২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জাতীয় পরিচয়পত্র এবং নির্বাচন কমিশনের ২০ টাকার শিক্ষক!

  • জাকারিয়া স্বপন

গত বৃহস্পতিবার জেলা নির্বাচন কমিশন অফিসে যেতে হয়েছিল। আমেরিকা থেকে দু’জন প্রবাসী বন্ধু এসেছে। দেশের বাইরে থাকার কারণে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র করা হয়ে ওঠেনি। বাংলাদেশে কিছু করাতে গেলে প্রবাসীদের বেশ ঝক্কি পোহাতে হয়। ঝক্কি আসলে আমাদের সবারই পোহাতে হয়। তবে এটা এই দেশের সাধারণ মানুষের গা সয়ে গেছে। এই ঝক্কির ভেতরই তারা দালাল ধরে, ঘুষ দেয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অফিসের বাইরে বসে থাকে, আধা ঘণ্টার কাজ করাতে লেগে যায় কয়েকদিন।

এই ঝক্কিটা প্রবাসীদের জন্য একটু বেশি। প্রবাসীদের পৃথিবী চলে এক নিয়মে, আর তার দেশের নিয়ম চলে ভিন্ন নিয়মে। এই দুই নিয়মের ফারাকটা অনেক বেশি। তার নমুনা পাওয়া গেল আগারগাঁও এলাকায় অবস্থিত জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানকারী অফিসে গিয়ে।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য, ঢাকার আগারগাঁও এলাকায় সরকারের অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ অফিস স্থাপন করা হয়েছে এবং এখনও কিছু কিছু ভবনের কাজ চলছে। কিন্তু ওই এলাকার রাস্তা যদি আপনি দেখেন তাহলে দ্বিতীয়বার আর ওইদিকে পথ মারানোর কথা কেউ ভাববে না। কাদা-পানিতে পুরো রাস্তা গ্রামের পথ আর খানা-খন্দতে গাড়ি আটকে যাচ্ছে রাস্তায়। এই এলাকায় কিছু মন্ত্রণালয়ও আছে। মাননীয় মন্ত্রীদেরও এই রাস্তা দিয়েই প্রতিদিন যাতায়াত করতে হয়। তবে তাদের গাড়িগুলো অনেক উঁচু। তাই তারা হয়ত বিষয়টি বুঝতে পারেন না। তাদের জন্য বিষয়টি হয়ত অনেকটা বিনোদনের। কিন্তু যারা পায়ে হেঁটে কিংবা রিক্সায়, নয়ত ছোট গাড়িতে গিয়েছেন তারা জানেন কী সীমাহীন দুর্ভোগ পেরিয়ে একটি সেবার জন্য ওই এলাকায় মানুষকে যাতায়াত করতে হয়।

তারপর সেই কাদা-পানি পেরিয়ে যখন বিশাল সেই ভবনের সামনে পৌঁছবেন তখুনি আপনি বুঝে ফেলবেন কী সাংঘাতিক জায়গায় আপনি চলে এসেছেন! রাস্তার ওপর মানুষ উপচে পড়ছে। নিচে লবিতে মানুষ উপচে পড়ছে। লিফটের সামনে লম্বা লাইন। কারণ মূল অফিসটি সাততলায়। সেখানে গিয়ে দেখবেন আরেক এলাহী কা-। এই হুলুস্থুল কা-ে দালাল ধরা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। কোন একটি ডেস্ক নিজের মতো কাজ করছে বলে মনে হলো না। সর্বত্র দালালদের দৌড়াদৌড়ি।

জাতীয় পরিচয়পত্র হলো প্রতিটি নাগরিকের অধিকার; একটি বেসিক সেবা। এটাকে কম্পিউটারের আওতায় আনার জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক এটাকে ফান্ড করছে। জাতীয় পরিচয়পত্রের অনেক কিছুই এখন গুছিয়ে আনা হয়েছে। তবে মানুষের ভোগান্তি এখনও কমেনি। যারা এটার ব্যবস্থাপনায় আছেন তারা মানুষের জন্য সেবাটাকে কিভাবে সঠিকভাবে দেয়া যায় তার জন্য যদি কিছু বাজেট রাখেন তাহলে মানুষ সত্যিকারের উপকার পাবে।

॥ দুই ॥

জাতীয় পরিচয়পত্র অফিস থেকে প্রবাসী বন্ধুদের পরিচয়পত্র করানোর দুঃসাহস দেখানো থেকে বিরত থাকতে হলো। এই ঝক্কি ওরা নিতে পারবে না। বিকল্প পথ খুঁজে বের করা হলো। আমাদের আরেক বন্ধু (সরকারী কর্মকর্তা) পাঠিয়ে দিল জেলা নির্বাচন কমিশন অফিসে। সেটাও আগারগাঁওয়ে; তবে অনেক বেশি সহনীয় পরিবেশ। যেহেতু জাতীয় পরিচয়পত্রটি এখনও ভোটার আইডি কার্ডের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, তাই নির্বাচন কমিশন অফিসেও নিবন্ধন করার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে একটা সময়ে দু’টোকে আলাদা করে ফেলা হবে বলেই মনে হচ্ছে এবং সেটাই হয়ত সঠিক সিদ্ধান্ত। জাতীয় পরিচয়পত্র বহনকারী প্রতিষ্ঠান সবার নিবন্ধন করবে এবং নির্বাচন কমিশন সেই ডাটার ভিত্তিতে নির্বাচন পরিচালনা করবে।

