১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জামিনে মুক্ত ২১২ জঙ্গীর মধ্যে ১০৫ জন উধাও

  • ভুয়া নাম-ঠিকানা দিয়ে বেরিয়ে এরাই অন্য নামে তৎপর হচ্ছে

শংকর কুমার দে ॥ বিগত সাড়ে ৫ বছরে সারাদেশের কারাগারগুলো থেকে জামিনে বেরিয়ে এসেছে ২১২ জঙ্গী। এর মধ্যে জামিনে বের হওয়ার পর উধাও হয়ে গেছে প্রায় ১০৫ জঙ্গী। তাদের আর কোন হদিস নেই। আদালতেও হাজিরা দিচ্ছে না, বাড়ির ঠিকানায়ও নেই তারা। এসব জঙ্গী নতুন মুখ বা তৃতীয়সারির। উধাও হয়ে যাওয়া জঙ্গীরা গ্রেফতারের সময়ে ভুয়া নাম ঠিকানা দেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। ভুয়া নাম ঠিকানা দেয়ার কারণে জামিনে বের হয়ে যাওয়ার পর তাদের খোঁজ করেও হদিস করা যাচ্ছে না। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এ ধরনের তথ্যচিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে যে, জঙ্গীদের মধ্যে গ্রেফতারের পর যারা ভুয়া নাম ঠিকানা দিয়ে জামিনে বের হয়ে আত্মগোপনে গেছে তাদের অনেকেই আবার অন্য নামে জঙ্গী তৎপরতা চালানোর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তদন্তে দেখা গেছে, ময়মনসিংহের ত্রিশালের প্রিজনভ্যানে হামলা চালিয়ে তিন জঙ্গী ছিনতাইয়ের অপারেশন চালিয়েছে এ ধরনের নতুন মুখ অভিহিত তৃতীয়সারির জঙ্গীরাই। নতুন মুখ অভিহিত তৃতীয়সারির জঙ্গীদের অনেকেই জামিনে ছাড়া পেয়ে আত্মগোপনে গিয়ে আবার সংগঠিত হচ্ছে। নতুন মুখ অভিহিত তৃতীয়সারির এসব জঙ্গী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অপরিচিত। এ সুযোগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখে ধুলো দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ময়মনসিংহের ত্রিশালের জঙ্গী ছিনতাইয়ের নেতৃত্বদানকারী ছিল ফারুক হোসেন ওরফে আনোয়ার হোসেন। সে জেএমবির তৃতীয়সারির নেতা। ২০০৬ সালে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে ছিল। বিচার শেষ হওয়ার আগেই ২০১২ সালে আদালত থেকে জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসে ফারুক। এরপর থেকে সে ছিল আত্মগোপনে। জামিনে বের হয়ে আসার পর আর আদালতে হাজিরা দেয়নি। এমনকি তার জামালপুরের মেলান্দহের বাড়িতেও কখনও যায়নি। কারাগার থেকে বেরিয়ে এসেই সে নিজেকে দাবি করে স্বঘোষিত জেএমবির আমির। ফারুকের এই দলে অন্তত ৩০ জন ‘ডেডিকেটেড’ সদস্য রয়েছে। যাদের প্রায় প্রত্যেকেই বিভিন্ন সময়ে জেল খেটেছে। জামিন পেয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে তারা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে।

ময়মনসিংহের ত্রিশালের অপারেশনের পর গ্রেফতারকৃত জঙ্গী সদস্য জাকারিয়া তদন্তকারী কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে, ২০০৫ সালে সবুজবাগে অস্ত্রসহ ধরা পড়েছিল সে। প্রায় সাত বছর জেল খেটে সেও ২০১২ সালে জামিনে বেরিয়ে আসে। তাদের জেল থেকে বেরিয়ে আসার নেপথ্যে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়েছে বলেও সে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে। জাকারিয়া জানিয়েছে, বাইরে থাকা তাদের সহযোগীরা তাদের জামিনে বের করে আনার জন্য অর্থ সংগ্রহ করে। নিম্ন আদালতে জামিন না হলে অনেক সময় তারা উচ্চ আদালত থেকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিনে বেরিয়ে আসে। একবার কারাগার থেকে বেরিয়ে এলে তারা আর আদালতে হাজিরা দিতে যায় না। জাকারিয়া ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার জিজ্ঞাসাবাদের উদ্ধৃতি দিয়ে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তারা মূলত স্বঘোষিত আমির ফারুকের নির্দেশে জঙ্গীদের জামিনে বের করে আনার প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করে থাকে। এছাড়া কারাগারে আটক জঙ্গীদের পরিবারের ভরণ-পোষণেও সহায়তা করে থাকে।

গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছেÑ প্রথমসারির দুর্ধর্ষ জঙ্গীদের ওপর নজরদারি করে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ গোয়েন্দা সংস্থা। কিন্তু তৃতীয়সারির বা নতুন মুখের জঙ্গীরা অনেকটাই অখ্যাত ও অপরিচিত হওয়ায় তাদের চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। এ সুযোগে তারা গোপনে সংগঠিত হচ্ছে। তবে জঙ্গী তৎপরতা চালালেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জালে আটকা পড়ে যাচ্ছে। তবে তৃতীয়সারির জঙ্গীরা জামিনে বেরিয়েই আত্মগোপনে চলে যাচ্ছে। আত্মগোপনে থেকেই তারা পুনরায় সংগঠিত করার চেষ্টা করছে নিজ নিজ জঙ্গী সংগঠনগুলোকে। ময়মনসিংহের ত্রিশালে তিন জঙ্গী ছিনতাইয়ের অপারেশনে অংশ নেয়া জঙ্গী সদস্যদের অধিকাংশই বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে ছিল। জামিনে বেরিয়ে তারা প্রথমে আত্মগোপনে চলে যায়। পরে গোপনে নিজেরা সংগঠিত হয়। কারাগারের অভ্যন্তরে থাকা জঙ্গীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জামিনে বের হয়ে আসা জঙ্গীরা।

গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জামিনে বের হয়ে আসা জঙ্গীরাই পরিকল্পনা করে ছিনিয়ে নিয়েছে তিন শীর্ষ জামাআতুল মুজাহিদীন অব বাংলাদেশ (জেএমবি) নেতা সালাউদ্দিন ওরফে সালেহীন, রাকিব হাসান ওরফে হাফেজ মাহমুদ ও জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমারু মিজানকে। একের পর এক জঙ্গী সদস্যরা জামিনে বেরিয়ে এলেও কোন হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।