১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঝুরি বিক্রি- ঝুঁকিমুক্ত পেশা ॥ চাহিদা মিটছে সারাদেশের

ঝুরি বিক্রি- ঝুঁকিমুক্ত পেশা ॥ চাহিদা মিটছে সারাদেশের
  • ঝুরি তৈরির গ্রাম দেওয়ালবাড়ী

আজিজুর রহমান ডল

জামালপুরের মেলান্দহের দেওলাবাড়ি এলাকার তৈরি সওদা জাতীয় খাদ্যসামগ্রী ঝুরি এখন সারাদেশের চাহিদা মেটাচ্ছে। ঝুরি বিক্রি করে এই এলাকার সহস্রাধিক লোক এখন স্বাবলম্বী। এলাকাটি নিচু ও চরাঞ্চল হওয়ায় জমিতে চাষাবাদ ব্যাহত হয় এখানে। ফলে অভাব অনটনে তাদের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতেই এই পেশা দেখিয়েছে তাদের জীবনের উন্নতির পথ। এনেছে সফলতার বিপ্লব। এলাকায় প্রবেশ করলে দেখা যাবে নারী-পুরুষরা ঝুরি তৈরিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। এলাকার প্রায় প্রতি বাড়িই গড়ে উঠেছে ঝুরি তৈরির মিনি কারখানা। এখানকার ঝুরি গুণগত মানভাল, সুস্বাদুও। উপজেলার দেওলাবাড়ি, শেখবাড়ি, দেবপাড়া, কামদেবাড়ি, নাংলা, মিয়ারপাড়া, নটারকান্দা, পরাঙ্গাপাড়া, প্রামাণিকপাড়ার মানুষ এ কাজে বেশি জড়িত। প্রতি গ্রামে শতাধিক লোক এ ব্যবসা করেন।

ঝুরি বানাতে প্রথমে ধান ঢেঁকিতে ছেঁটে চাল বানাতে হয়। এরপর চাল থেকে কুড়া। এই কুড়াকে আগুনে তাপ দিয়ে সিদ্ধ করে আঠালো (আঞ্চলিক ভাষায় কাওয়া) করা হয়। সমুদয় কাওয়া মাটির পাতিল কিংবা বাঁশের চুঙ্গির ক্ষুদ্রক্ষুদ্র ছিদ্রতে ঘষে ঘষে ঝুরি বানানো হয়। কাঁচা ঝুরি শুকিয়ে বাজারে বিক্রি করা হয়। মহিলারাই এ কাজের সফলতার ভূমিকা রাখছেন। বাজারে বিক্রি ছাড়া সব কাজই মহিলাদের করতে হয়। ঝুরি দেরিতে বিক্রি হলেও এর কোন ক্ষতি, পচন বা ঘাটতি নেই। এ জন্যই এটি ঝুঁকিমুক্ত।

দেওলাবাড়ির ইলি শেখ (৭০)

জানান, আমরা ১০ ভাই-বোন। পাকিস্তান আমল থেকেই ঝুরির ব্যবসা করি। বসে থাকার চেয়ে বেকার খাটাও ভাল। চুরি তো করি না, আর চুরি করলে তো আপনিও ধরবেন। আগে হেঁটেই লাখ টাকার ব্যবসা করেছি। এখন আরও বেশি করি। আগে বাজারে বাজারে বিক্রি করতাম। এখন ঘরে বসেই বিক্রি করছি। এ ব্যবসার বড় সফলতা হচ্ছে, যখন গ্রামে কাজ থাকে না। তখনই ব্যবসা চাঙ্গা হয়। এ বছর ২ লাখ টাকার জমিও কিনেছি। ব্যবসা করতে পারলে বছরে ৩-৪লাখ টাকা জমানো যায়। ১০ মণ ধান দিয়ে ব্যবসা শুরু করি। এখন চালান ৩০ মণ ধানের। প্রতিমণ ধানের ঝুরির খরচ হয় ৯শ’-১ হাজার টাকা। বিক্রি করি ১৪শ’-১৫শ’ টাকা। প্রায় সারা বছর ব্যবসা চলে। তবে বছরের চৈত্র-বৈশাখ মাস পিক সিজন। এ মাসেই ব্যবসা ভাল হয়। পিক সিজনে ঝুরি সাপ্লাই দেয়া কঠিন হয়।

