১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ফেসবুক ও অনলাইনে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনে অপহরণের ফাঁদ

ফেসবুক ও অনলাইনে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনে অপহরণের ফাঁদ
  • অপহৃত ছাত্র উদ্ধার ॥ দুই বিকাশ এজেন্টসহ গ্রেফতার ৭

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ফেসবুক ও অনলাইনে ডিজেপার্টিসহ নানা বিষয়ে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রলোভনে ফেলে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের অপহরণের ফাঁদ পেতেছে একাধিক চক্র। বিক্রয় ডটকম অনলাইনে মোবাইল ফোন বিক্রির বিজ্ঞাপন দেয়ার সূত্র ধরে অপহৃত হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু এক ছাত্র উদ্ধারের পর মিলেছে এমন তথ্য। অপহরণের সঙ্গে জড়িত থাকায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে দুই বিকাশ এজেন্টসহ সাত জন।

রোজার মাঝামাঝি সময় রাজধানীর আদাবর থানা এলাকার বাসিন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু মোহাইমিনুল ইসলাম ওরফে আনাম বিক্রয় ডটকমে তার দামি মোবাইল ফোনটি বিক্রি করতে বিজ্ঞাপন দেয়। সে ফেসবুকে সম্প্রতি ডিজেপার্টিতে যাওয়ার দাওয়াত পায়। আগ্রহ প্রকাশ করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয় আনাম। আনাম বুঝতেও পারেনি সে অপহরণকারীদের পাতা ফাঁদে নিজের অজান্তেই পা দিয়েছে। অপহরণকারী চক্রের সদস্য শরিফ ও শাহাদৎ মোবাইল ফোনের ক্রেতা সেজে আনামের সঙ্গে যোগাযোগ করে। গত ২২ জুলাই আনামকে ক্রেতাবেশী দুই অপহরণকারী মোবাইল ফোনটি নিয়ে রাজধানীর আদাবর থানাধীন শেখেরটেকের ১ নম্বর সড়কের ইসলামী ব্যাংকের সামনে অপেক্ষা করতে বলে। আনাম যথারীতি সেখানে যায়। ক্রেতাবেশী অপহরণকারীরা একটি মাইক্রোবাস নিয়ে সেখানে অপেক্ষা করছিল। মোবাইল ফোনে কল দিয়ে আনামকে চিনে নেয় তারা। আনামের সঙ্গে মোবাইল ফোন বিক্রির দরদাম ঠিক করতে কথাবার্তা চলতে থাকে। এ সময় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়। অপহরণকারীরা আনামকে বৃষ্টিতে না ভিজে মাইক্রোবাসে বসে কথা বলতে বলে। সরল বিশ্বাসে আনাম মাইক্রোবাসে ওঠে। এর পরই মাইক্রোবাসের সব দরজা জানালা বন্ধ করে দেয়া হয়। উচ্চৈঃস্বরে গান বাজাতে বাজাতে মাইক্রোবাসটি রওনা হয় শাহবাগের দিকে। মাইক্রোবাসটির সামনে একটি মোটরসাইকেল নিয়ে অপহরণকারী চক্রের দুই সদস্য আগে আগে যেতে থাকে। অপহরণকারীরা আনামকে শাহবাগ মডেল থানাধীন তোপখানা রোডে বৈশাখী হোটেল এ্যান্ড রেস্টুরেন্টের ৫০১ নম্বর কক্ষে নিয়ে আটকে রাখে। এরপর আনামের মোবাইল থেকেই তার পরিবারের কাছে ফোন করে আনামকে অপহরণ করা হয়েছে বলে জানানো হয়। প্রাথমিকভাবে আনামের থাকা খাওয়া বাবদ ১০ হাজার টাকা দ্রুত বিকাশের মাধ্যমে পাঠাতে বলে অপহরণকারীরা।

