১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অর্থনীতির চালিকাশক্তির মূলধারায় নারীর অবদান বাড়ছে

সমুদ্র হক ॥ কর্মজীবী পুরুষের চেয়ে কর্মজীবী নারী তিনগুণ বেশি কাজ করে। নারী ও পুরুষ মিলে বর্তমানে ৫ কোটি ৮০ লাখ জনগোষ্ঠী কোন না কোন কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। একটা সময় বেশিরভাগ নারী শিক্ষকতা পেশা বেছে নিয়েছেন। শিল্পখাতে নারী শ্রমিকের সংখ্যা ছিল খুবই কম। একবিংশ শতকে কর্মজীবী নারীর পূর্বের চিত্রের সঙ্গে বর্তমান চিত্রের বিস্তর ফারাক। শিল্প ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারী শ্রমিকের সংখ্যা বেশি। এর বাইরে এমন কোন সেক্টর নেই যেখানে নারী কর্মজীবী নেই। শিক্ষক চিকিৎসক প্রকৌশলী বিজ্ঞানী বৈমানিক সেনা ও নৌসেনা পুলিশ আনসার নির্মাণকর্মী ব্যাংক বীমাসহ জনপ্রশাসনের বিভিন্ন শাখা মিলে প্রায় এক কোটি নারী প্রধান নির্বাহী, শীর্ষ নির্বাহী, উচ্চপদের কর্মকর্তা থেকে কর্মচারী পদে নিয়োজিত আছেন। গণমাধ্যম ও শিল্পীর পেশাকেও বেছে নিচ্ছেন নারী। এর বাইরে কৃষি কাজে প্রায় ৯০ লাখ ও শিল্প খাতে প্রায় ২২ লাখ নারী শ্রমিক রয়েছেন।

সূত্র জানায়, গার্মেন্ট শিল্প খাতে নারী ও পুরুষ শ্রমিকের অনুপাত ৭৫ ঃ ২৫ অর্থাৎ চার ভাগের তিনভাগই নারী শ্রমিক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকস সংক্ষেপে বিবিএস) এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়ে যাওয়ায় তারা ইকোনমিক্যালি এ্যাকটিভ। তারা কাজের জন্য বেতন ও মজুরি পাচ্ছেন এবং মূল্য সংযোজেন অর্থনীতিকেও সমৃদ্ধ করছেন। কর্মক্ষেত্রে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তির মূলধারায় নারীর অবদান দিনে দিনে বাড়ছে। বিবিএস সূত্রের হিসাব, প্রতিবছর গড়ে অন্তত দুই লাখ করে নারী কৃষি শিল্প ও সেবাখাতে যোগ হচ্ছে। একটা সময় জনপ্রশাসনে নারীর অংশগ্রহণ কম ছিল বর্তমানে তা পাল্টে গিয়েছে। অর্থনীতির মূলধারার স্বীকৃত উৎপাদন খাতের মোট কর্মীর প্রায় অর্ধেক নারী। অর্থনীতির বৃহত্তর তিনটি বড় খাত কৃষি শিল্প ও সেবাখাতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। কৃষি প্রধান উত্তরাঞ্চলে গেল শতকের শেষ দশকেও কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ পুরুষের চেয়ে কম ছিল। কৃষিতে যন্ত্র যুগের আগমনে ভাবা হয়েছিল নারীর অংশগ্রহণ আরও কমে যাবে। কার্যত তার উল্টোটি হয়েছে। ফসলের মাঠে পুরুষই অলস সময় কাটায় বেশি। একটা সময় যে পুরুষ কৃষক ভোরে ঘুম থেকে উঠে লাঙ্গল জোয়াল বলদ নিয়ে হাল চাষ করতে জমিতে যেত বর্তমানে নারী কৃষক সকালের কাজ সেরে পাওয়ার টিলার নিয়ে জমিতে যায়। সিংহভাগ চারা রোপণের কাজই করে নারী। সেচসহ পরিচর্যার অর্ধেকের বেশি করে নারী। যন্ত্রে ধান মাড়াই কাটাইয়ে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ আধাআধি। সিদ্ধ-শুকানোর পুরো কাজই করে নারী। আবাদ পরিচর্যার সঙ্গে শিশু পরিচর্যাও করতে হয় নারীকে। নারীকেই করতে হয় রান্নাবান্না ও গৃহস্থালি কাজ।