ঝুরি বাজারজাত করেন এজেন্টরা। এদের মধ্যে এজেন্ট লাল চাঁন (৩৫) জানান, জামালপুর ছাড়াও টাঙ্গাইল, মধুপুর, ভল্লা, ঢাকা, আশুলিয়া, টঙ্গী, গাজীপুর, জয়দেবপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘ঝুরি’ সাপ্লাই দেই। কেনাবেচার জন্য আমি মধ্যস্থতা করি। পাইকারের চাহিদা অনুযায়ী নিজ দায়িত্বে মালামাল সরবরাহ করি। দৈনিক ৫০-৬০ ট্রাক মাল সরবরাহ করা যায়। প্রতি ট্রাকে ২-৩ টন মাল ধরে। বাজারমূল্য ঠিক করার পর মণপ্রতি আমার থাকে ৩০% কমিশন। বাচ্চাদের সওদা এখানকার ‘ঝুরি’ সারাদেশই চাহিদা আছে। দেশের বাইরেও মার্কেটিং করতে চাচ্ছি। বিশ্বস্ত মাধ্যম পেলে দেশের বাইরেও বিক্রি করব।

প্রচুর ঝুরি তৈরি জন্য দেওলাবাড়ি গ্রামের দিনমজুর বাহাদুর ঘটিয়েছেন-এক বিপ্লব। পর্যাপ্ত পরিমাণে ঝুরি সাপ্লাই দেয়ার জন্য তিনি অত্যাধুনিক এক যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন। আগে ১ মাসে যে পরিমাণ ঝুরি তৈরি হতো। এখন এই যন্ত্র দিয়ে ১ দিনেই তারচেয়ে বেশি ঝুরি তৈরি করা যায়। বাহাদুর জানান, আমি একজন গরিব মানুষ। লেখাপড়া জানা নাই। একটি ঘর তোলার জায়গা ছাড়া আর কিছুই নাই। আমাদের এলাকার অনেকেই ঝুরি তৈরি করেন। এই কাজে মহিলাদের যে কত পরিশ্রম। মহিলাদের সীমাহীন কষ্ট লাগবের কথা সব সময় ভাবতাম।

এক কথায় এখানকার তৈরি ঝুরি বাজারে বিক্রি ছাড়া সবকাজই মহিলাদের করতে হতো। এতে অনেক মহিলাদের হাতে ঘা হয়ে যেত। কোন কারণে মহিলা কাজ করতে না পারলে উপার্জনেরও সমস্যা হতো। আবার কোন সংসারে মহিলা নির্যাতিত হতেন। এ ছিল আমার বিবেকের একটি তাড়না। পরে আমি একটি যন্ত্র তৈরির চিন্তা করি। প্রথমে দুলালের স্ত্রী জরিনার কাছে গেলাম। কয়েক দিন ঝুরি বানানোর পদ্ধতি মন দিয়ে অবলোকন করি। এরপর মনে মনে ভাবতে থাকি। কোন ধরনের যন্ত্র তৈরি করব। সারাক্ষণ চিন্তা আর চিন্তা। আমারও পেটে ভাত নাই। যন্ত্র তৈরিতে টাকারও দরকার। উপায় করি কি। আবার হতাশ হয়ে পড়ি। এভাবে কয়েক দিন দিনমজুরি করি। কিন্তু সারাক্ষণ মনে কল্পনা করি। এভাবে চিন্তা করতে করতে কাঠের তৈরি ঝুরি বানানোর মেশিন তৈরি করি। এতে ওই সময়ে খরচ হলো আমার ৮শ’ টাকা। এরপর আরেকটু চিন্তাভাবনা করে আরও উন্নত লোহার যন্ত্র তৈরি করি। এ মেশিনটি বানানোর পর পরীক্ষামূলক কয়েক ঝুরি বানালেন। তাতে কাজও খুব দ্রুত হয়। ধীরে ধীরে এ যন্ত্রের জনপ্রিয়তাও বাড়ে।

