংঘটিত করছে। এছাড়া বড় ব্যবসায়ী ও সরকারী শীর্ষ চাকুরে, শিল্পপতি, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত আটক ব্যক্তিবর্গও অপরাধ করে থাকে। কারাভ্যন্তরে আটক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নির্দেশেই বাইরের একাধিক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে বলেও প্রমাণ রয়েছে। কারাফটকে তাদের সহযোগীরা উৎকোচের বিনিময়ে এসব শীর্ষ সন্ত্রাসীর সঙ্গে দেখা করে করণীয় বিভিন্ন নির্দেশনা পেয়ে বাইরের আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে।

কারাভ্যন্তরে অপরাধের এ হার আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে। কারা কর্তৃপক্ষ অবৈধ এসব সুবিধা চালু রাখতে কারাবন্দীরা দায়িত্বরতদের ভয় দেখাতে বেছে নিচ্ছে নানা কৌশল। এমন দুর্ধর্ষ আসামিও রয়েছে যারা কারাভ্যন্তরে প্রতিদিনই কারাগারকে অস্থিতিশীল করে বিনিময়ে নিজস্ব সুবিধা আদায়ের জন্য কারা প্রশাসনকে অস্থিতিশীল করতে নানা প্রকার অপরাধ করছে। বাইরের থাকাকালে এসব আসামি নানা অন্যায় কাজে জড়িত থাকায় কারাভ্যন্তরের শৃঙ্খলিত বিধিবদ্ধ জীবনে গিয়ে তেমন সুবিধা করতে না পেরে নিজস্ব সুবিধা আদায়ে এমন কোন হীন কাজ ও চেষ্টা নেই যা এসব বন্দী করে না। গলায় ধারালো কিছু দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা, জিহ্বা কেটে ফেলা, শরীর কেটে ফেলা, দেয়ালে মাথা ফাটানোর চেষ্টা, নিজের শরীরে আগুন দেয়ার চেষ্টা, কারারক্ষী থেকে শুরু করে কর্মকর্তাদের বদলির হুমকি প্রদান, দায়িত্বরতদের পরিবারের সদস্যদের জীবননাশের হুমকি পর্যন্ত দিচ্ছে। তবে এসব অপরাধ সংঘটনে কারাগারের একশ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীর পরামর্শ ও যোগসাজশ রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

কারা সূত্র জানায়, বন্দীদের এসব অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করছে একশ্রেণীর অসাধু কারা কর্মকর্তা কর্মচারী। তাদের সহায়তায় কারাবন্দীরা কারাগারে বসেই প্রতিমাসে লাখ লাখ টাকা কামাচ্ছে। তারা বন্দীদের এসব অপরাধ দেখেও না দেখার ভান করে বিনিময়ে প্রতিমাসে নির্দিষ্ট অর্থ হাতিয়ে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কারাভ্যন্তরে বসে বৃহত কোন অপরাধ সংগঠিত করার জন্য কখনও কখনও বন্দীরা একেকটি কাজের বিপরীতে কারা কর্মকর্তাদের কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত প্রদান করে থাকে। বন্দীদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় নানা অবৈধ সুবিধা নেয়ার কারণে বা অপরাধের সুযোগ করে দেয়ায় প্রতিবছর শতাধিক কারা কর্মকর্তাসহ কারারক্ষীদের বেতন বন্ধ, পদোন্নতি স্থগিত, বিভাগীয় মামলা দায়ের, তাৎক্ষণিক বদলিসহ নিজ বিভাগের বাইরে পর্যন্ত বদলি করা হয়ে থাকে। এছাড়া ছোট-বড় নানা প্রকার শাস্তিও প্রদান করা হয়ে থাকে।

কারা সূত্র জানায়, প্রতিদিন সারাদেশের ৬৮ কারাগারে ৪ থেকে ৫শত বন্দীকে ছোট-বড় অপরাধে শাস্তি প্রদান করা হয়। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে কারা সংশ্লিষ্টদের আধুনিক ও প্রযুক্তিগত কোন প্রশিক্ষণ না থাকায় কারাবন্দীদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই অসম্ভব হয়ে পড়ছে। অপরাধ সংঘটনের জন্য কারাগারে বসেই আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণর করার সর্বাত্মক চেষ্টার অংশ হিসেবে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, হুমকি প্রদান, কারাভ্যন্তরে ল্যাপটপ ব্যবহার, মাদক গ্রহণ ও বিতরণ করা, কারাভ্যন্তরে মাদক ব্যবসা পরিচালনার চেষ্টা করে আসছে। সেই তুলনায় কারা বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রযুক্তিজ্ঞান ও অপরাধজ্ঞানের ধারণা কম থাকায় বা কোন কোন ক্ষেত্রে না থাকায়, পুরনো জেলকোডের বাধ্যবাধকতায় বন্দীদের চেয়ে অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে।

