২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সুশৃঙ্খল পরিবেশে নির্বাচন সম্পন্ন

  • তিন হাজার নেতা-কর্মী ভোট দিলেন ছাত্রলীগের নয়া নেতৃত্বের জন্য

মুহাম্মদ ইব্রাহীম সুজন ॥ নির্ধারিত সময় সকাল নয়টার আগেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা কাউন্সিলরদের (ভোটার) ভিড়ে মুখরিত হয়ে ওঠে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণ। উপস্থিতির প্রায় সবার গলাতেই কাউন্সিলর আইডি ঝুলছিল। দীর্ঘ চার বছর অপেক্ষার পর ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ! সবার চোখেমুখে তাই উত্তেজনা, অপেক্ষা এবং আগ্রহের ছাপ ছিল স্পষ্ট। কখন শুরু হবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যার মাধ্যমে নির্বাচিত হবে সবচেয়ে প্রাচীন ছাত্র সংগঠনের ভবিষ্যত নেতৃত্ব। ঘড়ির কাঁটায় ন’টা বাজতেই নির্বাচন কমিশনারগণ এবং বিদায়ী সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক এসে সেখানে উপস্থিত হন। ততক্ষণে ভোটকেন্দ্রের চারপাশে তিল ঠাঁই ধরানোর জায়গা নেই। প্রায় সবার মুখেই সেøাগান চলছিল। ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, নেতা মোদের শেখ মুজিব’ সেøাগানে মুখরিত হয়ে যাচ্ছিল পুরো এলাকা। প্রার্থিতা প্রত্যাহার পর্ব শেষে সকাল সাড়ে এগারোটার দিকে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। সবাই লাইন ধরে দাঁড়িয়ে অডিটরিয়ামের ভেতরে ঢুকে ভোট দিয়ে আবার লাইন ধরে বের হয়ে যাচ্ছিলেন। একেকটি সাংগঠনিক জেলা ইউনিটের কাউন্সিলরদের নাম ধরে ডাকা হচ্ছিল, তারা ভোট দিয়ে যাওয়ার আগেই প্রস্তুত করে রাখা হচ্ছিল পরবর্তী কাউন্সিলরদের। এভাবে রবিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সুষ্ঠু, সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে দেশের ভেতরের ১০১টি এবং দেশের বাইরের ৯টিসহ মোট ১১০টি সাংগঠনিক জেলা ইউনিটের প্রায় তিন হাজার নেতাকর্মীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। এর মধ্য দিয়ে ছাত্রলীগের সভাপতি হয়েছেন সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন জাকির হোসেন। ‘সিন্ডিকেট’ নির্ধারিত প্যানেলের বাইরে শক্ত কোন প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেল না থাকায় এক রকম বিনাপ্রতিন্দ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হয়েছেন তারা।

সকাল সাড়ে ১১টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়, চলে সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত। এর আগের দিন পায়রা উড়িয়ে জাতীয় সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এই সম্মেলনের উদ্বোধন করেন আওয়ামী লীগ প্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এদিন তিনি তার বক্তব্যে বলেন ‘কোন সমঝোতা কিংবা সিলেকশন নয়, সরাসরি কাউন্সিলরদের ভোটেই ছাত্রলীগের নতুন কমিটির নেতৃত্ব গঠিত হবে।’ এদিন বিকেলে সংগঠনের বর্তমান ও সাবেক সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর কার্যালয়ে দেড় ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেন। কাকে কাকে নেতৃত্বে আনা যায় তা নিয়ে ওই বৈঠকে আলোচনা হয় সংগঠনের নেতৃবৃন্দের। রাত সাড়ে ১১টার পর বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সংগঠনের পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক মাদারীপুরের সাইফুর রহমান সোহাগ এবং সহ-সম্পাদক সিলেটের জাকির হোসেনকে নিয়ে বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পক্ষ থেকে প্যানেল তৈরি করা হয়। তবে বিষয়টি নিয়ে তখন কেউই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। এর পর শুরু হয় প্রকাশ্যে ভোট চাওয়া। সামাজিক যোগাযোগের সাইট ফেসবুকে ‘সোহাগ-জাকির’ প্যানেলকে নির্বাচিত করতে ভোট চেয়ে বিভিন্ন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা স্ট্যাটাস দেন।