অপহরণকারীরা বৈশাখী হোটেলের পার্শ¦বর্তী ১৭/২ নম্বর ভবনের নিচতলায় নাছির টেলিকম নামক একটি বিকাশের দোকানের নম্বর দেয়। আনামের পিতামাতা মুক্তিপনের দাবিকৃত টাকার মধ্যে ৫ হাজার টাকা নাছির টেলিকমের মালিক নাছির ও কর্মচারী বাপ্পির কাছে পাঠায়। দোকান মালিক ও কর্মচারী টাকা পাওয়ার পর তা আসামিদের কাছে পৌঁছে দেয়। তার পরও আনামকে মুক্তি দেয় না অপহরণকারীরা। এরপর আনামের মা আদাবর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। থানা ও ডিবি পুলিশ মামলার তদন্তে নামে।

২৪ জুলাই রাতে ডিবি পুলিশ বৈশাখী হোটেলে অভিযান চালায়। গ্রেফতার হয় অপহরণকারী চক্রের সদস্য মোঃ শাহাদাৎ হোসেন, মোঃ শরিফ হোসেন, নিধন চন্দ্র দাস, মোঃ সেলিম ও হোটেলবয় মোঃ আব্দুল কাদের এবং বিকাশ এজেন্ট মোঃ নাছির উদ্দিন ও কর্মচারী মোঃ বাপ্পি। গ্রেফতারকৃতদের তথ্যমতে হোটেল থেকে উদ্ধার হয় আনাম এবং অপহরণ কাজে ব্যবহৃত সেই মোটরসাইকেলটি।

শনিবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম গ্রেফতারকৃত ও উদ্ধার হওয়া আনামের বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানান। তিনি আরও জানান, আনামকে হোটেলে আটকে রেখে বেধড়ক মারধর করে কান্নাকাটির শব্দ মোবাইল ফোনে তার পরিবারকে শুনিয়ে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারীরা। টাকা না দিলে আনামকে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেয়া হয়েছিল।

গ্রেফতারকৃতরা ফেসবুক ও অনলাইনে নানা প্রলোভন দেখিয়ে এভাবেই অপহরণের ফাঁদ পেতে রাখত। অপহরণকারী চক্রের সঙ্গে হোটেলের মালিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং গ্রেফতারকৃত বিকাশ এজেন্টদের যোগাসাজশ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই হোটেলটিতে অপহৃতদের আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করা হচ্ছিল। অপহরণের সঙ্গে জড়িত অন্যদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

আনামের পিতা ফখরুল ইসলাম জানান, তার বাড়ি ভোলায়। তিন ছেলের মধ্যে বড় ছেলে মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র। দ্বিতীয় ছেলে অপহৃত হয়েছিল। আর তৃতীয় ছেলে রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল এ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। ব্যক্তি জীবনে তিনি কারা অধিদফতরে চাকরি করতেন। ১৯৮৩ সালে সৌদি আরব চলে যান। ২০০৩ সালে দেশে ফিরে শেয়ার ব্যবসা করছেন। পরিবার নিয়ে থাকছেন আদাবরের শেখেরটেকের এক নম্বর সড়কের ৩২ নম্বর ছয়তলা বাড়ির চতুর্থ তলায়। মূলত মোবাইল ফোন বিক্রির বিজ্ঞাপন দেয়ার সূত্রধরেই আনাম অপহৃত হয়েছিল। অপহরণের পেছনে অন্য কোন কারণ বা কোন শত্রুতা নেই। আনাম ঢাকার সিএমএম আদালতে বিচারকের কাছে জবানবন্দীও দিয়েছে। জবানবন্দীতেও আনাম এমন কথাই জানিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের উপ-কমিশনার মুনতাসিরুল ইসলাম, ডিবির পশ্চিম বিভাগের ডিসি মোঃ সাজ্জাদুর রহমান, দক্ষিণ বিভাগের ডিসি মাশরুকুর রহমান খালেদ এবং অপহৃত আনামের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।