২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নিউ ডেভলপমেন্ট ব্যাংক ॥ যাত্রা শুরু, তবে...

  • আরিফুর সবুজ

২০১৪ সালের জুলাই মাসে ব্রাজিলের ফরতেলেজা শহরে ব্রিকসের (চীন, ভারত, রাশিয়া, ব্রাজিল ও দ. আফ্রিকা) নেতৃবৃন্দের সম্মেলন হয়েছিল। সেই সম্মেলনে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদানের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হবে ব্রিকস ব্যাংক। সেই ঘোষণার ঠিক এক বছরের মাথায় ‘নিউ ডেভলপমেন্ট ব্যাংক’ নাম নিয়ে অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু করলো ব্যাংকটি। এটি নিয়ে মানুষের জল্পনা কল্পনার শেষ নেই। প্রত্যাশা যেমন সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি রয়েছে শঙ্কাও। ব্রিকসের এই ব্যাংকটির কারণে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হবে বিধায় উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর ওপর ছড়ি ঘোরানো কমে যাবে, এই চিন্তাই সৃষ্টি করেছে প্রত্যাশা। কিন্তু সেই প্রত্যাশার মাঝেও শঙ্কা ‘লঙ্কায় গেলে রাবণ হয়ে যাওয়া’ নিয়ে, অর্থাৎ এই ব্যাংকটিও যদি বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের পদাঙ্ক অনুসরণ করে, তা নিয়েই শঙ্কা। তবে যেহেতু বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধিতা করে আসা দেশগুলোই এই ব্যাংকটিকে নেতৃত্ব দিচ্ছে, তাতে আশা করা যায়, এ ব্যাংকটি লক্ষ্যচুত হবে না। শোষণ ও শর্তের মাধ্যমে দমিয়ে রাখবে না উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোকে। বরং উন্নয়নমূলক কর্মকা-ে সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে হয়ে উঠবে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বিকল্প এক প্রতিষ্ঠান।

১৯৪৪ সালের জুলাই মাসে ব্রেটনউডস সম্মেলনের মাধ্যমে বহুজাতিক উন্নয়ন সংস্থা গঠনের যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল তারই প্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাংক ও আর্ন্তজাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) গঠিত হয়েছিল। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তা দেয়ার লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিশ্বব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। নীতিগত পরামর্শ প্রদান, কারিগরি সহায়তা ও ঋণ প্রদান, ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ত্রুটি দূর করা, বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা এবং সদস্যরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মুদ্রানীতিতে সহায়তা করার লক্ষ্য নিয়ে কার্যক্রম শুরু করে আইএমএফ। কিন্তু এ দুটি সংস্থাই তাদের লক্ষ্য থেকে সরে যায় অনেক দূরে। কারণ ক্ষমতাবান গুটিকয়েক দেশের এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ। বিশ্বব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ আমেরিকা আর আইএমএফের নিয়ন্ত্রণ ইউরোপীয়রা ভাগবাটোয়ারা করে নেয়। ফলে যা ঘটার তাই হয়েছে। এরা বিশ্বব্যাংক আর আইএমএফকে সারা বিশ্বে খবরদারি করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে। উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর ওপর শর্তের পর শর্ত চাপিয়ে দলিত মথিত করতে থাকে। এ দুটি প্রতিষ্ঠানকে তাদের উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের পরিবর্তে মুনাফার দিকে অধিক গুরুত্বারোপের জন্য এগুলোকে বেনিয়াগোষ্ঠী হিসেবে আখ্যা দেয়াই শ্রেয়। মুনাফা করুক সমস্যা নেই, কিন্তু তারা যে ঋণগ্রহীতা দেশগুলোর মেরুদ- ভেঙ্গে দেয়, সেটাই সমস্যা। ঋণের বিনিময়ে তারা যে শর্ত দেয়, তাতে দেশগুলোর লাভের চেয়ে ক্ষতিই হয় বেশি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিরাষ্ট্রীয়করণ, ভর্তুকি প্রত্যাহার, রেশন ব্যবস্থার বিলোপ, সমাজকল্যাণমূলক খাতে সরকারী ব্যয় হ্রাস, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা-পানি সরবরাহের মতো ক্ষেত্রের বাণিজ্যিকীকরণ, পুঁজি ও পণ্যের আমদানি-রফতানিতে বাধা নিষেধ এবং শুল্ক প্রত্যাহারÑ এ সবই হচ্ছে তাদের শর্ত। এসব শর্তের বেড়াজালে উন্নয়শীল দেশগুলো আটকা পড়ে যায় দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে। বিশ্বব্যাংকের চাপিয়ে দেয়া কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচী ঋণগ্রহীতা দেশগুলোর মেরুদ-ই প্রায় ভেঙ্গে দিয়েছিল। আর আইএমএফের চাপিয়ে দেয়া ব্যয় সঙ্কোচন নীতিসহ আরও সব কঠিন শর্তের কারণে গ্রিসকে যে করুণ পরিণতি বরণ করে নিতে হচ্ছে, তা তো জাজ্বল্যমান। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাবখানা এমন যে, ঋণ দিয়ে যেন কিনেই নিয়েছে ঋণগ্রহীতা দেশগুলোকে। কোন বিকল্প না থাকায় বাধ্য হয়ে মুখবুজে সহ্য করা ছাড়া কোন উপায় ছিল না। কিন্তু এখন বিশ্বের উদীয়মান পাঁচটি দেশ তথা চীন, ভারত, ব্রাজিল, রাশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা মিলে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক তথা ব্রিকস ব্যাংক গঠন করায় পরিস্থিতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে। এই পাঁচটি রাষ্ট্রে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪০% বসবাস করে এবং বিশ্বের মোট জিডিপির ২০% উৎপাদিত হয়। শুধু তাই নয়, আগামী ত্রিশ পয়ত্রিশ বছরের মধ্যে এদেশগুলোর অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের সমান হয়ে যাবে বলে অর্থনীতিবিদরা আশা করছেন। এমন পরিস্থিতিতে উদীয়মান এই পাঁচটি দেশের এই ব্যাংক গঠন বিশ্ব অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণের ক্ষেত্রে ভিন্ন মাত্রা যোগ করছে।

