১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মোবাইল ফোনে প্রতারক চক্রের নেটওয়ার্ক ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে

  • ব্যবহার হচ্ছে রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিম

শর্মী চক্রবর্তী ॥ গ্রাম্য এক গৃহবধূর কাছে হঠাৎ একটা ফোন যায়। মার্জিত ও সুমধুর কণ্ঠে ওই প্রান্ত থেকে বলা হয়- তিনি কাস্টমার কেয়ার থেকে বলছেন। কারণ জানতে চাইলে বলা হয়, তিনি ৫ লাখ টাকার লটারি জিতেছেন। এ জন্য তাকে পুরস্কার দেয়া হবে। একই সঙ্গে বলা হয় ওই নম্বরে পরে যোগাযোগ করতে। দ্বিতীয় দিন ওই নম্বর থেকে আবারও ফোনে গৃহবধূকে জানানো হয় পুরস্কার রেডি করতে ৫ হাজার টাকা লাগবে। গৃহবধূ ওই নম্বরে সরল বিশ্বাসে বিকাশের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিলেন ৫ হাজার টাকা। এর পর ওই নম্বর থেকে মেসেজ আসে ‘আপনি ৫ লাখ টাকা পুরস্কার জিতেছেন।’ তৃতীয় দিন ওই নম্বর থেকে ফোন করে বিভিন্ন অফার দিয়ে ১০ হাজার টাকা চাওয়া হয়। এবারও সরল বিশ্বাসে ১০ হাজার টাকা বিকাশ করা হয়। এর আগে ফোন করে বলা হয়, কাউকে যেন বিষয়টি জানানো না হয়। ওই গৃহবধূ ১০ হাজার টাকা বিকাশে পাঠানোর পর ওই নম্বরে ফোন দিয়ে দেখেন নম্বরটি বন্ধ। এই সহজ-সরল গৃহবধূর মতো প্রায় প্রতিদিন এমন প্রতারণার ফাঁদে পড়েন সাধারণ মানুষ। রাজধানীসহ সারাদেশে বেপরোয়া হয়ে পড়েছে প্রতারক চক্র। প্রতারক চক্রের সদস্যরা কখনও নিজেদের শীর্ষ সন্ত্রাসী, কখনও পুলিশ বা গোয়েন্দা সদস্য, কখনও বা জিনের বাদশা, কখনও মন্ত্রী এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু পরিচয়ে কখনও আবার কাস্টমার কেয়ারের নাম করে ফোন দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে। প্রতারণায় ব্যবহার হচ্ছে রেজিস্ট্রেশনবিহীন বিভিন্ন কোম্পানির মোবাইল সিমকার্ড ও বিকাশ এ্যাকাউন্ট। সারা বছরই দেশজুড়ে এদের দৌরাত্ম্য থাকে। যার মাধ্যমে প্রতারকরা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা।

ভুক্তভোগী একাধিক মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই চক্রের লোকজন প্রথমে টার্গেট করে বিভিন্ন নম্বরে কল করেন। তাদের মূল লক্ষ্য গ্রামের মহিলারা। কল করার পর পুরুষ কণ্ঠ হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা ফোন রেখে দেয়। আবার নারী কণ্ঠ পেলে কথা দীর্ঘায়িত করে। প্রতারক চক্রটির কথা বলার ধরনও অনেকটা কাস্টমার কেয়ারে কর্মরত অফিসারদের মতোই ভদ্র,অমায়িক এবং চটপটে। প্রাথমিক অবস্থায় তাদের কথা শুনে যে কেউ মনে করবে মোবাইল অপারেটরের অফিস থেকেই হয়ত ফোনটি এসেছে। ফোন দিয়ে প্রতারক চক্রটি যদি বুঝতে পারে এখানে কাজ হবে, তবে তারা লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যায়। প্রাথমিক অবস্থায় তারা কোনও টাকা-পয়সার কথা বলে না। শুধু ফোন দিয়ে বলা হয় যে ‘তাদের কোম্পানি লটারির মাধ্যমে আপনাকে সেরা গ্রাহক নির্বাচিত করেছে। এজন্য আপনি ২-৩ লাখ টাকার একটি পুরস্কার পাবেন’। কিছু সময় পর ফোন দিয়ে অন্য একটি নম্বর, অথবা অনেক ক্ষেত্রে ওই নম্বরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। এটাও বলা হয় যে, ওই পুরস্কার পেতে হলে ট্যাক্সসহ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হবে। এ জন্য ফ্লেক্সিলোড বা বিকাশ করতে বলা হয়। এ ধরনের প্রতারণার শিকার হয়ে অনেক নিরীহ মানুষ অনেক টাকা গচ্ছা দিয়েছেন।