জেলকোডের পরিপূর্ণ অনুসরণ করেও মাদক মামলার আসামিসহ এসব সন্ত্রাসী, জঙ্গী, হত্যা মামলা, ফাঁসির দ-প্রাপ্ত আসামি, মাদক মামলার আসামি, কিশোর অপরাধে আটকসহ একাধিক কোন কোন ক্ষেত্রে ৩০টির বেশি মামলার এসব কারাবন্দীদের সামলাতে কারা কর্তৃপক্ষকে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে। কোন কোন আসামির ক্ষেত্রে আটককালীন জেলকোড অনুযায়ী অর্ধ শতাধিকবার ছোট বড় শাস্তি দিয়েও তাদের সামলাতে পারছে না। বন্দীদের কারাভ্যন্তরে গঠিত অপরাধ সংগঠনের ফলে বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি প্রদান করায় কোন কোন ক্ষেত্রে কারা কর্মকর্তা কর্মচারীদের হুমকির শিকার হতে হচ্ছে। কারাগারের ভেতরে বসেই বাইরের জগৎ নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হলে কখনও কখনও কারা সংশ্লিষ্টদের তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকদের দিয়ে নানা প্রকার ভয়ভীতি প্রদান করা হয়। ফলে দায়িত্বরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অনেকটা বাধ্য হয়েই তাদের কারাভ্যন্তরে অবৈধ সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে বলে জানা গেছে।

কারা সূত্র জানায়, যশোর কারাগারে আটক শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলালের পক্ষে সম্প্রতি একটি চক্র কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন ও কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার হাই সিকিউরিটি প্রিজন্সের সিনিয়র জেল সুপার মিজানুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার হুমকি প্রদান করেছে। কারাবন্দীদের অপরাধ করতে সুযোগ না প্রদান করায় এ হুমকি প্রদান করা হয়। পরে কারা মহাপরিদর্শক ও জেল সুপার সংশ্লিষ্ট থানায় এ সংক্রান্ত দুটি জিডি করেন। মোবাইল ফোনে টেক্সট মেসেজের মাধ্যমে দেয়া হুমকিতে বলা হয়, শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলালকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে পাঠানো হয়। পরে আবার তাকে ঐ কারাগারে বিভিন্ন অবৈধ সুযোগ না দিয়ে কোণঠাসা করতেই যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। যার খেসারত দুই জনের পরিবারকে দিতে হবে। পিচ্চি হেলালকে ঢাকা কারাগারে না আনা হলে এমনকি তাদের ও তাদের সন্তানদের হত্যা পর্যন্ত করা হবে? কারা সূত্র জানায়, কারাগারে ওই বন্দীকে কারা কর্তৃপক্ষ তার উচ্ছৃঙ্খল আচরণ সামলাতে কষ্ট হওয়ায় প্রশাসনিক কারণে ঢাকা থেকে কাশিমপুর হয়ে যশোর পাঠানো হয়। কারাবন্দীদের অপরাধ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ কারা কর্মকর্তারা যেখানে হুমকির মুখে থাকেন সেখানে নিরাপত্তা রক্ষায় দায়িত্বপ্রপ্ত সাধারণ কর্মচারী বা কারারক্ষীরা কতটুকু নিরাপদ তা সহজেই অনুমেয়।