এরপর কাওয়া বানানোর যন্ত্রটি তৈরির কাজে মনোযোগ দেই। অনেক গবেষণার পর ইনশাল্লাহ সেটিও তৈরি করি। যন্ত্রটি তৈরি করতে লাগে শ্যালো ইঞ্জিন বা বৈদ্যুতিক মোটর, লোহা কিংবা সিসা জাতীয় একটি বড় পাত্র, লোহার রড বা এঙ্গেল, প্যাঁচকাটানো রড, খাজকাটা ছোট-বড় কয়েকটি হুইল। যাতে মেশিন চালু করলে চাকা ঘুরবে এবং পাত্রের পানি গরম হবে। তাতে চাউলের কুড়া ফেলে দিলে কাওয়ায় পরিণত হবে। বর্তমানে আপডেটকৃত এ যন্ত্রের জনপ্রিয়তা এখন বেশি। ৩ বছর আগে যন্ত্রটি তৈরি করতে খরচ হয় ৩০ হাজার টাকা। এই মেশিন দিয়ে একমাসের সমপরিমাণ ঝুরি তৈরি হয়; একদিনেই। এই যন্ত্র তৈরিতে আমি কারোর কাছ থেকে কোন অর্থ সুবিধা নেইনি। ব্যবহারকারীরাই আমার এ যন্ত্রের নাম দিয়েছে বাহাদুর মেশিন।

দেবপাড়া শেখবাড়ির জিয়াউল হক (৩৬) জানান, প্রায় একযুগ ধরে এই ব্যবসা করি। ৫ হাজার টাকা নিয়ে ব্যবসা শুরু করি। আমরা ৬ জনে একত্রে কাজ করি। বাহাদুর মেশিন তৈরির পর ৩ বছর ধরে ব্যবসা ভাল। দৈনিক প্রায় ১০ মণ ঝুরি তৈরি করতে পারি। পাইকারি দরে প্রতিকেজি ঝুরি বিক্রি করি ২৪-৩০ টাকায়। আগে মাথা গুজার ঠাঁই ছিল না আমার।

খুরশেদ আলম (৫০) জানান, এ কাজ বাপ-চাচারাও করেছেন। ছোট্ট রেখে আমার পিতা মারা যান। দিন চলে না। মা বাড়ি বাড়ি ঝিয়ের কাজ করতেন। বড় হয়ে বছরে ৪০ টাকার চুক্তিতে রহিম উদ্দিন মাস্টারের বাড়ি কাজ করি। এই ৪০ টাকায় ২ মণ ধান কিনে ব্যবসা শুরু করি। আমার আগ্রহ দেখে; নাছির সাব ব্যবসার জন্য ১০ মণ ধান দিলেন। আস্তে আস্তে টাকা পরিশোধও করি। বাহাদুর মেশিন পেয়ে ব্যবসা ভাল করেছি। আগে ব্যবসা ছিল ৬ মাস। এখন করি ৩ মাস। তাতেও লাভ বেশি। বাড়ির ভিটাও ছিল না। এখন ১০ কাঠা জমি কিনে নিজস্ব ঘর করেছি। ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করছে। আরেক মেয়ে বিয়ে দিয়েছি। আর কী চাই? টাকার দরকার হলেই সাজেদা ফাউন্ডেশনের কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছি। দুই ধরনের ঝুরি বিক্রি করি। সাদা ঝুরি ৩০-৪০ টাকা এবং পাকা ঝুরি অর্থাৎ চিনিগুড় মিশ্রিত ঝুরি ৭০-৮০ টাকা কেজি। প্রতিমণে লাভ থাকে ৫-৬শ’ টাকা। কখনও ৮শ’ টাকা।