স¤প্রতি নতুন একটি চক্র প্রিয়জন দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত জানিয়ে তাৎক্ষণিক চিকিৎসার কথা বলে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এই চক্রের লোকজন হঠাৎ করেই আপনাকে কাস্টমার কেয়ারের পরিচয় দিয়ে নেটওয়ার্ক উন্নয়নের কথা বলে আধা ঘণ্টার জন্য মোবাইল বন্ধ রাখতে বলবে। এর পর আপনার মোবাইল ফোনটি বন্ধ হওয়ার পর আপনার নিকট আত্মীয়দের কাছে ফোন দিয়ে বলবে আপনি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। আপনাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। চিকিৎসা বা অপারেশনের প্রয়োজনীয় খরচের জন্য দ্রুত কিছু টাকা বিকাশ করার কথা বলবে। এক্ষেত্রে প্রতারক চক্রটি আপনার নিকট আত্মীয়ের নম্বর কৌশলে সংগ্রহ করেন। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, কাস্টমার কেয়ারের সহায়তায় অনেক সময় এ চক্রটি ফ্রেন্ডস এ্যান্ড ফ্যামেলি নম্বর যোগাড় করে প্রতারণার ফাঁদ পাতে।

কাস্টমার কেয়ারের অফিসারের পাশাপাশি আরেকটি চক্র নিজেদের জিনের বাদশা পরিচয় দিয়ে থাকে। জিনের বাদশা পরিচয়ধারীরা মোবাইলে ফোন দিয়ে প্রথমে আপনাকে পবিত্র কোরান শরিফের বিভিন্ন আয়াত শোনাবে। এর পর বিভিন্ন মাজারের অজুহাত দেখিয়ে আপনার কাছ থেকে হাদিয়া চাওয়া হবে। একই সঙ্গে বলা হবে আপনি সৌভাগ্যবান ব্যক্তি বলেই আপনাকে ফোন দেয়া হয়েছে। আপনি টাকা না দিলে আপনার নানা সমস্যা হতে পারে। আর এ চক্রটি সাধারণত গভীর রাতে ফোন দিয়ে থাকে।

এছাড়া আরেকটি নতুন কৌশল হলো ফ্লেক্সিলোডের কথা বলে প্রতারণা। ‘ভাই, আমি ফ্লেক্সিলোড দোকানের কর্মচারী। ভাই, ভুল করে আপনার মোবাইল ফোনে ৫-৭ হাজার টাকা চলে গেছে। একটি ম্যাসেজ পেয়েছেন তো। প্লিজ ভাই, মালিক জানতে পারলে আমার চাকরি চলে যাবে। আমি একটি বিকাশ নম্বর দিতে পারি। এক হাজার টাকা কম দিয়েন।’ এভাবেই মেসেজ দিয়ে আরেকটি চক্র প্রতারণা শুরু করেছে। আসলে ওই মেসেজে টাকার ফ্লেক্সিলোডের কথা বলা থাকলেও মূল এ্যাকাউন্টে কোন টাকা জমা হয় না। বিশেষ কৌশলে কোন ব্যালেন্স যুক্ত না করেই এরা বিভিন্ন গ্রাহকের মোবাইলে মেসেজ পাঠায়। অনেকেই প্রকৃত ফ্লেক্সির কথা মনে করে সরল বিশ্বাসে কিছু টাকা বিকাশ করে ফেরত দেন। আর এভাবে এ চক্রটি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানায়, সম্প্রতি প্রতারক চক্র প্রতারণায় ব্যবহার করছে সুন্দরী রমণীদের। বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি, কলেজ বা কলগার্লদের কাজে লাগিয়ে তাদের দিয়ে রং নম্বরে ফোন দেয়ায়। অন্য প্রান্ত থেকে কোন পুরুষ কণ্ঠ নিশ্চিত হলে রং নম্বর বলে কেটে দেয়া হয়। এভাবে কয়েকদিন ফোন দেয়ার পর ওই ব্যক্তির সঙ্গে প্রতারক সুন্দরী রমণীর ভাল সম্পর্ক গড়ে তোলে। একপর্যায়ে সেই সম্পর্ক থেকে প্রেম এমনকি বিয়েসহ ওপেন অশ্লীল আলাপচারিতা চলে। এভাবে ১ মাস বা ৩ মাসের টার্গেট নিয়ে ওই ব্যক্তিকে একটি ফ্লাটে এনে নগ্ন করে ছবি ও ভিডিও করে ট্র্যাপ ফেলে। পরে ওই ছবি বা ভিডিও ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। এসব চক্রের প্রধান টার্গেট থাকে রাজনৈতিক ব্যক্তি বা উচ্চপদস্থ সরকারী-বেসরকারী কর্মকর্তা এবং শিল্পপতি বা ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। কখনও কখনও এরা কলেজ- বিশ্ববিদ্যলয়ে পড়ুয়া ধনাঢ্য পরিবারের সন্তানদের টার্গেট করে।

