২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মৃত্যুর ঝুঁকি- তবু ওরা ছাড়ে না পাহাড়

মৃত্যুর ঝুঁকি- তবু ওরা ছাড়ে না পাহাড়

মোয়াজ্জেমুল হক, চট্টগ্রাম অফিস ॥ পাহাড় ওদের প্রাণহরণ করে। তবুও ওরা পাহাড় ছাড়ে না। নিরাপদ বসবাসের জন্য ওরা বিপদের ঝুঁকিকে পরোয়া করে না। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসে চট্টগ্রামে মৃত্যুর মিছিল। ওরা মরছে। কখনও উদ্ধার হচ্ছে। কখনও পাহাড়ের মাটিচাপা পড়ে ওদের সমাধি হচ্ছে। প্রশাসনের কড়া নির্দেশ, উচ্ছেদ অভিযানসহ বহুমুখী তৎপরতা ওরা থোড়াই কেয়ার করে। পাহাড়ের পাদদেশে ওদের নির্মিত বাড়িঘর ভেঙ্গে দেয়া হয়। সমূলে উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু তাতে কি। ওরা আবার গড়ে তোলে নতুন বসতি। আর যাবেই বা কোথায়? ওরা তো ছিন্নমূল। নদী সিকস্তি এলাকার নারী-পুরুষও রয়েছে তাদের সঙ্গে।

চট্টগ্রামে পাহাড় কেটে ধ্বংস করা, আবার পাহাড়ের পাদদেশে বিক্ষিপ্তভাবে গরিব অসহায় মানুষের বস্তিরূপে বাড়িঘর নির্মাণ করে বসতির চিত্র নতুন নয়। বছরের পর বছর চট্টগ্রামের অসংখ্য পাহাড়কে কেন্দ্র করে এসব বসতি গড়ে উঠেছে। ওরা রিক্সাচালক, ভ্যানচালক, ট্যাক্সিচালক, হত দরিদ্র দিনমজুর, খেটে খাওয়া মানুষ। নারীদের মধ্যে অনেকেই হোটেল রেস্তরাঁয় মরিচ বাটা ও বিত্তবানদের বাড়ি ঘরে বুয়ার কাজ করে আয় রোজগারে নিয়োজিত। আয়ের চেয়ে বেশি বাসাভাড়া দিয়ে থাকার সুযোগ এদের কোথায়। তাই তো ভয়ঙ্কর ও প্রতিটি মুহূর্ত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারে এমন পরিবেশে ওরা বসবাস করে।

নানা চড়াইউৎরাই পেরিয়ে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে এখনও তেরটি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে অসংখ্য হত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বসবাস। গত কিছুদিন ধরে প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে কঠোরভাবে। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারে নগণ্য বললেও অত্যুক্তি হবে না। আর গত কয়েকদিন ধরে যেভাবে শ্রাবণের অঝোর ধারা এ নগরীতে অব্যাহত রয়েছে তাতে উচ্ছেদ অভিযানও থমকে রয়েছে। চট্টগ্রামে বর্ষা মৌসুম এলেই পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস নিয়ে প্রশাসন সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করে ঠিকই। কিন্তু বিক্ষিপ্ত কিছু অভিযান চালিয়ে তাদের দায়িত্ব শেষ করে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সর্বশেষ গত ঈদের পরদিন নগরীর লালখান বাজার ও বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় পাহাড় ধসের দুটি ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৫ শিশুসহ ৬ জন। বর্তমানে যেভাবে বর্ষণ অব্যাহত রয়েছে তাতে পাহাড়ে আরও ধসের আশঙ্কা রয়েছে। গত আট বছরে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় ও ভূমিধসে প্রায় ২শ’ নারী-পুরুষ ও শিশুর প্রাণ ঝরে গেছে। ২০০৭ সালে চট্টগ্রাম সেনানিবাস সংলগ্ন এলাকায় প্রবল বর্ষণে ৭টি স্থানে পাহাড় ধসের পাশাপাশি জলাবদ্ধতায় ১২৭ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনাটি সকল মহলকে নাড়া দিলেও সময়ের স্রোতধারায় অনেকের স্মৃতি থেকে তা মুছেও গেছে। ২০১২ সালে নগরীর চারটি স্থানে পাহাড় ধসে প্রাণ হারায় ১৮ জন। পাহাড় ধসে বড় বড় মৃত্যুর এ ঘটনা ছাড়াও স্বল্পসংখ্যার মৃত্যুর ঘটনা প্রতি মৌসুমেই ঘটে চলেছে। বর্তমানে চট্টগ্রামে যে তেরটি পাহাড় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এগুলোর পাদদেশে বস্তিঘরের সংখ্যা কম নয়। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে নগরীর লালখান বাজার মতিঝর্ণা এলাকার পাহাড়। আরও রয়েছে টাঙ্কির পাহাড়, বায়েজিদ এলাকার বেশ কয়েকটি পাহাড়, আকবর শাহ এলাকার পাহাড়সহ অন্যান্যগুলো। বিগত এক/এগার সরকার আমলে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসের বিরুদ্ধে কমিটি গঠন করে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এর সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনও অদৃশ্য।