এসব অপরাধ ছাড়াও মাদক মামলায় সারাদেশের ৬৮ কারাগারে ৬৫ থেকে ৬৭ হাজার বন্দীর মধ্যে প্রায় ৭ হাজার বন্দী মাদকাসক্ত বা মাদকের বিভিন্ন মামলায় আটক থাকায় তারা কারাভ্যন্তরে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ ও নিজেরা মাদক গ্রহণের চেষ্টা করছে। ফলে প্রতিনিয়তই কোন না কারাগারের ভেতরে বন্দীদের মাদক গ্রহণ, বিতরণ, বিক্রি নিয়ে কোন না কোন অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। আর এ ব্যবসায় সহযোগিতায় রয়েছে একশ্রেণীর কারা কর্মকর্তা- কর্মচারী। কম সময়ে অধিক অর্থ আয়ের সুযোগ থাকায় কখনও কখনও বন্দীদের মধ্যে একটি গ্রুপ অপর গ্রুপের এ ধরনের অবৈধ কর্মকা- কারা প্রশাসনের নজরে আনতে দেখা যাচ্ছে। মূলত কারাগারের ভেতর শৃঙ্খলা আনতে নয়, কারাভ্যন্তরে অবৈধ ব্যবসায় প্রতিপক্ষ শক্তিশালী হওয়ায় তাদের ঘায়েল করতে কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অপরাধের তথ্য দিচ্ছে বন্দীরা।

কারাভ্যন্তরে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বাধ্য হয়ে কারা কর্তৃপক্ষকে জেলকোড মেনে কঠোর হতে দেখা যায়। ফলে অনেক সময় এসব বেপরোয়া আসামিকে কারা কর্তৃপক্ষের কঠোরতার খবর সংবাদ মাধ্যমেও উঠে আসে। তবে দিন দিনই পুরনো জেলকোডের ব্যবহার ও ব্রিটিশ আমলের প্রযুক্তি, সীমিত জনবল দিয়ে বিভিন্ন মামলার এসব আসামিকে কারা কর্তৃপক্ষকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা বর্তমানে অনেকটা কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্রিটিশ আমলের নিয়মে পরিচালিত কারাগারের বন্দীর তুলনায় অত্যন্ত কমসংখ্যক কারা রক্ষী দায়িত্ব পালন করছেন। কারাভ্যন্তরে একটি মাত্র লাঠি দিয়ে এসব দুর্ধর্ষ বন্দী নিয়ন্ত্রণ কারারক্ষীদের পক্ষে প্রায় অসম্ভবও বটে। সংশ্লিষ্টদের মতে স্বল্পসংখ্যক কারারক্ষী দিয়ে দেশের প্রতিটি কারাগারের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বজায় রাখাও অনেকটা কঠিন হয়ে পড়েছে, ফলে কারা নিরাপত্তাও হুমকির মুখে রয়েছে।

সম্প্রতি এসব ভয়ংকর কারাবন্দীদের নিয়ে গাজীপুরের কাশিমপুরে দেশের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সমৃদ্ধ অত্যাধুনিক কারাগার হিসেবে পরিচিত ‘হাই সিকিউরিটি প্রিজন্স’ কর্তৃপক্ষের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো একটি রিপোর্টে এর আসল চিত্র উঠে আসে। সম্প্রতি পত্রিকায় কারাভ্যন্তরে মধ্যযুগীয় কায়দায় আসামি নির্যাতন সম্পর্কে একটি পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলে কারা গোয়েন্দারা সংবাদের সঠিকতা যাচাইয়ে তদন্ত করে এ সংশ্লিষ্ট আসামিদের সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঐ কারাগারের দেশের শীর্ষ জঙ্গী থেকে শুরু করে হত্যা মামলা, ফাঁসির আসামি, শীর্ষ সন্ত্রাসী (টপ টেরর), পেশাদার অপরাধী, খুনী, ধর্মান্ধ জঙ্গী, যাবজ্জীবন দ-প্রাপ্ত আসামি, অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত, ঝুঁকিপূর্ণ আসামিসহ দেশের বিভিন্ন সময়ে আলোচিত নানা ভয়ঙ্কর ও চাঞ্চল্যকর মামলার আলোচিত আসামিদের রাখা হয়।

