২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিলিয়নিয়ার বেশি থাকলে দেশে প্রবৃদ্ধি হয় না

  • মূল : জান সভেজনার;###;অনুবাদ : এনামুল হক

১৯৭০ সালে কমিউনিস্ট চেকোসেøাভাকিয়া থেকে পালিয়ে আসার পর আমি কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। সেখানে আমাকে সমাজবিজ্ঞান কোর্সের সূচনা পর্বে শেখানো হয়েছিল যে, বিলিয়নিয়ার হওয়া অসম্ভব এবং আয়ের স্তর বিন্যাসের অন্তত একেবারে শীর্ষে আমেরিকান স্বপ্নের বাস্তবায়ন এখন আর কার্যকর কোন বিকল্প নয়। গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতায় নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়েছে যে, এই তত্ত্বটি ভ্রান্ত।

ধারণাগত এই পরিবর্তনটা শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, সারাবিশ্বের অনেক দেশেও আয় ও সম্পদের ক্ষেত্রে অসাম্য সৃষ্টির ওপর তাৎপর্যপূর্ণ পরিণতি বয়ে এনেছে। বস্তুতপক্ষে বিশ্বে আয় ও সম্পদের দিক দিয়ে সর্বশীর্ষে থাকা ১ শতাংশ মানুষ শীঘ্রই বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি সম্পদের মালিক হয়ে দাঁড়াবে। বিশ্ব সম্পদের ওপর তাদের এই ভাগটা ক্রমশ বাড়ছে। হতবিহ্বল করে দেয়া এই তথ্যের কারণে এমন কথা জিজ্ঞাসা করা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, আমাদের অর্থাৎ জনগোষ্ঠীর বাকি অংশের কাছে এটা কি অর্থ বহন করে? আয়ের শীর্ষ স্তরে সম্পদ এত বিস্ময়কর মাত্রায় পুঞ্জীভূত হওয়ায় বিলিয়নিয়ারদের অর্থনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের ধারণা উন্নত করে তোলা নিঃসন্দেহে সর্বোচ্চ স্তরের জননীতি বিষয়ক ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তাৎপর্যগুলো বোঝার ব্যাপারে অগ্রগতি অর্জন করতে হলে আমাদের এক বছর থেকে পরবর্তী বছর সম্পদ কিভাবে ক্রমবর্ধমানহারে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে সেটা শুধু দেখলেই চলবে না, স্বভাবতই তার চেয়ে বেশি কিছু অবশ্যই করতে হবে। মৌলিক যেসব প্রশ্নের জবাব দিতে হবে সেগুলো হলো : কেউ কেউ যেমন যুক্তি দিয়ে থাকেন সে অনুযায়ী একটা দেশে বৃহত্তর সংখ্যায় বিলিয়নিয়ার থাকা কি ইতিবাচক? কিংবা এমন কোন প্রমাণ আছে কি যে, এটা নেতিবাচক? নৈতিকতার প্রশ্নগুলো বাদ দিয়ে জিজ্ঞাসা করতে হয়, বিলিয়নিয়াররা কি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে তোলে, নাকি তা মন্থর করে দেয়।

এসব প্রশ্নের জবাবের ওপর নির্ভর করে মিডিয়া ও রাজনীতিতে যাদের বিলিয়নিয়ারদের সম্পদ বৃদ্ধির ব্যাপারে মোটামুটিভাবে অনুরাগ প্রকাশ করতে দেখা যায় তাদের নিজেদের ভূমিকাটা নতুন করে ভেবে দেখতে হতে পারে। আর যাই হোক না কেন, যদি দেখা যায় যে, অধিকসংখ্যক বিলিয়নিয়ার থাকা জিডিপির প্রবৃদ্ধির অনুকূলে নয় তাহলে সেক্ষেত্রে আয়বিন্যাসের শীর্ষভাগে থাকা ব্যক্তিদের আয়ের কেন্দ্রীভবন হ্রাস করার নীতিনির্ধারণী প্রস্তাবটি নৈতিক যুক্তি থেকে চলে আসে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি সম্পর্কিত যুক্তিতে।

এ হলো এক সেট প্রশ্ন, যা আমি ও আমার সহকর্মী ভিলানোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের সতীর্থ বাগচী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছি। ফরবিস ম্যাগাজিনে প্রকাশিত বিলিয়নিয়ার সম্পর্কিত তথ্য-উপাত্তকে কাজে লাগিয়ে আমরা ইকোনমেট্রিক টেকনিকগুলো প্রয়োগের মাধ্যমে এমন এক উপসংহারে পৌঁছেছি, যা দেখে কেউ কেউ হতবিহ্বল হয়ে যাবেন এবং অন্যরা হবেন আনন্দিত। উপসংহারটি হলো, কোন দেশে বেশি সংখ্যক বিলিয়নিয়ার থাকলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রকৃতপক্ষে মন্থর হয়ে যায়।

অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়, যেমন দেশের আয় ও শিক্ষার স্তর নিয়ন্ত্রণে থাকলে আমরা দেখিয়েছি যে, কোন দেশে অতিশয় ধনী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে কম অর্থ থাকলে সেদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্রুততর হয়। প্রকারান্তরে এর অর্থ দাঁড়ায় এই যে, আয় ও সম্পদের পিরামিডের শীর্ষভাগে যাদের অবস্থান তারা বাদে জনগোষ্ঠীর অন্যান্য অংশের হাতে অধিকতর অর্থ বরাদ্দ করা হলে অর্থনীতি আরও বেশি দক্ষতা অর্জন করতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ অন্য যেসব বিষয়কে বিবেচনায় নিতে হবে তাহলো অসাম্যের উৎস ও প্রকৃতি। দৃষ্টান্ত দিয়ে বলা যায় যে, ইন্দোনেশিয়া ও যুক্তরাজ্যে আয়ের ক্ষেত্রে অসাম্যের অতি বহুল ব্যবহৃত সূচকের মূল্য একই রকম (গিনি কোএফিশিয়েন্ট বলে যা বলা হয়ে থাকে)। তবে অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জনে রাজনৈতিক যোগাযোগ যে ভূমিকা পালন করে থাকে সেক্ষেত্রে এবং এরই পরিণতিতে আয় ও সম্পদ বণ্টনের দিক দিয়ে দু’দেশের মধ্যে লক্ষণীয় পার্থক্য বিদ্যমান।