এখানে এসে পরিচয় হলো একজন সৎ জেলা নির্বাচন অফিসারের সঙ্গে। তিনি বলছিলেন বাংলাদেশে একটি নির্বাচন পরিচালনা করা কতটা কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ। প্রিজাইডিং অফিসারের জীবন কিভাবে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে তা বিগত ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দেখা গেছে। এর ভেতরই তাদের কাজ করতে হয়। কাগজ-কলমে আছে নির্বাচনের সময় সকল প্রশাসনিক দায়িত্ব তাদেরÑ পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী সবাই তাদের কথা শুনবে। বাস্তব অনেক ভিন্ন। যারা মাঠে কাজ করেন তারাই সেটা জানেন। এ দেশের মানুষকে একটি সঠিক নির্বাচন পেতে আরও অনেক বছর অপেক্ষা করতে হবে। জাতি হিসেবে আমরা এখনও প্রস্তুত নই কিংবা আমরা ‘ডিজার্ভ’ করি না।

এই গ্রহের সবকিছুরই পাল্টা যুক্তি পাওয়া যাবে। একজন মানুষকে খুন কিংবা গুম করে দেয়ারও ভাল যুক্তি পাওয়া যাবে। সেই যুক্তি কারও কারও কাছে গ্রহণযোগ্য হবে, আবার কারও কাছে হবে না। কে সঠিক আর কে বেঠিক এটা নির্ধারণ করবে কে? আমি, আপনি নাকি জনগণ? যদি বলেন ‘জনগণ’ তখুনি প্রশ্ন ওঠে, জনগণ কি তা নির্ধারণ করতে সক্ষম? এই সক্ষমতার প্রশ্নটি তুলছে কারা? যারা ক্ষমতায় থাকেন তারা। যখনই যে ক্ষমতায় থেকেছেন তারা জনগণের কথা বলেন ঠিকই; কিন্তু সেটা এক ধরনের খেলা ছাড়া আর কিছুই নয় এবং সেই খেলার নাম নির্বাচন-ক্ষমতা খেলা। সেই খেলায় আমি, আপনি কেউ নই।

একজন সৎ নির্বাচন অফিসারকে এর ভেতরই নির্বাচন পরিচালনা করতে হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকলে প্রশাসন (পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী ইত্যাদি) যেভাবে নির্বাচন অফিসারদের কথা শোনে সিভিল সরকারের সময় একই প্রতিষ্ঠানগুলো একই রকম কথা শোনে না। তারা সরকারের বাতাস কোন্দিকে সেইদিকে তাকিয়ে থাকে। এই যদি হয় অবস্থা তাহলে তো বিশ্বাস করতেই হয়Ñ জাতি হিসেবে আমরা এখনও প্রস্তুত নই। দেশ তো চালাচ্ছে বাংলাদেশীরাইÑ বিদেশীরা তো আর দেশ চালাচ্ছে না। হয়ত আরও এক শ’ বছর পর কিংবা আরও পরে আমরা একটি পরিচ্ছন্ন নির্বাচন উপভোগের যোগ্যতা অর্জন করব। বিগত ৪৪ বছরে যেটুকু অর্জন হয়েছে বাকিটুকু করতে এক শ’ বছরেরও বেশি সময় লাগবে বলে আমার ধারণা।

॥ তিন ॥

নির্বাচন অফিসার সাহেব আমাদের জানালেন যে, ২৫ জুলাই থেকে ভোটার তালিকা হাল নাগাদ করার কাজ শুরু“হবে। ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি অথবা এর আগে যাদের জন্ম তাদের ভোটার তালিকায় আনা হবে। বর্তমান তালিকায় প্রায় ৯ কোটির ওপর ভোটার রয়েছেন। তবে অনেক ভোটার মারা গেছেন, তাদের তথ্য এখনও আপডেট করা হয়নি। সেটা আপডেট করার মতো সঠিক পদ্ধতি সরকারের কাছে এখনও নেই। কারণ, একজন ভোটার মারা গেলে সরকার খুব কম ক্ষেত্রেই জানতে পারে যে, তিনি মারা গেছেন এবং তার নামটি ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। এর মূল দায়িত্ব হলো পরিবারের সদস্যদের। তারা যদি নির্বাচন অফিসকে লিখিতভাবে জানান যে, তাদের একজন সদস্য মারা গেছেন, সেক্ষেত্রে তার তথ্য আপডেট করা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মৃত ব্যক্তির তথ্য কেউ নির্বাচন অফিসে জানাতে আসেন না। তাই কিছু ভোটার এখনও তালিকায় আছেন যারা জীবিত নন।