২০১২ সাল বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বিকল্প একটি প্লাটফর্ম হিসেবে এ রকম একটি ব্যাংক গঠনের চিন্তাভাবনা শুরু করা হয়েছিল। এরপর ব্রেটনউডস সম্মেলনের ঠিক সত্তর বছরের মাথায় অর্থাৎ গত বছরের জুলাই মাসে ব্রিকসের সদস্যভুক্ত দেশগুলোর সম্মেলনে ব্যাংক গঠনের ঘোষণা দেয়। সেই ঘোষণার প্রেক্ষিতে ঠিক এক বছরের মাথায় রাশিয়ার উফায় ব্রিকসের সম্মেলনের পরই অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু করেছে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। আগামী বছরের এপ্রিল নাগাদ ঋণ প্রদান কার্যক্রমও শুরু করা হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার নিয়ে ব্যাংকটি আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেছে। এক বছরের মধ্যেই এই তহবিল দ্বিগুণ অর্থাৎ ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মধ্যে চীন দেবে ৪১ বিলিয়ন ডলার, ভারত, ব্রাজিল ও রাশিয়া দেবে ১৮ বিলিয়ন ডলার এবং দক্ষিণ আফ্রিকা ৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে ফারাক থাকলেও প্রতিটি রাষ্ট্রের ভোটাধিকার সমান। এর মধ্য দিয়ে ব্যাংকটি যে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ থেকেও অধিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে, তা বোঝা যাচ্ছে। এই বিষয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বক্তব্য উল্লেখ করা যায়। তিনি বলেছেন, ব্রিকস ব্যাংক স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে এবং ঐকবদ্ধভাবে সকলের মতামতের ভিত্তিতে কাজ করে যাবে। তবে ব্রিকসের গঠনতন্ত্রে কিন্তু পুরোপুরি গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। এর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যের ভোটের পরিমাণ ৫৫% এর কম কখনই হবে না। এটিই প্রমাণ করে গণতান্ত্রিকতার কথা বলা হলেও ব্যাংকটির মূল চাবিকাঠি থাকবে প্রতিষ্ঠাকালীন পাঁচটি রাষ্ট্রের ওপর। এদের মধ্যে আবার চীন বেশি পুঁজি বিনিয়োগ করায় এর খবরদারিও যে বেশি থাকবে না, তাও বলা যায় না। যদি এমনটা হয় তবে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতো এটির ক্ষেত্রেও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের বিষয়টি হবে কথার কথা। এটি হয়ে পড়বে ক্ষমতাবানদের ধ্বজাধারী একটি প্রতিষ্ঠান।