মোটামুটিভাবে বলতে গেলে বিলিয়নিয়াররা দু’ধরনের হয়। এক হলো, যারা রাজনৈতিক যোগাযোগ ছাড়া বিলিয়নিয়ার হতে পারত না (অর্থাৎ রাজনৈতিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে টাকাকড়ি বানানো) এবং দুই, যারা নিজেদের অকপটতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং ঝুঁকি নেয়ার ইচ্ছার বদৌলতে বিলিয়নিয়ার হয়েছে (অর্থাৎ রাজনৈতিক সম্পর্ক ও যোগাযোগহীন)।

দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা-ের ওপর এই দুই ধরনের বিলিয়নিয়ারের প্রভাব একেবারে ভিন্ন ভিন্ন রকম হতে পারে। রাজনৈতিক সম্পর্কযুক্ত বিলিয়নিয়ারদের অনেক দেশেই দেখতে পাওয়া যায়। তবে রাশিয়াসহ কমিউনিস্ট শাসনোত্তর দেশগুলোতেও এরা সামঞ্জস্যহীনভাবে উপস্থিত। রাশিয়ায় এদের অনেকের আবির্ভাব ঘটেছে বরিস ইয়েলৎসিনের রাজনৈতিক অন্তরঙ্গজন হিসেবে। চীনের ক্ষেত্রেও তাই।

বিল গেটস ও ওয়ারেন বাফেটের মতো বিলিয়নিয়ার তাদের সম্পদের কারণে নিশ্চয়ই বাড়তি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। তবে রাজনৈতিক সম্পর্ক বা যোগাযোগ তাদের সম্পদের উৎস নয়।

আমরা লক্ষ্য করেছি যে, যেসব বিলিয়নিয়ারের সম্পদ রাজনৈতিক সম্পর্কযুক্ত হওয়া থেকে উদ্ভূত হয়েছে প্রবৃদ্ধির ওপর সেই সম্পদ প্রবল নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। পক্ষান্তরে সার্বিক অর্থনীতির ওপর রাজনৈতিক সম্পর্কহীন বিলিয়নিয়ারের সম্পদে প্রভাব এমন যে, শূন্য থেকে এর পার্থক্য নির্ণয় করা অসাধ্য। এর অর্থ রাজনৈতিক কৃপালাভী বিলিয়নিয়াররা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ব্যাহত করে। অন্যদিকে বিলিয়নিয়ারদের মধ্যে যারা রাজনৈতিক কৃপালাভী নয় গড়পড়তা হিসাবে তারা প্রবৃদ্ধিকে ব্যাহত করে না। গবেষণায় প্রাপ্ত এই ফলাফলগুলো আমাদের তথা বাকি জনগোষ্ঠীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেন? গুরুত্বপূর্ণ এই জন্য যে, এ থেকে বোঝা যায় আয় ও সম্পদ বণ্টনের প্রতি সরকারী নীতিতে সম্পদ বৃদ্ধি বা পুঞ্জীভবনের প্রকৃতিকে বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।

প্রাপ্ত ফলাফলগুলো জোসেফ স্টিগলিজ ও টমাস পিকেটির মতো অর্থনীতিবিদদের গবেষণালব্ধ ফলাফলের সঙ্গেও প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কযুক্ত। তারা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, আমরা এমন এক বিশ্বে বাস করি যেখানে বড়লোকেরা তাড়াতাড়ি আরও বেশি বড়লোক হবে। কথাটা সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। তারা বলেছেন, আমাদের এমন এক করনীতি উদ্ভাবন করা উচিত, যাতে গরিবরা আরও বেশি গরিব না হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো এবং অন্য আরও দেশে যেখানে রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে খায়খাতিরের মাধ্যমে সম্পদশালী হওয়ার ব্যবস্থাটি সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে নিতান্তই গৌণ ভূমিকা পালন করে, সেসব দেশের ক্ষেত্রে এর তাৎপর্য মোটেও কম নাটকীয় নয়।

বিশেষ করে আমেরিকানদের এমনটা ভাবতে শিখানো হয়েছে যে, অর্থনীতির ওপর বিলিয়নিয়ারদের ইতিবাচক প্রভাব থাকে। কেন? কারণ তারা হলো ‘ব্যতিক্রমধর্মী’ মানুষ, যারা অসাধারণ কিছু অর্জন করতে সক্ষম। মূল উপসংহার এই যে, গড়পড়তা হিসাবে রাজনৈতিক ক্ষমতাধরদের সঙ্গে যোগসূত্রহীন বিলিয়নিয়ারদের বেলাতেও দেখা যায় যে, এরা প্রবৃদ্ধির ওপর অনুল্লেখযোগ্য প্রভাব রেখে থাকে। সেখানে এই উপসংহার বিলিয়নিয়ার শ্রেণীর সমর্থকদের কাছে এক বিশাল নেতিবাচক বিস্ময় হিসেবেই দেখা দেবে।

সূত্র : গার্ডিয়ান

নির্বাচিত সংবাদ