সকল দুর্যোগে গৃহস্থালির যাবতীয় সামাল দিতে হয় নারীকে। কৃষিখাতের কাজে নারীর যতটা অবদান পুরুষের অবদান ততটা নেই। বগুড়া অঞ্চলে যমুনা ও বাঙালী নদী তীরের কয়েক নারী সাফ বললেন ‘পুরুষরা এখন বাবুগিরি করতে ওস্তাদ’। দেশের বৃহত্তর চলনবিল পাড়ের চিত্র বলে দেয় কৃষিতে নারী কতটা এগিয়ে গিয়েছে। একটা সময়ের চারদিকের উত্তাল জলরাশির সেই বিল আর নেই। অনেক অংশ শুকিয়ে ঠা ঠা। যেখানে ছিল গভীর বিল সেখানে এখন ফসলের আবাদ। বিলপাড়ের যেসব জেলে পরিবারের আয়ের উৎস ছিল মাছ ধরা তারা এখন পেশা পাল্টেছে। নারীরা গৃহস্থালি সন্তান লালন পালনসহ জমিতে ফসল ফলানোর দায়িত্ব নিয়েছে। বেশিরভাগ পুরুষ সদস্য বড় শহরে গিয়ে দিনমজুরের পেশা নিয়েছে। এদের নতুন পরিচয় মাইগ্রেটেড শ্রমিক। এদিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পোশাক কারখানায় (গার্মেন্ট) নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। উৎপাদন খাত নিয়ে বিবিএসের সমীক্ষায় বলা হয় বিভিন্ন কল কারখানায় নারী শ্রমিক কাজ করে ২১ লাখেরও বেশি। যেখানে পুরুষ শ্রমিক প্রায় ১৯ লাখ।

একজন গবেষকের মতে এক সময় শিল্পমালিকরা নারীদের নিয়োগ দিতেন না। পোশাক শিল্পে নারীদের কাজের গতি ও এফিসিয়েন্সি দেখে শিল্প উদ্যোক্তরা নারী শ্রমিক নিয়োগ দিচ্ছে এবং তাদের শ্রমকে সহজলভ্য করে তুলেছেন। অর্থাৎ নারীর মজুরি হার এখনও কম। পাশাপাশি শিল্প উদ্যোক্তা হিসাবে নারী এখনও পিছিয়ে আছে। দেশে কলকারখানার সংখ্যা অন্তত ৪২ হাজার। এর মধ্যে ২ হাজার ১শ’৭৭ টি ক্ষুদ্র মাঝারি ও বড় কারখানার মালিক নারী। কয়েক নারী উদ্যোক্তা জানান, প্রায় ৯৮ শতাংশ নারী ব্যাংক ঋণ নিয়ে পরিশোধ করে। দেখা গেছে পুরুষরা ঋণের সুবিধা ভোগ করে তা শোধ করে নারী। উদ্যোক্তাগণের মতে নারীদের জন্য আলাদাভাবে শিল্প প্লট রাখা দরকার। এদিকে জনপ্রশাসন, সেবা ও পরিষেবা খাতের কর্মজীবী নারী বাইরে কাজ করে ঘরে গিয়েই রান্নাবান্না শিশু পরিচর্যা এবং গৃহস্থালির সকল কাজই করেন। বিবিএসের জরিপে দেখা গেছে নারী-পুরুষের চেয়ে অন্তত তিনগুণ বেশি কাজ করে। ঘরে বাড়তি এই কাজের জন্য নারী কোন বেতন বা মজুরি পায় না। ধরেই নেয়া হয় বাইরের কাজের পাশাপাশি ঘরের কাজ নারীর জন্য অদৃশ্য ‘ম্যান্ডেটরি’। একজন কর্মজীবী নারী অর্থের বিনিময়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা কাজের পর ঘরে গিয়ে দৈনিক গড়ে ৩ ঘণ্টা ৪৬ মিনিট গৃহস্থালি কাজ করে। আর পুরুষরা ঘরের কাজ করে মাত্র গড়ে ১ ঘণ্টা ১৪ মিনিট। মোট দেশীয় উৎপাদনে (গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট সংক্ষেপে জিডিপি) নানাভাবে নারীর অবদান আছে ঠিকই তবে সন্তান লালন-পালন এবং গৃহস্থালি কাজকর্মের স্বীকৃতি এখনও মেলেনি। এই শ্রমের আর্থিক মূল্যমান নির্ধারিত হয়নি। অর্থনীতিতে নারীর এই অবদান আড়ালেই থাকছে। মহানগরী নগর শহরে স্থায়ী ও অস্থায়ী গৃহকর্মী হিসাবে কাজ করছে প্রায় দশ লাখ নারী। এই নারীরা দিনে মজুরি পায় কখনও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পায় বাসা বাড়িতে। এদের কাজ গৃহস্থালি। বিবিএসের জরিপে বলা হয়েছে গৃহস্থালি কাজ করেন প্রায় সোয়া কোটি মানুষ যার সিংহভাগই নারী। এভাবে দেখা যায় কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণে দিনে দিনে বেড়ে যাওয়ায় অর্থনীতির চালিকাশক্তিতে নারীর অবদান বাড়ছে।