র‌্যাবের একটি সূত্র জানায়, রাজধানীর অভিজাত এলাকায় এ চক্রের নারী সদস্যরা অফিস, বাসস্ট্যান্ড, মার্কেট ও খাবার দোকানে বিভিন্ন ব্যক্তিকে টার্গেট করে। পরে ছলনার মাধ্যমে মোবাইল নম্বর আদান-প্রদান করে এবং মোবাইলে কথোপকথনে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে। সম্পর্ক কিছুটা গভীর হলে একপর্যায়ে পূর্ব নির্ধারিত ফ্ল্যাটে ওই ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে যায় এবং তার সঙ্গে অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয়। এমন সময় ওই চক্রের পুরুষ সদস্যরা আকস্মিক ওই ঘরে প্রবেশ করে নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে অসামাজিক কাজে লিপ্ত থাকার দায়ে প্রেমিককে মারধর করে। তারপর ওই ব্যক্তির সঙ্গে ওই নারীর নগ্ন ছবি তুলে তার আত্মীয়স্বজন কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারের ভয় দেখিয়ে নিয়মিতভাবে চাঁদা আদায় করতে থাকে। কখনও ওই একই নারী ব্যবহার করে বিভিন্ন ফ্ল্যাটে দেহ ব্যবসা গড়ে তোলে। আবার কখনও এই চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন পণ্যের সেলস এজেন্ট হিসেবে বিভিন্ন অফিসে গিয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গের নম্বর সংগ্রহ করে ওই চক্রের নারী সদস্যদের মাধ্যমে ওই লোকগুলোর সঙ্গে ফোনে সম্পর্ক গড়ে তোলে। সম্পর্ক গড়ার পর একইভাবে তাদের বাসায় নিয়ে জিম্মি করে প্রতারণার মাধ্যমে সর্বস্ব লুট করা হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা, অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে জিম্মি করে প্রতারক চক্র। কিছুদিন আগে রাতে রাজধানীর দক্ষিণখান ও উত্তরা পূর্ব থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে র‌্যাবের একটি দল আটক করে ৬ প্রতারককে। ডিবি পুলিশ পরিচয়ে নির্যাতন ও অশ্লীল ছবি তুলে চাঁদা আদায় করত এরা। আটকরা হলেন- খায়রুল আলম ওরফে রবিউল, পান্নু মিয়া, সাইফুল ইসলাম নিলয়, খাইরুল ইসলাম মনির, শামীমা আক্তার তৃষ্ণা ও উম্মে তাসনিন ইভা। তাদের কাছ থেকে দুটি হ্যান্ডকাপ, ৩টি পুলিশের আইডি কার্ড, ব্ল্যাকমেলিংয়ের কাজে ব্যবহৃত ১টি ক্যামেরা, ভিকটিমের ৪টি আপত্তিকর ছবি, ব্ল্যাকমেলিংয়ের ২২ হাজার ৪৫০ টাকা, ৯টি মোবাইল ফোন ও ১টি লাঠিসহ হাতেনাতে আটক করা হয়।

