১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মশক নিধন কার্যক্রম স্থবির, বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ

নিখিল মানখিন ॥ রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। চলতি মাসে ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়েছে ৬১ জন। জুনেও ১৫ জন আক্রান্ত হয়। বেসরকারী পরিসংখ্যানে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। রাজধানীতে জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি হয়ে থাকে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা। মশক নিধন কার্যক্রমের স্থবিরতা, গাইডলাইনের অভাব এবং মানুষের অসচেতনতাই ডেঙ্গুর প্রকোপের জন্য দায়ী বলে মনে করছেন তাঁরা।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নির্ণয় ও রোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাজধানীতে ২০১১ সালে রেকর্ডসংখ্যক মানুষ ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই বছর জুনে ৬১ জন, জুলাইয়ে ২৫৫ জন, আগস্টে ৬৯১ জন, সেপ্টেম্বরে ১৯৩ জন এবং অক্টোবরে আক্রান্ত হয় ৮৬ জন। আর ২০১২ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় ১২শ’ ৮৬ জন। এভাবে ঢাকায় ২০১০ সালে ২৫৭ জন, ২০০৯ সালে ৪৭১ জন, ২০০৮ সালে ১১শ’ ৫১ জন এবং ২০০৭ সালে ৪৭১ জন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়। ২০১৪ সালের জুলাইয়ে আক্রান্ত হয়েছিল ১২২ জন এবং ওই বছরে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৭শ’ জনের মতো। আর চলতি বছর ইতোমধ্যে জুলাই মাসে ৬১ জন আক্রান্ত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ন্যাশনাল ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে জানা গেছে, চলতি বছরে ১ জুন থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ৭৬ ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে জুনে ১৫ জন ও জুলাই মাসের ২১ তারিখ পর্যন্ত ৬১ জন ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। ভর্তিকৃত মোট ডেঙ্গু জ্বরের রোগীর মধ্যে হলিফ্যামিলি হাসপাতালে ৪ জন, বারডেমে ৪ জন, বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১১ জন, ইবনেসিনায় ১৯ জন, স্কয়ারে ২ জন, মনোয়ারাতে ২ জন, ইউনাইটেডে ১০ জন, খিদমাহতে ৩ জন ও এ্যাপোলো হাসপাতালে ১৯ জন ভর্তি হয়েছেন।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রতিবছর জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকে। যথাযথ সরকারী উদ্যোগ না থাকায় এ বছরও এডিস মশার কামড় থেকে রক্ষা পাচ্ছে না নগরবাসী। নগরীর সরকারী ও বেসরকারী হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোতে অনেক ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে। সারাদেশের ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃতের সঠিক সংখ্যা জানে না সরকার। কিন্তু হাসপাতাল-ক্লিনিক ছাড়াও চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে ডেঙ্গু রোগীর আগমন বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করেন, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের বিশেষ মশক নিধন কার্যক্রম চালু নেই। পানি মেশানো ওষুধ ছিটানোর মাধ্যমেই নিজেদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখছে ডিসিসি। মশক নিধন কার্যক্রমের বরাদ্দ নিয়ে লুটপাটের খেলা চলে। বাড়তি টাকা না দিলে কোন বাসা বা এলাকায় ওষুধ ছিটায় না ডিসিসির কর্মীরা। ডিসিসির এই বিভাগের সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ স্বাস্থ্য অধিদফতরের কোন যোগাযোগ থাকে না। ডিসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের অধীনে এ কার্যক্রম চালিত হয়ে থাকে। স্বাভাবিক মশক নিধন কার্যক্রম ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমের মধ্যে তারা কোন পার্থক্য দেখে না। ফলে এডিস মশা নিধনে তারা বিশেষ সফলতা পায় না। আর ডিসিসির অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার দায়ভার গিয়ে পড়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ওপর।

ডেঙ্গু আক্রান্তরা চিকিৎসার জন্য ছুটে যান বিভিন্ন সরকারী বেসরকারী হাসপাতাল ও ক্লিনিকে। টনক নড়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের। চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর। হাসপাতালগুলোকে দেয়া হয় নানা নির্দেশনা। কিন্তু পূর্ব প্রস্তুতি না থাকায় গুটি কয়েক বেসরকারী হাসপাতাল ছাড়া সরকারী হাসপাতালে প্রত্যাশিত চিকিৎসা পান না ডেঙ্গু রোগীরা। তাছাড়া ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা দেয়ার গাইডলাইন সম্পর্কে ভাল ধারণা পর্যন্ত থাকে না অনেক চিকিৎসক ও নার্সের। অভিযোগ উঠেছে, কয়েক বছর আগে বিশেষ কমিটির মাধ্যমে জাতীয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ গাইড তৈরি করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। দেশের চিকিৎসাসেবার সঙ্গে সম্পৃক্তদের এ গাইডের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। পাশাপাশি তা সাধারণ মানুষের কাছে প্রকাশ করা হবে। কিন্তু স্বল্পসংখ্যক চিকিৎসক, নার্সসহ সরকারী কর্মচারীদের নিয়ে কয়েকটি প্রশিক্ষণ কর্মশালা করেই গাইড লাইনের উদ্দেশ্য যেন শেষ হয়ে যায়। তাছাড়া ওই গাইডলাইনটি ইংরেজীতে করার কারণে সকল চিকিৎসক বিশেষ করে মফস্বল এলাকার চিকিৎসক ও নার্সদের পক্ষে বোঝে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে। এভাবে ডেঙ্গু প্রতিরোধ গাইডলাইন তৈরির উদ্দেশ্য সফল হয়ে উঠেনি।