এই কারাগারের আসামিদের মধ্যে উচ্ছৃঙ্খলা সম্পর্কিত ২৩ আসামির বিরুদ্ধে গত ৩ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো রিপোর্টে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন কারাগার হতে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষায় হাই সিকিউরিটি প্রিজন্সে আটক রাখা হয়। দুর্ধুর্ষ এসব বন্দীকে আটক রাখতে কারা কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি ও ক্ষেত্র অনুযায়ী দৃঢ়তার সঙ্গে সামাল দেয়। সংবাদে প্রকাশিত নির্যাতিত এক আসামি সম্পর্কে জানা গেছে, আশৈশব অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িত সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্য মোঃ ফয়েজ কিশোর অবস্থায় আটক হয়ে কারান্তরীণ রয়েছেন। টঙ্গী কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে মারামারি ও খুন করেন। নেশাসক্ত ও বেপরোয়া এ ব্যক্তি ইতোপূর্বে অন্য কারাগারে জিহ্বা কেটে, গলায় পোচ দিয়ে শরীর কেটে নিজেকে আহত করেন। এর আগে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার পার্ট-১ এ থাকাকালে ২৭ কারা অপরাধে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। ওই আসামি নেশা করতে না পেরে গত ১৯ জুন নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে নিজেকে আহত করার চেষ্টা করে। পরে কারা প্রশাসন তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান করে। এছাড়াও কারাবন্দীরা সারাদেশের বিভিন্ন কারাগারে বিস্ময়কর নানা অপরাধ করে বেড়াচ্ছে নিয়মিত।

কারাভ্যন্তরে দীর্ঘ সময় আটক থাকায় বন্দীদের মধ্যে অনেকে নিকট আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে। এর উত্তম মাধ্যম হিসেবে কারাবন্দীরা মুঠোফোনকে বেছে নিয়েছে। সরকার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক প্রভাবপুষ্ট ক্ষমতাবান সরকারী বা বিরোধীদলীয় নেতা, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের দায়ে আটক বিভিন্ন মামলার আসামিসহ দুর্ধর্ষ সব মামলার আসামি কারাভ্যন্তরে বেশি মোবাইল ফোন ব্যবহার করে বলে কারা গোয়েন্দা সূত্র নিশ্চিত করেছে। আর মোবাইল ফোন ব্যবহারে বাধা প্রদানকারী বন্দী বা দায়িত্বরত কারাকর্মচারীদের ওপর এসব সন্ত্রাসীর নানা খড়গ নেমে আসে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উর্ধতন কারা কর্মকর্তা বলেন, কারাগারে চাকরি করলেও আমাদেরও সমাজে সন্তান ও পরিবার নিয়ে বসবাস করতে হয়। এসব সন্ত্রাসী বা দাগী আসামিদের অপরাধের ধরন অনুযায়ী শাস্তি প্রয়োগ করা হলে বা কঠোর হলে তাদের হুমকিতে আমাদের পরিবারের সদস্যদের স্বাভাবিক জীবন অনিশ্চত হয়ে পড়ে। এছাড়া কারাভ্যন্তরে আটক দুর্ধর্ষ বন্দীদের নানা অপরাধের দরুন জেলকোড অনুযায়ী শাস্তি প্রদান করা হয়। কিন্তু কোন কোন অপরাধী এতই ক্ষমতাবান ও দুর্ধর্ষ যে তাদের করা অপরাধ জেনেও কোন প্রকার শাস্তি প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না। অনেক সময় তাদের অপরাধের কথা জেনেও চুপ থাকতে হয়। কখনও কখনও এসব অপরাধীর পক্ষে সরকারী উর্ধতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ অপরাধ চলমান রাখতে সুপারিশ করেন। এতে স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। সুপারিশকৃতদের আদেশ না মানলে অন্যথায় আমাদের কর্মস্থল পর্যন্ত ত্যাগ করতে হয়। এমন উদাহারণও রয়েছে।