অনেকেই বলছেন, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক হলে বাংলাদেশের কি লাভ? আসল লাভ হলো বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের ছড়ি ঘোরানো বন্ধ করা। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের পদ্মা সেতু নিয়ে যে কা- করেছে, তার মধ্যে দিয়েই এদের আসল মুখোশ খুলে পড়েছে। নিজেরাই যেখানে দুর্নীতিগ্রস্ত, সেখানে তারা দুর্নীতির অজুহাত দিয়ে বাংলাদেশের পদ্মা সেতু প্রকল্পে ঋণ দেয়া বন্ধ করে দেয়। কিন্তু কোন প্রমাণ করতে পারেনি। কারণটি কিন্তু রাজনৈতিক। আমেরিকা বিশ্বব্যাংকের হর্তাকর্তা। আর আমেরিকার ড্যান মজীনার সঙ্গে বিএনপি-জামায়াত জোটের দহরম-মহরমের কারণেই পদ্মা সেতু দুর্নীতির উছিলা দেয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমেরিকার হয়ে এভাবে নাক গলাচ্ছে। আইএমএফও কম যায় না। ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সামনে রেখে এরাও বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে আসছে অনেকদিন থেকেই। শর্তের বেড়াজালে বন্দী করে রাখতে চায় বাংলাদেশকে। কিন্তু আর বেশিদিন হয়ত পারবে না এটা করতে। একটি সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের ঋণ নির্ভর দেশ হয়ে গিয়েছিল। জিডিপির ১৩.৭ শতাংশই ছিল ঋণ। কিন্তু বর্তমানে ঋণ নির্ভরতা কমে গেছে। জিডিপির মাত্র ১ শতাংশ বিদেশী ঋণ। তারপরেও যে ঋণ নেয়া হচ্ছে, তা দিয়েই ছড়ি ঘোরানোর চেষ্টার কমতি নেই বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের। এখন যদি ব্রিকস ব্যাংক তথা এনডিপির কাছ থেকে সহজ শর্তে স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নেয়া যায় তাহলে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফকে সমুচিত জবাব দিতে পারবে।

নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকটি উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অবকাঠামোসহ উন্নয়নখাতে ঋণ প্রদান করবে। তবে সুদের হার কেমন হবে, ঋণ পরিশোধের সময়সীমা কেমন হবে, এসব বিষয়ে এখনও কোন সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সুদের হার অনেক কম। ১ শতাংশেরও কমে মাঝে মাঝে মাত্র .৭৫ দশমিক হারে ঋণ দেয় বিশ্বব্যংক ও আইএমএফ। এবং ঋণ পরিশোধের সময়সীমাও অনেক বেশি থাকে। ব্রিকস ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকতে হলে এ বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দেয়ার বিকল্প থাকবে না। নচেৎ বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের দৌরাত্ম্য নিয়ে যে স্বপ্ন দেখছে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলো, তা স্বপ্নই থেকে যাবে। সে ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে তাদের বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের দ্বারস্থ হতে হবে। অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাবে এর লক্ষ্য। হাঁকডাক দিয়ে যাত্রা শুরু করলেই হবে না, একে দীর্ঘমেয়াদে যৌক্তিক ও বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে দিয়ে বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়ন কাঠামো গঠন এবং দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য সহজ শর্তে স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রদানের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো তাহলে আর বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মুখাপেক্ষী হবে না। আমেরিকান ও ইউরোপীয়ানরা তখন ছড়িও ঘোরাতে পারবে না। এজন্য ব্রিকস ব্যাংককের উদ্যোক্তা পাঁচ রাষ্ট্রকেই উদ্যোগ নিতে হবে।

ব্রিকস ব্যাংককে ঘিরে সারা বিশ্বজুড়ে উত্তেজনার কারণ বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের খবরদারির হাত থেকে মুক্তির স্বপ্ন। এর আগে আঞ্চলিক অনেক ব্যাংকই গঠিত হয়েছে। কিন্তু কোনটিই এ দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যেই বলে দিচ্ছে ব্যাংকটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আঁধার রাতের সলতে হয়ে এসেছে। যদি নিজের লক্ষ্যচ্যুত না হয়, যদি ক্ষমতাবানদের ধ্বজাধারী না হয়, তবে এই ব্যাংকটি প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের খবরদারি কমাতে ভূমিকা রাখবে। সেই সঙ্গে বিশ্বের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে আনতে পালন করবে মুখ্য ভূমিকা।

নির্বাচিত সংবাদ