প্রতারক চক্র বিকাশের মাধ্যমে টাকার লেনদেন করে। প্রতারক চক্র কোন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হলে একটি বিকাশ নম্বর দেয় প্রতারণার ফাঁদে ফেলা ব্যক্তিকে। এর পর যে পরিমাণ টাকা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয় চক্রটি ওই পরিমাণ টাকা বিকাশে পাঠিয়ে দিতে বলে। বিকাশ করা এসব মোবাইল সিমের অধিকাংশের কোন সঠিক রেজিস্ট্রেশন থাকে না। ভুয়া ছবি ও রেজিস্ট্রেশনে যেকোন মোবাইল কোম্পানির সিম পাওয়া সহজ হওয়ায় প্রতারক চক্র একাধিক সিম ব্যবহার করে। অজ্ঞাত এক ব্যক্তি এক ইউপি চেয়ারম্যানের মোবাইল ফোনে ফ্লেক্সিলোড করে ২০০ টাকা পাঠায়। পরে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি ফোন করে চেয়ারম্যানকে বলে, ভাই! ভুলক্রমে আপনার মোবাইলে ২০০ টাকা চলে গেছে। টাকাটা ফেরত দিলে আমার উপকার হবে। এরপর চেয়ারম্যান টাকা ফেরত দেন। পুনরায় ৩০০ টাকা পাঠিয়ে একইভাবে ফেরত নেয় অজ্ঞাত ব্যক্তি। টাকা ফেরত নিয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তি চেয়ারম্যানের প্রশংসা করে তার বিশ্বস্ততা অর্জন করে। এভাবে মোবাইলে কথাবার্তার মাধ্যমে তাদের মধ্যে সখ্য গড়ে ওঠে। এক পর্যায়ে চেয়ারম্যান ব্যক্তিগত কাজে ঢাকায় এলে তাকে জিম্মি করে। এর পর তার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতারকরা। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ এ ঘটনায় নারীসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করে।

মোবাইল ফোনে সবচেয়ে বেশি প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে মফস্বল, উপজেলা ও জেলা শহরে। সরল-সহজ অথবা অশিক্ষিত নারী ও কিছুটা অসচেতন মানুষ এদের খপ্পরে পড়ে বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। ক্ষতির শিকার হলেও প্রতিকার পেয়েছেন এমন খবর জানা যায়নি। অধিকাংশ ভুক্তভোগীই জানেন না কীভাবে এর প্রতিকার পাবেন। ফলে তারা কোথাও অভিযোগ জানাতে পারেন না। এছাড়া বড় বড় ব্যবসায়ীও মোবাইলের মাধ্যমে প্রতারণার টার্গেটে থাকেন।

এসব চক্রের সদস্যরা অনেক সময় ধরা পড়লেও হোতাদের নাগাল পাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আবার গ্রেফতার হয়ে জেলে যাওয়ার পর কতিপয় অসাধু আইনজীবীর মাধ্যমে জামিনে ছাড়া পেয়ে তারা আবার নেমে পড়ে প্রতারণায়। একেক সময় একেক পরিচয়ে প্রতারক চক্র সক্রিয় থাকায় এদের মূল উৎঘাটন করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও।

গত ২৭ জুন রাজধানীর মিরপুর-১ এর বাসিন্দা এক গৃহবধূকে ফোন করে বলা হয় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিপু মনির উদ্যোগে গ্রামীণফোন থেকে একটি লটারি ছাড়া হয়েছে। আপনি গ্রামীণফোনের গ্রাহক হিসেবে ওই লটারির মাধ্যমে ২০ লাখ টাকা পেয়েছেন। এমন সুসংবাদ পেয়ে ওই গৃহবধূ কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। তিনি পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে বলেন এখন কি করতে হবে। তখন প্রশ্নের উত্তরে ফোন করা ব্যক্তিরা (প্রতারক চক্র) বলে ০১৭৮২৮১৪৮১২ নম্বরে বিকাশ করে ৫০ হাজার টাকা পাঠাতে হবে। এ টাকা পাঠালে আপনাকে ২০ লাখ টাকা দেয়া হবে। প্রতারকদের এমন লোভনীয় প্রস্তাবে ওই গৃহবধূর বুঝতে বাকি থাকে না তিনি প্রতারণার ফাঁদে পড়তে চলেছেন। বুদ্ধি খাটিয়ে তিনি বলেন, ২০ লাখ টাকা থেকে ৫০ হাজার টাকা রেখে বাকি টাকা পাঠিয়ে দেন। এর পর প্রতারকরা আর তাকে ফোন করেননি। পরে বিষয়টি গোয়েন্দা পুলিশকে জানালে পুলিশ নম্বরটি বন্ধ পায়।