অপরাধ বিজ্ঞানীদের মতে, প্রযুক্তি ও কৌশলে অপরাধীদের চেয়ে কারা শৃঙ্খলা রক্ষাকারীরা অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে। তারা সমাজে সংগঠিত বিভিন্ন প্রকার অপরাধের দায়ে দ-িত হওয়ার পর বা বিচারাধীন সময়ের কারাগারে অবস্থান করায় সব ধরনের অবৈধ সুবিধা নিতে চেষ্টা করে। গ্রহণ করে নিত্যনতুন কৌশল। কারা সংশ্লিষ্টরা যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না বিধায় কারাভ্যন্তরে বন্দীরাও নানা অপরাধে জড়িত হচ্ছে। বন্দীদের এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আধুনিক যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ। তাছাড়া ব্রিটিশ আমলে প্রণীত জেলকোড পরিবর্তন করে যুগোপযোগী জেলকোড প্রণয়ন করতে হবে। কঠোর করতে হবে শাস্তি প্রয়োগের পদ্ধতি। তাছাড়া অপরাধপ্রবণতা রোধে বন্দীদের মাঝে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন বলেন, কারাগারে যেহেতু প্রায় সকল বন্দীই বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে প্রবেশ করে তাই কারাভ্যন্তরে প্রবেশের পর অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা করবে এটাই স্বাভাবিক। বাইরের জগতের মতো ভেতরেও বিভিন্ন সুবিধা গ্রহণের জন্য তারা সব ধরনের চেষ্টা অব্যহত রাখে। কারা কর্তৃপক্ষও বিভিন্ন সময়ে করা এসব বন্দীদের জেলকোড অনুযায়ী প্রায় প্রতিদিনই ছোট-বড় শাস্তি প্রদান করা হয়। নিয়মিত সার্চ কমিটির মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী বা বিতরণকারী ধরাসহ নানা সংশ্লিষ্ট সব উপাত্ত বের করতে কারা গোয়েন্দাদের দিয়ে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয়। এদের বিভিন্ন সময়ের অপরাধ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি করতে যে প্রয়োজনীয় জনবল প্রয়োজন কারা কর্তৃপক্ষের না থাকায় কিছুটা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। তবে অপরাধ সংগঠনে বন্দীদের সঙ্গে জড়িত হলে তদন্ত করে কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও বিভিন্ন প্রকার শাস্তি প্রদান করা হয়। এছাড়া কারাবন্দীরা নিত্যনতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে অপরাধে যুক্ত হচ্ছে।

এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কারা কর্তৃপক্ষ ভূমিকা কি? এমন প্রশ্নের জবাবে আইজি প্রিজন্স বলেন, কারা কর্তৃপক্ষও যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধ করা, মাদক গ্রহণ ও বিতরণসহ ব্যবসা বন্ধ করে দেয়ার জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এ চেষ্টা প্রতিনিয়ত অব্যহত রয়েছে। আমরা দেশের বিভিন্ন কারাগারে কারাবন্দীদের মোবাইল ফোনে কথা বলার মাধ্যমে অপরাধসহ কারাবন্দীদের করা নানা অপরাধ বন্ধ করতে জেলার সুপার থেকে শুরু করে অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক নিজে উপস্থিত থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কারাগার পরিদর্শন করছেন। গত কয়েক মাসে কারা গোয়েন্দাসহ সোর্সের মাধ্যমে তথ্য পেয়ে কেন্দ্রীয় কারাগারসহ জেলা কারাগারে অভিযান চালিয়ে দুর্ধর্ষ ও সন্ত্রাসীসহ বিভিন্ন বন্দীর কাছ থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মোবাইল ফোন উদ্ধার করেছি। এ অভিযান চলমান রয়েছে। এছাড়া কারাবন্দীদের মাঝে দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে থাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে কয়েদীসহ বিচারাধীন কিছু কিছু আসামি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সুবিধা যেমন কারা হাসপাতাল বা বাইরের হাসপাতালে থাকার মাধ্যমে অতিরিক্ত সুবিধা পেতে গায়ে আগুন লাগানোর চেষ্টা, হাত-পা কেটে ফেলা, আত্মহত্যা চেষ্টার ভান ধরে বা গলায় পোচ দিতে দেখা যায়। যা জেলকোড অনুযায়ী এক ধরনের অপরাধ বটে। যা আমরা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করি। তবে মাঝে মাঝে কিছু বন্দী দীর্ঘদিন কারাগারে থাকায় মানসিক বিষণœতার কারণেও আত্মহত্যার চেষ্টা করে থাকে। এর বাইরে জঙ্গী সন্ত্রাসীসহ নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সদস্যদের নজরদারির জন্য বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। এসব অপরাধী কারাবন্দীসহ সকল কারাবন্দীদের নিয়ন্ত্রণে কারা কর্তৃপক্ষ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন প্রকার প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা করেছে। কারাভ্যন্তরে জেলকোড না মানার প্রবণতা রোধে বন্দীরে উৎসাহজনক কাউন্সেলিংয়েরও ব্যবস্থা রয়েছে। কারাভ্যন্তরে জেলকোডের সঠিক প্রয়োগ করে সকল প্রকার অপরাধ বন্ধে কর্তৃপক্ষ সদা তৎপর রয়েছে।