রবিবার সকাল ১০টায় দ্বিতীয় অধিবেশনের শুরুতেই পদ প্রার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন বর্তমান সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ, সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম, সম্মেলনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার সুমন কু-ু, নির্বাচন কমিশনার মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক এবং শেখ রাসেল। এ সময় উপস্থিত পদপ্রত্যাশীদের সঙ্গে কথা বলেন তারা। সভাপতি পদে ৬৪ জন প্রার্থী এবং সাধারণ সম্পাদক পদে ১৪৯ জনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা থাকলেও ভোট শুরুর আগ পর্যন্ত সভাপতি পদে ১০জন এবং সাধারণ সম্পাদক পদে ৩০জন তাদের প্রার্থিতা বহাল রাখেন। বাকিরা নিজেদের নির্বাচন থেকে প্রত্যাহার করে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ভোট দেন।

সর্ব প্রথমে ঠাকুরগাঁও জেলার ২৫ জন কাউন্সিলরদের ভোট প্রদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ভোটগ্রহণ। এ সময় সংগঠনের সাবেক নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, এনামুল হক শামীম, সুজিত রায় নন্দী, ইকবালুর রহিম, ইসহাক আলী খান পান্না, নজরুল ইসলাম খান বাবু, মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন, যুবলীগ সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ উপস্থিত ছিলেন।

সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ কাউন্সিলরদের নাম ঘোষণা করেন। এ সময় তাকে সহযোগিতা করেন কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলমসহ তিনজন নির্বাচন কমিশনার। এ ছাড়া ভোটকেন্দ্রের প্রবেশ পথে ও বাইরে সংগঠনের কেন্দ্রীয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় অর্ধশতাধিক নেতৃবৃন্দ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন। অডিটরিয়ামের প্রবেশমুখে সোহাগ ও জাকির বিভিন্ন কাউন্সিলরদের কাছে ভোট চান। এ সময় অন্য কোন প্রার্থীকে ভোট চাইতে দেখা যায়নি।

উপস্থিত একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, বিরোধী কোন প্যানেল ঘোষণা না করায় এক রকম বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন ‘সোহাগ-জাকির’ প্যানেল। তাই অন্য প্রার্থীরা ভোট চাইছেন না। তারা পরাজয় মেনে নিয়েছেন।

প্রার্থিতা প্রত্যাহারের কারণ হিসেবে একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনকণ্ঠকে জানান, আপনারা দেখছেন কেবল দুজন সবার কাছে ভোট চাইছেন আর কেউ ভোট চাইছেন না। আমরা ভোট চাইলেও পাব না।

অনেকেই অভিযোগ করেন যে সংগঠনের সাবেক নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে গঠিত কথিত ‘সিন্ডিকেটের মাধ্যমে একটি প্যানেল নির্ধারিত হওয়ায় এদের সঙ্গে কেউই প্রতিন্দ্বন্দ্বিতা করতে সাহস পায়নি। কারণ অধিকাংশ ভোটই ‘সিন্ডিকেটের’ হাতে থাকে। এর বাইরে গিয়ে নির্বাচন করে জয়ী হওয়াটা অসম্ভব।

ভোট দিতে আসা কাউন্সিলরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নেতা নির্বাচন অনেক আনন্দদায়ক ও উপভোগ্য। তাদের অধিকাংশই ‘সোহাগ-জাকির’ প্যানেলকে ভোট দেবেন বলে জানান। এর কারণ জানতে চাইলে তারা আরও জানান, সবকিছু বুঝে-শুনে সংগঠনের বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এদের মনোনীত করেছেন। এদের মাধ্যমেই ছাত্রলীগের আগামীর পথচলা সুগম হবে।

দুপুর একটার আগেই সিলেট, রাজশাহী, বরিশাল, চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ বড় বড় সাংগঠনিক ইউনিট ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের কাউন্সিলররা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। বিরতিহীনভাবে বিকেল সাড়ে পাঁচটায় ভোটগ্রহণ শেষ হয়। প্রায় তিন হাজার কাউন্সিলরের মধ্যে ভোট দেন দুই হাজার আটশত উনিশজন। পরবর্তীতে স্বেচ্ছাসেবক ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনাররা ভোট গণনার কাজ শুরু করেন। ভোটগণনা শেষে ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এরপর বিদায়ী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকগণ নির্বাচিত নতুন সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেনকে সাংবাদিকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এর আগে বিকেল থেকেই বিভিন্ন সাংগঠনিক ইউনিটের নেতৃবৃন্দ ‘সোহাগ ও জাকির’কে অভিনন্দন জানিয়ে মিছিল বের করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও কিছুক্ষণ পর পর মিছিল করা হয়।