সম্প্রতি এক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) শিক্ষামন্ত্রীর পিএস পরিচয়ে ফোন দেয় এক দুর্বৃত্ত। দুর্বৃত্ত বলে, আপনার উপজেলার এক বাসিন্দা ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। তার ক্লিনিক খরচসহ এ্যাম্বুলেন্স ভাড়া বাবদ ২০ হাজার টাকা লেগেছে। আপনি দয়া করে যদি আমাকে টাকাটা বিকাশ করে দিতেন উপকার হতো। দুর্বৃত্তের এ কথায় বিশ্বাস করে ওই ইউএনও পাঠিয়ে দিলেন ২০ হাজার টাকা। এরপর তিনি ওই গ্রামে খোঁজ নিয়ে দেখেন কেউ মারা যায়নি। পরে ইউএনও ফোন করে দুর্বৃত্তের ব্যবহৃত ওই নম্বরটা বন্ধ পান।

মোবাইল ফোনে প্রতারণা ও চাঁদাবাজির মূল কারণ হচ্ছে ব্যবহৃত সিমের কোন আসল কাগজপত্র নেই। সরেজমিন দেখা গেছে, রাজধানীর ফার্মগেট, মতিঝিল, গুলিস্তানসহ বিভিন্ন এলাকায় খোলাবাজারে কোন রকম রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই সিম বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬০ থেকে ১৫০ টাকায়।

একাধিক সিম ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা বিভিন্ন স্টুডিও থেকে ছবি সংগ্রহ করে আনুমানিক নাম বসিয়ে সিম কোম্পানিতে জমা দিয়ে দেন। ক্রেতাদের কাগজপত্র নেন না কেন জানতে চাইলে বলেন, সবকিছু ঠিকমতো নেয়া হলে সারা দিনে ২টা সিমও বিক্রি করা যাবে না। অথচ এভাবে দিনে তারা শতাধিক সিম বিক্রি করেন। সিম বিক্রেতাদের পাশাপাশি সঠিক পদ্ধতি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দিয়ে সাধারণ মানুষেরও সিম কেনার ব্যাপক প্রবণতা রয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, কমবেশি সারা বছরই প্রতারক চক্র সক্রিয় থাকে। সারা বছরই এদের দৌরাত্ম্য থাকে সব জায়গায়। তবে ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে প্রতারণার ঘটনায় কোন অভিযোগ পাওয়া যায় না। নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে পুলিশ তখন কাজ করতে পারে। তাই প্রতারণার বিষয়ে সঠিক পরিসংখ্যান রাখা মুশকিল। এছাড়া কারা কারা প্রতারক চক্রের হয়ে কাজ করে তাদের বিষয়েও সুনির্দিষ্ট করে তথ্য- উপাত্ত সংগ্রহ করা মুশকিল হয়ে পড়ে।

তবে ভুক্তভোগীদের মতে প্রতারণার ঘটনায় মামলা বা অভিযোগ আগে থানা পুলিশের কাছে করা গেলেও এখন প্রতারণার ঘটনায় মামলার তদন্ত করছে একটি সিভিল সংস্থা। তাই এ বিষয়ে পুলিশের কাছে গিয়ে অনেক সময় কোন লাভ হয় না। দেশে প্রতিদিন কত লোক প্রতারক চক্রের হাতে প্রতারিত হচ্ছে তার সঠিক কোন পরিসংখ্যান নেই। পুলিশ সদর দফতরের ওয়েবসাইটে অপরাধ পরিসংখ্যানেও নেই প্রতারণার ঘটনায় আটক বা মামলার পরিসংখ্যান। তারা আরও জানান, রাজধানীর চেয়ে প্রতারণার ঘটনা বেশি ঢাকার বাইরের বিভাগ, জেলা ও থানাগুলোতে ঘটে বেশি। কিছু ঘটনায় তদন্ত করতে গিয়ে দেখা গেছে রংপুর, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, গফরগাঁও বরিশাল অঞ্চলে প্রতারণার ঘটনা বেশি। এসব এলাকার প্রতারক চক্র দেশের বিভিন্ন এলাকায় নানা পরিচয়ে প্রতারণা করে। প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া অর্থের লেনদেন হচ্ছে বিকাশে। কোন নির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় বিকাশের মাধ্যমে প্রতারণা করে অর্থ হাতিয়ে নেয়া সহজলভ্য। বিকাশে অর্থ লেনদেনে ক্রিমিনালের কোন রেকর্ড থাকে না। ফলে তাকে গ্রেফতার করাও সম্ভব হয় না।