১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রাজন হত্যা মামলায় পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা লোক দেখানো!

  • প্রত্যক্ষদর্শী আয়াজ আলী তিন দিনের রিমান্ডে

স্টাফ রিপোর্টার, সিলেট অফিস ॥ সিলেটে শিশু রাজনকে নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার আয়াজ আলীর (৪৫) ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। শনিবার বিকেলে সিলেট মহানগর হাকিম আদালত-২ এর বিচারক সাহেদুল করিম ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ইন্সপেক্টর সুরঞ্জিত তালুকদার ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত এ আদেশ দেন। শুক্রবার রাত দুইটার দিকে সিলেটের কুমারগাঁও বাসস্টেশনের শেখপাড়া থেকে আয়াজ আলীকে গ্রেফতার করা হয়। আয়াজ আলী পেশায় রং মিস্ত্রি। তিনি রাজনকে নির্যাতনের প্রত্যক্ষদর্শী বলে দাবি করেছে ডিবি। এ নিয়ে এই ঘটনায় ১২ জনকে আটক করা হয়েছে। আয়াজের স্ত্রী রাশেদা আক্তার বলেন, রাজন হত্যার কিছুদিন আগে মামলার প্রধান আসামি মুহিত আলম তাঁদের এক ছেলেকে মারধর করেন। বিষয়টি সম্প্রতি একটি টেলিভিশনের সাক্ষাতকারে আসে। এ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেয়া হবে বলে রাতে তাঁর স্বামীকে নিয়ে যায় ডিবি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাজনকে নির্যাতনের প্রথম দিকে ঘটনাস্থলে ছিলেন আয়াজ। পরে তিনি সেখান থেকে সরে যান। পরবর্তী সময়ে রাজনকে নির্যাতন ও হত্যার বিরুদ্ধে স্থানীয় জনতার সঙ্গে প্রতিবাদে যোগ দেন তিনি। ঘটনার সঙ্গে ‘সরাসরি জড়িত’ আটজনকে আটক করে পুলিশে দেয় জনতা। এছাড়া ঘটনা ‘প্রত্যক্ষ’ করা আয়াজসহ তিনজন ও এক আসামির স্ত্রীকে পুলিশ গ্রেফতার করে।

পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা লোক দেখানো ॥ সিলেটের চাঞ্চল্যকর শিশু রাজন হত্যাকা-ের ঘটনা নিয়ে পুলিশের গাফিলতি, আসামিদের সহায়তা করা, মামলা দিতে যাওয়া রাজনের বাবার সঙ্গে দুর্ব্যবহারের ঘটনা তদন্তের পর দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তি গ্রহণকে লোক দেখানো বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন সচেতন সমাজ। রাজন হত্যার পর ঘটনা আড়াল করে এক আসামিকে বিদেশ পালিয়ে যেতে ও অপরদের রক্ষা করতে পুলিশ তৎপর হয়ে উঠে। মামলা দিতে গেলে রাজনের বাবাকে ধাক্কা দিয়ে থানা থেকে বের করে দেয়া হয়। ঘটনার আদ্যোপান্ত জেনেও থানায় রাজনকে চোর ও তারা বাবাকে চোরের বাপ বলে ধমক দিয়ে মুখ বন্ধ করার প্রচেষ্টা চালানো হয়। ইন্টারনেটে রাজন নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ ও মিডিয়ায় সেটা ফলাও করে প্রচারের কারণে রাজন হত্যার বিচার প্রক্রিয়া আলোর মুখ দেখতে শুরু করে। সেটা ব্যাপকভাবে প্রচার মাধ্যমে না এলে রাজন চোর এবং তার বাবাকেও শেষ পর্যন্ত চোরের বাপ হিসেবে হয়ত বাস করতে হতো। রাজন হত্যাকা- নিয়ে পুলিশের বাণিজ্যিক কর্মকা-ের বিষয় ব্যাপকভাবে আলোচিত। রাজন হত্যার ঘটনায় যেখানে প্রত্যক্ষদর্শী, অভিযুক্তদের পরিবারের সদস্যদেরও রিমান্ডে নেয়া হচ্ছে সেখানে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া সত্ত্বে তারা পার পেয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উত্থাপন হচ্ছে। নির্মম এই ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার শাস্তি হবে কি না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। প্রত্যাহার আর সাময়িক বরখাস্ত আদতে কোন সাজাই নয় বলে জানিয়েছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

রাজন হত্যাকা-ের পর ঘটনা ধামাচাপা ও আপোস রফা করতে বিভিন্ন পর্যায়ের তদবির শুরু হয়। স্থানীয় এক ইউপি সদস্য, সরকারী সংবাদ সংস্থার স্থানীয় এক সাংবাদিক ও থানার দালাল ঘটনা ধামাচাপা দিতে তৎপরতা চালান। শিশু রাজনের বাবা আজিজুর রহমানকেও আপোস রফার প্রস্তাব দেয়া হয়। জানা যায়, কেবল এ ঘটনা নয়, বিভিন্ন সময় পুলিশের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলেও তাদের শাস্তি হয় না। প্রাথমিক শাস্তি কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার এবং সাময়িক বরখাস্ত পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে বিভাগীয় ব্যবস্থা।

অপরাধ বিশেষকরা বলছেন, বিভাগীয় তদন্তের আড়ালে অনেক সময়ই অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। আর প্রত্যাহার বা সাময়িক বরখাস্তের নামে যে শাস্তি দেয়া হয়, তা মূলত কোন শাস্তির পর্যায়েই পড়ে না। কোন বড় ঘটনা ঘটলে এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই বদলি, প্রত্যাহার, ক্লোজ এবং সাময়িক বরখাস্তের শাস্তি দেয়া হয়। এসব শাস্তিতে সাময়িকভাবে কাজের ‘বিঘœ ঘটা’ ছাড়া কোন প্রভাবই পড়ে না পুলিশ সদস্যদের মধ্যে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে বড় শাস্তি পেতে হয় না অভিযুক্তকে। ফলে প্রচলিত এই শাস্তি পুলিশের অপরাধ কমাতে কোন ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলেন, সাময়িক বরখাস্ত ও প্রত্যাহার কোন শাস্তিই নয়। এর মাধ্যমে কোন চাঞ্চল্যকর ঘটনায় জনমনে স্বস্তি দেয়ার চেষ্টা করা হয়। এই কৌশলে পুলিশের অপরাধী সদস্যরা পার পেয়ে যায়। পরে তদন্ত আর আলোর মুখ দেখে না। তাই পুলিশ সদস্যদের অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরী। প্রয়োজনে বিধিমালা সংশোধন করে শাস্তি কার্যকর করা প্রয়োজন।

জানা যায়, প্রাথমিক ব্যবস্থা নেয়া তিন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করতে পুলিশ হেড কোয়ার্টারকে সুপারিশ করা হবে। তদন্ত প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে থানার সেকেন্ড অফিসার এস আই জাকির হোসেন ও এস আই আমিনুল ইসলামকে সাসপেন্ডে করা হয়েছে। থানার ওসি (তদন্ত) আলমগীরকে ক্লোজড করা হয়েছে।