২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে নতুন উদ্যোগে অভিনন্দন এবং কিছু প্রস্তাব

  • আ ব ম ফারুক

২৪ জুলাই ২০১৫ তারিখে দৈনিক জনকণ্ঠের প্রথম পাতায় ‘ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে নতুন উদ্যোগ’ শিরোনামে যে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে তার জন্য পত্রিকা কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। প্রতিবেদনটি থেকে আমরা জানতে পেরেছি যে, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে ইতিমধ্যে যেসব কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে সেগুলো চমৎকার সুফল দিচ্ছে। পাশাপাশি সম্প্রতি আরেকটি নতুন উদ্যোগ সরকারের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। সেটি হলো জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে দেশের সব নাগরিকের জন্য ডিজিটাল হেলথ কার্ডের ব্যবস্থা করা। এ লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সহযোগিতায় একটি ডাটা বেজ তৈরি করে তা সংরক্ষণ করা হবে। প্রতিবেদনটি অনুসন্ধানমূলক ও অত্যন্ত তথ্যবহুল।

প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বর্তমান অগ্রগতির বিবরণ প্রকাশ করে এর সঙ্গে যেসব ডিজিটাল প্রযুক্তি সংযুক্ত করা হয়েছে তার উল্লেখ করে বলা হয়েছে, দেশে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তোলার বিষয়টি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেরই অংশ। সরকার এ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর এবং এজন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বাস্থ্য খাতে যেসব অগ্রগতি সাধিত হয়েছে তার মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার প্রান্তিক পর্যায়ে ল্যাপটপ ও ট্যাবলেট কম্পিউটার বিতরণ, ৬৪টি জেলা ও ৪১৮টি উপজেলা হাসপাতালে একটি করে মোবাইল ফোন প্রদান, উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত প্রায় ৮০০টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান, এগুলোর মাধ্যমে প্রতিদিনের স্বাস্থ্যসেবার চিত্র মনিটরিং ও টেলিমেডিসিন পদ্ধতি চালু করাসহ বিনামূল্যে সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্য পরামর্শ প্রদান, বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ও জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে নিয়মিত ভিডিও কনফারেন্সিং ব্যবস্থা ইত্যাদি। ছয় বছর আগের সঙ্গে তুলনা করলে এ এক অভূতপূর্ব সাফল্য।

প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী সরকার এখন জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে দেশের সব নাগরিকের জন্য ডিজিটাল হেলথ কার্ডের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে দেশের স্বাস্থ্যসেবা নতুন মাত্রা পাবে। এ লক্ষ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতকৃত জাতীয় পরিচয়পত্র ডাটা বেজে নাগরিকের নাম, ছবি, পিতা ও মাতার নাম, জন্ম তারিখ ও স্থান, স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা, লিঙ্গ, বৈবাহিক অবস্থা, ধর্ম, পেশা ইত্যাদি সব ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষিত আছে। সেটি সংগ্রহ করে এখনকার কাজ হবে প্রতিজন নাগরিকের জন্য আলাদা আলাদা ডিজিটাল বা ই-হেলথ কার্ড তৈরি করা। কাজটি অত্যন্ত বিরাটাকার। কারণ, বাংলাদেশে জাতীয় পরিচয়পত্র বিতরণ করা হয়েছে প্রায় ১০ কোটি এবং প্রতি বছরই এটি হালনাগাদ করার সময় এই সংখ্যা বাড়তে থাকবে। কিন্তু তারপরও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বাস্থ্য অধিদফতর এ প্রস্তাব পাঠানোয় তাদেরকে অভিনন্দন জানাই এবং তাদের সাফল্য কামনা করি।

২০১০ সালে আমার একটি লেখা প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও চিন্তক নূহ-উল-আলম লেনিন সম্পাদিত ত্রৈমাসিক পথরেখা, জানুয়ারি-মার্চ ২০১০ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে আমি প্রস্তাব করেছিলাম জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী সব নাগরিকের জন্য ই-হেলথ কার্ড তৈরি করার। প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতিজন নাগরিকের সারা জীবনের স্বাস্থ্য তথ্য সংবলিত ই-হেলথ কার্ড তৈরি হয়ে কেন্দ্রীয় সার্ভারেই জমা থাকবে এবং রোগী যখনই অসুস্থ হবেন তিনি তার জাতীয় পরিচয়পত্রটি হাসপাতালে বা চিকিৎসককে দেখালে সেই নম্বরটি কম্পিউটারে পাঞ্চ করে চিকিৎসক রোগীর অতীত থেকে বর্তমান যাবতীয় তথ্য পেয়ে যাবেন এবং সে অনুযায়ী সঠিক চিকিৎসা দিতে পারবেন। রোগী যে শহরে বাস করেন সে শহরের বাইরে গেলেও অর্থাৎ বাংলাদেশের যে কোন জায়গা থেকেই এভাবে তার ই-হেলথ কার্ডে প্রবেশ করা যাবে। এমনকি দেশের বাইরে পৃথিবীর যে কোন দেশে গেলেও তা সম্ভব হবে। আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে, সরকার এই ই-হেলথ কার্ডের ধারণাটি বাস্তবায়নে অগ্রসর হয়েছে এবং স্বাস্থ্য অধিদফতর এর বিশদ প্রস্তাবনা তৈরি করে প্রথম ধাপ নির্বাচন কমিশনের কাছে ডাটা বেজ ব্যবহারের ব্যাপারে সহযোগিতা চেয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে দেশের স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে একটি বৈপ্লবিক অগ্রগতি অর্জিত হবে।

তবে আমার ২০১০ সালের প্রস্তাব অনুযায়ী এতে আরও কিছু বিষয় সংযোজন করা প্রয়োজন। যেমন রোগী যখন যে ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা করেন বা করেছেন তার রিপোর্টগুলো এই ই-হেলথ কার্ডে গ্রথিত করা যেতে পারে। এর ফলে রোগীকে আর তার এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাফি, সিটি স্ক্যান, এমআরআই বা অন্যান্য রিপোর্ট সঙ্গে নিয়ে বয়ে বেড়াতে হবে না। এসব রিপোর্ট এখন প্রায় সবই ডিজিটাল পদ্ধতিতে করা হয় তাই এসব রিপোর্ট ই-হেলথ কার্ডে সংযোজন করা কোন সমস্যা নয়। যেসব রিপোর্ট ডিজিটাল নয় সেগুলো এবং পুরনো প্রেসক্রিপশনগুলোও স্ক্যান করে এখানে লাগানো সম্ভব। এছাড়া রোগীর রক্তের গ্রুপ, ক্রনিক অসুখ, কোন কোন ওষুধে বা খাদ্যে তার এলার্জি রয়েছে, কি কি ওষুধ ব্যবহার করা হয়েছে, তার এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স, রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা কার্ডিয়াক রোগী কিনা, রোগীর আর্থিক সঙ্গতি ইত্যাদি সব তথ্যই এতে সংযোজন করা জরুরী। আগামী দিনের ই-কার্ড প্রণয়নে এগুলো অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছি।

লেখক : অধ্যাপক, ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ধনসভধৎড়য়ঁব@ুধযড়ড়.পড়স

নির্বাচিত সংবাদ