তবে নির্বাচন কমিশনের কাজটি কিন্তু খুবই কঠিন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য যোগাড় করতে হয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই কাজে লাগানো হয় বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের। প্রতিটি ফরম সঠিকভাবে পূরণ করে আনার জন্য তারা পান মাত্র ২০ টাকা। কারও কাছে মনে হতে পারে দিনে একজন শিক্ষক এক শ’টি ফরম পূরণ করে ফেলবেন। সেক্ষেত্র দিনে ২০০০ টাকা। মাসে ৬০,০০০ টাকা পেতে পারেন।

যখন নতুন ভোটার হন সেক্ষেত্র হিসাবটি সঠিক আছে। কিন্তু এবার যখন আপডেটের কাজ করা হবে তখন কিন্তু একজন শিক্ষক একটি এলাকায় এতো ভোটার পাবেন না। তাকে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে খুঁজে খুঁজে ভোটার বের করতে হবে। তাকে যেতে হবে প্রতিটি বাড়িতেই। কিন্তু সেখানে নতুন ভোটার পাবার সম্ভাবনা খুবই কম। সারাটা দিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে এক শ’ ভোটার যোগাড় করা সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন যে কোন নাগরিককে এই দায়িত্ব দিতে পারে এবং সেই নাগরিক এটা করতে বাধ্য। এই ক্ষমতাবলে শিক্ষকদের বাড়ি বাড়ি পাঠানো হয়। কিন্তু ২০ টাকা করে ভোটার সংগ্রহ করতে হলে তা দিয়ে কি একজন শিক্ষকের রিক্সা ভাড়া উঠবে? নাকি নির্বাচন কমিশন ধরেই নিয়েছে তারা পায়ে হেঁটে বাড়ি বাড়ি যাবেন এবং নিষ্ঠার সঙ্গে কাজটি করবেন?

এই ফি হয়ত অনেক আগের; নয়ত প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের জন্য ঠিক করা হয়েছিল। কিন্তু তথ্য আপডেটের জন্য এই ফি মোটেও ঠিক নয়। বেচারা শিক্ষকরা এটা নিয়ে হয়ত কথা বলারও সুযোগ পান না। শিক্ষকরা বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। তারা রাস্তায় নামলে আমরা গরম পানি দেই, নয়ত পুলিশী হামলা করি। তারা যে আমাদের ছেলেমেয়েগুলোকে স্কুলে দেখে-শুনে রাখেন সেই ‘ডে-কেয়ার’-এর সম্মানীটুকুও আমরা দেই না। নির্বাচন কমিশনের তো টাকার অভাব নেই। তারা কেন এই ২০ টাকা দেবে? কেন এটা ৫০ টাকা কিংবা আরও বেশি হতে পারে না?

॥ চার ॥

একজন শিক্ষক যখন কারও বাসায় তথ্য সংগ্রহে যান, সব সময় কিন্তু অবস্থা অনুকূলে থাকে না। অনেক বাসায় আজকাল নিরাপত্তা সংক্রান্ত ঝামেলায় পড়তে হয়। অনেকের বাসায় লিফট নেই। তাকে ছয়তলায় সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। অন্যের বাসায় বসে তথ্যগুলো সঠিকভাবে সংগ্রহ করে নিয়ে আসতে হয়। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, সেই শিক্ষকরা সব সময় ভাল ব্যবহারটুকুও পান না। একজন শিক্ষক মন খারাপ করে বলেছেন, আমাদের কাছে যখন কোন অভিভাবক তাদের সন্তানদের নিয়ে আসেন তখন আমাদের সঙ্গে যেটুকু সম্মান নিয়ে কথা বলেন, যখন আমরা তাদের বাসায় তথ্য সংগ্রহের জন্য যাই তারা একইভাবে সম্মান করেন না। অনেক ক্ষেত্রে খুব খারাপ ব্যবহারেরও মুখোমুখি হতে হয়।

ভদ্রতা কিংবা সৌজন্যতা আমাদের কম। কোথাও প্রয়োজন থাকলে তার পা ধরতে আমাদের যেমন বাধে না, আবার তাকে দূরদূর করতেও বাধে না। যখন যিনি ক্ষমতায় থাকেন তিনিই রাজা। যাদের বাসায় এই শিক্ষকরা তথ্য সংগ্রহ করতে যাবেন তারা কি একটু সৌজন্যতা দেখাতে পারেন না? কাজটুকু তো তারই। শিক্ষক সাহেব শুধু উপকারটুকুই করতে এসেছেন। তাহলে তার প্রতি সৌজন্যতা দেখাতে আমাদের এত কার্পণ্য কেন? এটাও শিখতে হয়ত আমাদের আরও এক শ’ বছর লেগে যাবে। তবে আশা করছি, এ বছর কেউ কেউ তাদের মানসিকতা ঠিক করে ফেলবেন। আপনার বাসায় যিনি তথ্য সংগ্রহে যাবেন তাকে সঠিক তথ্য এবং ভাল ব্যবহার দিয়ে সহায়তা করবেন।

ঢাকা ॥ ২৪ জুলাই ২০১৫

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং প্রধান নির্বাহী, প্রিয়.কম

ুং@ঢ়ৎরুড়.পড়স