১০ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

টানা বর্ষণে নয় জেলায় লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দী

টানা বর্ষণে নয় জেলায় লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দী
  • চট্টগ্রামে পানিতে ডুবে একজনের মৃত্যু

জনকণ্ঠ ডেস্ক ॥ কয়েকদিনের টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম, সাতক্ষীরা, টাঙ্গাইল, ভোলা, নোয়াখালী, ফেনী, রাঙ্গামাটি, নওগাঁ ও কক্সবাজারের শত শত গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে গেছে। লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। আগ্রাসী বর্ষণে থমকে গেছে জনজীবন। বন্দরনগরী চট্টগ্রামে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। পানিতে ডুবে মীরসরাইয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। বেশিরভাগ সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। ফ্লাইট ওঠানামা চরমভাবে বিঘিœত হচ্ছে। কয়েকদিনের প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে বাঁশখালীর ২ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। জনজীবনে নেমে এসেছে বিপর্যয়। তৃতীয় দিনের মতো বরিবার পটিয়ায় ভারি বর্ষণে উপজেলার ২২ ইউনিয়ন ও পৌরশহরের কয়েক লাখ মানুষ জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। কয়েকশ’ বসতঘর পানিতে বিলীন হয়েছে। ফটিকছড়ি ও হাটহাজারির কয়েক হাজার পরিবার তিন দিন ধরে পানিবন্দী রয়েছে। টানা বর্ষণে চট্টগ্রামের শস্যভা-ার রাঙ্গুনিয়ার গুমাইবিল ৪ ফুট পানির নিতে তলিয়ে গেছে। বিলের ৬ হাজার একর বীজতলা পানিতে ডুবে গেছে। অবিরাম বর্ষণে রাঙ্গামাটি শহর ব্যাপক পাহাড় ধসের কবলে পড়েছে। মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছে ৪০ হাজার মানুষ। ১০টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। ভারি বর্ষণে কক্সবাজারের তিন শতাধিক গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে অন্তত ২ লাখ মানুষ। মেঘনার ভাঙ্গনে ৬ ঘণ্টায় ভোলা-লক্ষ্মীপুর মহাসড়কের দুইশ’ মিটার বিলিন হয়েছে। ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। আটকা পড়েছে ৫ হাজার যাত্রী। কুতুবদিয়ায় ৪০ গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বিস্তীর্ণ এলাকার বহু আউশ ও আমনের বীজতলা নষ্ট হচ্ছে।

কপোতাক্ষ ও বেতনা নদীর উপচেপড়া পানিতে সাতক্ষীরা সদরসহ তালা উপজেলার ৩০ গ্রাম পানিতে ভাসছে। বেশিরভাগ পরিবারের ঘরবাড়ি ৩ থেকে ৪ ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পানিতে তলিয়ে গেছে তালার উপজেলা পরিষদের কয়েকটি সরকারী অফিস। টাঙ্গাইলের ভুয়াপুর উপজেলার সিডিএমপির ৩৮ বাড়ি যমুনাগর্ভে বিলীন হয়েছে। এদিকে ফেনীর ফুলগাজির বন্যা পরিস্থিরি কিছুটা উন্নতির খবর পাওয়া গেছে। তবে ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পানি গ্রামে প্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। তবে পানি ধীরে ধীরে ভাটির দিকে নেমে যাচ্ছে। খবর স্টাফ রিপোর্টার ও নিজস্ব সংবাদদাতার।

চট্টগ্রাম ॥ শ্রাবণের অঝোর ভারি বর্ষণ অব্যাহত রয়েছে চট্টগ্রামে। এমনিতেই এ নগরীতে পানি নিষ্কাশনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। তার উপর আগ্রাসী বর্ষণে ল-ভ- হয়ে গেছে এ নগরীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। নিম্নাঞ্চলসহ নগরীর মধ্যবর্তী এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে সর্বত্র পানি আর পানি। শহরতলীর বাসাবাড়িগুলো গত কয়েকদিন ধরে তলিয়ে আছে অথৈই পানির নিচে। গত চারদিন ধরে অবিরাম বর্ষণ এ নগরীর জনজীবনকে একেবারেই থমকে দিয়েছে। চট্টগ্রামের সঙ্গে বেশ কয়েকটি স্থানের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দেশী-বিদেশী ফ্লাইটের ওঠানামা চরমভাবে বিঘিœত হয়েছে। সাগরে উত্তাল ঢেউয়ের কারণে বহির্নোঙ্গরে পণ্য ওঠানামার কাজ থমকে গেছে। এমনকি বন্দর অভ্যন্তরেও পণ্যের খালাস কাজ ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। জেলার মীরসরাইয়ে মৃত্যু হয়েছে একজনের। সবকিছুই বর্ষণে বর্ষণে হয়ে গেছে একাকার।

