২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পরমাণু চুক্তি নিয়ে অগ্নিপরীক্ষা

  • জাফর ওয়াজেদ

পরমাণু কর্মসূচী নিয়ে ইরানের সঙ্গে ছয় বিশ্বশক্তির সমঝোতা চুক্তির ফলে বাংলাদেশ লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ইরানের ওপর অবরোধ উঠে যাওয়ার পর বাংলাদেশ কম মূল্যে তেল কিনতে পারবে যেমন, তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রও বাড়বে। এই চুক্তিতে প্রতিবেশী ভারতও লাভবান হতে যাচ্ছে। চুক্তি সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারকে ইতোমধ্যে অবহিত করেছে ঢাকায় অবস্থানরত চুক্তিকারী দেশের রাষ্ট্রদূতরা। এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশ লাভবান হলেও মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রে তা ভিন্ন মাত্রা নিয়ে আসবে। বিশেষ করে ইরানবিরোধী উপসাগরীয় দেশগুলো। ইরানের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ এড়াতে পরমাণু চুক্তি করা হয়েছে বলা হলেও বাস্তবে এর পরিণাম কী দাঁড়াবে তা ক্রমশ স্পষ্ট হবে। এই চুক্তি ইতোমধ্যে ওবামাকে অগ্নিপরীক্ষায় ফেলে দিয়েছে। চুক্তির বিপক্ষে অবস্থানকারীরা চুক্তি বাতিলে সোচ্চার। তারা মনে করছে এই চুক্তি ইরানকে আরো ক্ষমতাধর করবে। যদিও বিশ্ব শান্তি ও স্বস্তির পক্ষে এক যুগান্তকারী এবং ঐতিহাসিক ও অভাবনীয় পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে ইরানের সঙ্গে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ছয় বিশ্ব শক্তির সমঝোতা চুক্তিটিকে। তর্কবিতর্ক সমালোচনা পর্যালোচনা যা-ই হোক, এমন একটি চুক্তিতে উপনীত হওয়া অনায়াসসাধ্য ছিল বলা যাবে না। এই চুক্তি ইরানকে স্বস্তি দেবে এই কারণে যে, তার দীর্ঘ অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাবে, খুলে যাবে বিশ্বের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের দরজাগুলো। তবে সেজন্য ইরানকে পরমাণু কর্মসূচী সীমিত করতে হবে। তবে এই চুক্তি যে পুরোপুরি স্বস্তি এনে দিচ্ছে তা নয়, খোদ চুক্তির উদ্্গাতা যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের একাংশ এর বিরোধী, কট্টরপন্থী ইরানীরাও। তারা বিক্ষোভ সমাবেশও করছে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ সৌদি আরব ও ইসরাইল। তারা মনে করছে, মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার বন্ধ করার পরিবর্তে সারা বিশ্বে অস্ত্রের প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে দেবে। সৌদিদের ভাষ্য, এই চুক্তি ইরানকে আরব দেশগুলোতে সৌদি আরবের শত্রুদের প্রতি সমর্থন বাড়ানোর সুযোগ দেবে। কারণ চুক্তির ফলে ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে আরো নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালাতে দিয়ে নিষেধাজ্ঞার হাত থেকে রেহাই দেবে। চুক্তি অনুযায়ী ইরানের হুমকি আরও গুরুতর হয়ে দেখা দিচ্ছে। রক্ষণশীল সুন্নি মুসলিম অধ্যুষিত সৌদিরা শিয়া অধ্যুষিত ইরানকে মোকাবেলা করতে গত ক’মাস ধরে বেশ তৎপর হয়ে উঠেছে। ইরানের প্রভাবই আরব দেশগুলোতে অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতার প্রধান কারণ বলে সৌদিদের বদ্ধমূল ধারণা। এটা বাস্তব যে, মধ্যপ্রাচ্যের সকল যুদ্ধ-দ্বন্দ্বের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক ভূমিকা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এটা পরিষ্কার যে, মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া ও ইরানের প্রভাব বাড়ায় উদ্বিগ্ন সুন্নি অধ্যুষিত উপসাগরীয় দেশগুলো। ইসরাইল ও সৌদি আরবে ঐতিহ্যগত প্রতিরক্ষা সহযোগী ইরানের সুসম্পর্ককে তারা সন্দেহের চোখেই দেখছে। যে কোন সমঝোতার বিপক্ষে থাকা সৌদি আরব চেয়েছিল ইরানের ওপর অবরোধ অব্যাহত থাক। ইসরাইল অবশ্য চেয়েছিল উৎকৃষ্ট একটা চুক্তি। যাতে ইরানকে একেবারেই পারমাণবিক