নগরী ও জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা হাঁটু থেকে কোমর পানিতে তলিয়ে গেছে, তলিয়ে যাওয়ায় সীমিত হয়ে পড়েছে যন্ত্রচালিত যানবাহন। রবিবার সকালে পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমির ভবন। সংলগ্ন ম্যানোলা পাহাড়ের আংশিক ধসে পড়ায় মাটি আছড়ে পড়ে। এতে জানালা ও দেয়াল ভেঙ্গে মাটি ঢুকে পড়ে একটি কক্ষে। তবে এতে হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার মোসলেম উদ্দিন সিকদার সাংবাদিকদের জানান, পাহাড় ধসে নিচতলার একটি প্রশিক্ষণ কক্ষেও মাটি ঢুকেছে। এসব মাটি সরিয়ে নেয়ার কাজ চলছে। তিনি জানান, সকাল সাতটার দিকে পাহাড়ের প্রায় ত্রিশ ফুট অংশ ধসে পড়লে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়।

বাঁশখালী ॥ কয়দিনের প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে বাঁশখালীর মানুষের জনজীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে। দুই লক্ষাধিক মানুষ বর্তমানে পানিবন্দী অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করছে। অর্ধ লক্ষাধিক কাঁচা বাড়িঘর পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বাঁশখালী উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান জনকণ্ঠকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। রবিবার সরজমিনে দেখা যায়, বাঁশখালীর পুকুরিয়া থেকে পুঁইছড়ির প্রেমবাজার পর্যন্ত ১৪ ইউনিয়নে এবং পৌরসভার জলদীতেসহ পশ্চিমাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ এখন পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে।

রাঙ্গুনিয়া ॥ ৪ দিনের টানা ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে চট্টগ্রামের বৃহত্তম শস্য ভা-ার রাঙ্গুনিয়ার গুমাই বিল ৪ ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এই বিলের ৬ হাজার একর চাষাবাদের বীজতলা পানিতে ডুবে আছে। এছাড়া রাঙ্গুনিয়ার রইস্যা বিল, তালুকদার বিল, নিশ্চিন্তাপুর বিল, তৈলা ভাঙ্গা বিল, পদুয়া, শিলক, সরফভাটা, বেতাগীসহ অধিকাংশ নিম্নাঞ্চলের অধিকাংশ বীজতলা পানিতে ডুবে আছে।

রাঙ্গামাটি ॥ প্রবল বষর্ণের ফলে পাহাড়ের চূড়ার ওপর অবস্থিত রাঙ্গামাটি শহর ব্যাপক পাহাড় ধসের কবলে পড়েছে। এতে করে শহরের বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থানরত প্রায় ৪০ হাজার মানুষ মৃত্যু ঝুঁকিতে পড়েছে। এসব মানুষকে পাহাড় ধসের কবল থেকে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রবিবার শহরে বার বার মাইকিং করা হয়েছে।

কক্সবাজার ॥ তিন দিনের টানা ভারি বর্ষণে কক্সবাজারের রামু, উখিয়া, টেকনাফ, চকরিয়া ও পেকুয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রায় ৩ শতাধিক গ্রাম বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে চকরিয়া মাতামুহুরী নদীতে ঢলের পানি নেমে আসার ফলে কক্সবাজারের চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলায় প্রায় ১৮ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে ফের বন্যার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

সাতক্ষীরা ॥ টানা বৃষ্টি আর ভরাট কপোতাক্ষ নদ আর বেতনা নদীর উপচেপড়া পানিতে ভাসছে সাতক্ষীরা সদর উপজেলাসহ তালা উপজেলার ৩০টি গ্রাম। নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ায় তালা উপজেলা প্রশাসনের কার্যালয়ের বেশিরভাগ ভবনের নিচ তলার অফিসগুলো এখন এক ফুট থেকে দেড় ফুট পানিতে ভাসছে। টাঙ্গাইল ॥ ভুঞাপুর উপজেলার গাবসারা ইউনিয়নে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন সিডিএমপি কর্তৃক নির্মিত ৩৮টি বাড়ি যমুনা নদীর পেটে বিলীন হয়ে গেছে। যমুনার পানি বৃদ্ধি ও গত কয়েক দিনের টানা বর্ষনে বাড়ি-ভিটি বিহীন ওই পরিবারগুলো মারাত্মক বিপর্যয়ে পড়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।

নওগাঁ ॥ মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে সপ্তাহজুড়ে টানা বর্ষণে নওগাঁর নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে। নিচু এলাকার হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে ক্ষেতের আউশ ধান ও রোপা আমন ধান এবং বীজতলা। কুতুবদিয়া ॥ লাগাতার বর্ষণে কক্সবাজারের দ্বীপ-কুতুবদিয়ায় ৪০ গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বিস্তীর্ণ এলাকার বহু আউশ ফসল ও আমনের বীজতলা পানির নিচে পড়ে বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কয়েকশ’ কাঁচা ঘরবাড়ি পড়ে গেছে এবং রাস্তাঘাট ও প্রতিষ্ঠান ডুবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

ফেনী ॥ মুহুরী নদীর বাঁধের সাহাপুর ও দৌলতপুরের দুই ভাঙ্গা স্থান দিয়ে ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পানি গ্রামে প্রবেশ করা অব্যাহত রয়েছে। এ পানি ধীরে ধীরে ভাটির দিকে নেমে যাচ্ছে। এতে নতুন করে ছাগলনাইয়া ও ফেনী সদরের প্রায় ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। জনদুর্ভোগ বেড়ে গেছে।