শক্তিশূন্য করা সম্ভব হয়। ইরানের সম্ভাব্য হুমকির মুখে আরও ঐক্য জোরদার করতে সৌদি বাদশা নিজে ফিলিস্তিনের হামাস নেতার সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। এই হামাসরা অবশ্য ইরানের সহযোগিতা পেয়ে আসছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, ওমান ও কাতার মিলে গঠিত উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ এ চুক্তি নিয়ে ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন। তারা কাতারের দোহায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে শিগগিরই বৈঠক করে তাদের মতামত তুলে ধরবে। মধ্যপ্রাচ্যে এরাই মার্কিন মিত্র দেশ। যারা বলতে চায় আরব বিশ্বে বিভিন্ন দেশে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাচ্ছে ইরান। একই সঙ্গে এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোরও চেষ্টা করছে। এই দেশগুলো তাদের বড় শত্রু। ইরানকে চুক্তির জবাব দিতে নিজস্ব পরমাণু শক্তি উৎপাদনে পরিকল্পনা কার্যকরের গতি ত্বরান্বিত করতে চাইছে। তারা এমন এক পরমাণু অবকাঠামো গড়ে তুলতে চায়, যাতে পরে প্রয়োজনে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে পারে। ইরান পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হতে পারলে সৌদিরা সেখানে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে তা নয়। তারাও পরমাণু বোমা সংগ্রহে মরিয়া হয়ে উঠবে। ইরান ও সৌদির মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষমতার যে লড়াই তা পরমাণু লড়াইয়ে পরিণত হতে বেশি সময় নেবে না। এই আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না যে, পরমাণু চুক্তির ফলে ইরান আন্তর্জাতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্ত হয়ে পরোক্ষ লড়াইগুলোতে মিত্রদের সমর্থন জোগাতে আরো সুযোগ পাবে। ইয়েমেনে চলতি যুদ্ধে ইরানের নেপথ্য সহায়তা নিয়েও ক্ষুব্ধ সৌদিরা। এই যুদ্ধে অংশ নিয়ে এখনও জয়ের পথে যেতে পারেনি সৌদিরা।

পরমাণু চুক্তিটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ১৫ সদস্যের সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যে চুক্তি সইকারী ছয়টি দেশই রয়েছে। রাশিয়া চুক্তির ওপর প্রস্তাব এনেছিল। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ইরান চুক্তির শর্ত মানলে ২০০৬ সাল থেকে দেশটির ওপর যেসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, তা পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করা হবে। অবশ্য ইরান দাবি করে আসছে, পর্যায়ক্রমে নয়, এক ঘোষণাতেই সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে। চুক্তি অনুযায়ী অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরও দশ বছর বহাল থাকবে। তবে এটাও উল্লেখ রয়েছে, এই এক দশকের মধ্যে ইরান যদি তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তবে নিরাপত্তা পরিষদ দেশটির ওপর আবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারবে। চুক্তিটি আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পাওয়ায় শীঘ্রই ইরানের ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নও চুক্তির অনুমোদন দিয়েছে। এখন এটি মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদনের অপেক্ষায়। তবে তা অনুমোদন পাবে কিনা সে নিয়ে এখনও সন্দেহ রয়ে যায়। কংগ্রেসে রিপাবলিকান পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং তারা চুক্তির বিপক্ষে। চুক্তিকে তারা ইসরাইল ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে সমালোচনা করছে। চুক্তিকে ‘আতঙ্কজনক’ আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যানের হুমকি দিয়েছে। এক জরিপে দেখানো হয়েছে, চুক্তি সম্পর্কে অবগত ৭৯ জন মার্কিনীর মধ্যে ৪৮ ভাগ পছন্দ করেনি বিষয়টি। এমনটাও বলা হচ্ছে, গত ৩৬ বছর ধরে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক তিক্ত। তাই তাদের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে বিশ্বাসের কোন প্রশ্নই আসে না। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অন্য উর্ধতন কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে চুক্তিটি নিয়ে কংগ্রেস সদস্যের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক শুরু করেছেন। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলা কংগ্রেসের বৈঠকে পর্যালোচনা শেষে চুক্তির ভাগ্য নির্ধারিত হবে। অনেক সদস্যই চুক্তির বিষয়বস্তু নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে মার্কিন স্বার্থটিকে সামনে এনে চুক্তিটি অনুমোদনের জন্য তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন ওবামা। হুমকিও দিয়েছেন, চুক্তি অনুমোদনে বাধা এলে তিনি ক্ষমতাবলে ভেটো প্রদান করবেন। চুক্তির পক্ষে কংগ্রেসকে নিয়ে আসার পরীক্ষায় ওবামাকে উত্তীর্ণ হতেই হবে। অনেক কসরত চালিয়ে অন্য পরাশক্তি যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, জার্মানি ও চীনকে সঙ্গে নিয়ে চুক্তি করেছেন। বাকি পাঁচটি দেশের চুক্তি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে কোন উচ্চবাচ্য নেই। তাই এই দেশগুলোর সংসদ চুক্তিটি অনায়াসে অনুমোদন দেবে। জার্মানি বলেছে, পরমাণু চুক্তি হওয়ায় ইরানের ওপর দেশ ও বিদেশে নতুন দায়িত্ব আরোপ হয়েছে। এ কারণে ইসরাইল ইস্যুতে ইরানকে তার অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা উচিত বলে পরামর্শ দিয়েছে। অবশ্য ওবামাও ব্যাখ্যা দিয়েছেন এই বলে যে, ইরানের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ এড়াতেই কূটনৈতিক পথে চুক্তি করা হয়েছে। যারা ইরান চুক্তির বিরুদ্ধে বুক চাপড়াচ্ছেন, তারাই বলেছিলেন, ইরাক যুদ্ধ কয়েক মাসেই শেষ হয়ে যাবে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচীর বিষয়ে কূটনৈতিক সমঝোতাকে কোন কোন রাজনীতিবিদ ও প-িত চিন্তা-ভাবনা না করেই নাকচ করে দিয়েছেন। এরাই অতীতে তড়িঘড়ি করে ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অধিক দায়িত্বশীল হতে চাচ্ছেন ওবামা। কারণ তার উপলব্ধি এই যে, যুদ্ধ বেছে নেয়ার পরিণাম কী তা আমরা জেনেছি। মার্কিনী রক্ত ও অর্থের বিশাল অপচয় হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্র দেশগুলোর অধিকাংশই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু তারা ইরানের আধিপত্যবাদিতার বিরোধিতা করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র দু’দিকেই খেলতে চাচ্ছে। মিত্র দেশগুলোর সামরিক রসদ সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি ইরানের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনায় সচেষ্ট হবে। ইরানের তেল সম্ভার যেমন তার নজরে, তেমনি শিয়া গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও একটা সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় সুন্নি আরবের পাশাপাশি। দীর্ঘদিন ইরানের বিরুদ্ধে অবরোধ চালিয়েও তেমন সুবিধা করতে না পারার পর যুদ্ধের হুমকি দিয়েও পিছিয়ে আসতে হয়েছে। প্রবাদের সেই ‘বাঘেরও দুধ দেয়, সাপেরও দুধ দেয়’-এর মতো মার্কিনী ভূমিকা মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন খেলার সূত্রপাত করেছে। মার্কিনীদের বিশ্বাস, ইরানের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হলে পরমাণু অস্ত্রসমৃদ্ধ দেশ ইরানের চেয়ে পরমাণু অস্ত্র ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই বেশি ভাল। এটা স্পষ্ট যে, চুক্তির কারণে ইরানকে নিয়ন্ত্রণের যে ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র পেয়েছে, তার মাধ্যমে সে দেশটিকে প্রতিরোধ করার কাজ আরও বেশি কার্যকর হবে। এতে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের দেশগুলোর অগ্রযাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হবে কি-না তা নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দাবার ঘুঁটির চাল কিভাবে দেয়। ইরান লাভবান এই দিক থেকে যে, দীর্ঘকাল পর তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগ দিতে পারছে। এতে দেশটির ভেতরে ও বাইরে বড় ধরনের একটা পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক কাঠামো যেমন বদলে যাবে, একই সঙ্গে ইরানের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বও বাড়বে। এমনিতেই ইরানের কট্টরপন্থীরা এই চুক্তির বিরুদ্ধে এই কারণে যে, তারা মনে করছে এটা তাদের জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অবশ্য তাদের এই ধারণা নীতিগত ক্ষেত্রে কোন প্রভাব ফেলবে না। অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহারের পর ইরান বিপুল পরিমাণ অর্থ তার ধ্বংস হয়ে যাওয়া অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে ব্যয় করবে। আর এখানেই সৌদি ও ইসরাইলের ভয় যে, নতুন অর্থ ও অস্ত্রের বলে বলীয়ান হয়ে ইরান এই অঞ্চলকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে। ইরান বলে দিয়েছে, চুক্তির ফলে সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন, লেবানন ও ফিলিস্তিনে তাদের নীতির কোন পরিবর্তন হবে না। এই অঞ্চলে ইরানের নীতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতির একেবারে ১৮০ ডিগ্রী বিপরীতে। এই দেশগুলোতে জঙ্গী হামলা, গৃহযুদ্ধ ইত্যাকার কর্মকা- চলছে। শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব রয়েছে। ইরান একটা পক্ষাবলম্বন করে রসদ সরবরাহ করে আসছে তার সমর্থিত যুদ্ধবাজদের। মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন সংঘাতে ইরান জড়িত থাকার পরেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে এমন একটা চুক্তি করতে পারল এই প্রশ্ন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের মনে। তারা মনে করছে চুক্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটবে। তবে এটা ঠিক যুক্তরাষ্ট্র তার দীর্ঘদিনের মিত্রদের পরিত্যাগ করবে না। কিন্তু এটা তো বাস্তব, ইরানের সঙ্গে চুক্তির ফলে এই অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন অনিবার্য। তাই ইরানের যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী বাগাড়ম্বরের চেয়ে উচিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একযোগে কাজ করা। গত চার দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস এই ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল যে, ইরান এই অঞ্চলের বাইরের ভূখ-। আর এর ফলে অন্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইরান গুরুত্ব পায়নি। পরমাণু চুক্তি হয়ত এই অবস্থার অবসান ঘটাবে। যুক্তরাষ্ট্রকে ইরান এতদিন ‘মহাশয়তান’ বলে বিদ্রƒপ করে আসছিল। চুক্তির ফলে তা বাতিল হলেও তথাকথিত মহাশয়তানের সঙ্গে হাত মেলানো পুরো ইরানের রাজনীতিতে সত্যিকার অর্থে একটা পরিবর্তন আনবে। যুক্তরাষ্ট্র এটাও বলছে, চুক্তি হলেও পারমাণবিক বোমা তৈরি বন্ধে ইরানের ওপর শক্তি প্রয়োগের বিকল্প পথ রুদ্ধ হবে না। এই চুক্তি ভাল কি মন্দ হলো তা নিয়ে নানা মত রয়েছে। তবে এর একটি যুক্তিগ্রাহ্য মূল্যায়ন করতে আরও সময় অপেক্ষা করতে হবে। আর প্রেসিডেন্ট ওবামা নিঃসন্দেহে ততদিনে ক্ষমতা থেকে অনেক দূরে থাকবেন। কিন্তু এই চুক্তি ওবামার দ্বিতীয় দফা ক্ষমতায় থাকাকালে মধ্যপ্রাচ্যের বিষয়ে তাকে অগ্নিপরীক্ষায় যেতে হচ্ছে। ইরানকেও এই চুক্তি পরিপূর্ণ স্বস্তি দিতে পারবে তা নয়। বরং উপসাগরের শান্তির পরিবর্তে বিদ্যমান যুদ্ধাবস্থার আরও বিস্তার ঘটতে পারে। এমনিতেই উপসাগরীয় অঞ্চলের যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কৌশল সম্পূর্ণ বিপরীত।