২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গ্রাম পেছনে ফেলে

  • মো. আবু হাসান তালুকদার

ঢাকা শহরের দিকে দ্রুত গতিতে চলছে গাড়ি। একই গতিতে পিছনে চলে যাচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। রাস্তার দুই পাশের গাছগুলো সাঁই সাঁই করে সরে যাচ্ছে। আর সেই সঙ্গে দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে সদ্য ফেলে আসা বাড়ির স্মৃতিগুলো। কিন্তু স্মৃতি তো স্থান, কাল, দূরত্ব দিয়ে আটকে রাখা যায় না। স্মৃতি থাকে সঙ্গে সঙ্গে, হৃদয়ের গভীরে, মনের মণিকোঠায়। এই তো এখনও মানসপটে জ্বল জ্বল করছে বিদায় বেলায় বৃদ্ধ মায়ের টলমলে চোখে তাকিয়ে থাকা, আবেগ লুকানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টায় বাবার অকারণ ব্যস্ততা। বড় ভাই-ভাবী ও বাচ্চাদের হাত নেড়ে বিদায় জানানো, স্কুল-কলেজ থেকে ঝরে পড়া গ্রাম্য বন্ধুদের সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দেওয়া। হৃদয়ে গভীর ভালবাসা কিন্তু প্রকাশে ভাষাহীন। মা বাবা থেকে শুরু করে কেউ ভালবাসার কথা বলেনি অথচ কত ভালবাসা। আসলে ভালবাসা দেখার দরকার নেই। শোনার দরকার নেই। হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারলেই হলো। শহরের এত চাকচিক্য আধুনিকতা। ফ্ল্যাটবাড়ির জৌলুস। অফিসের প্রভাব প্রতিপত্তি। অথচ মনটা এখনও ব্যাকডেটেডই রয়ে গেল। জীবনে এত দূর এসে এত ওপরে উঠেও মন পড়ে থাকে ছোট্ট অজপাড়াগাঁয়ে। এই ফালতু আবেগের (!) জন্য জীবনে কম কথা শুনতে হয়নি। এই আবেগ তো একান্ত নিজস্ব সম্পদ। কেউ ভাগ নিতে পারে না। কাউকে ভাগ দেয়া যায় না। এই আবেগ তো শিকড়ের। ঘুরি আকাশে যত ওপরেই উঠুক না কেন, লাটাই তো থাকে মাটিতেই। তেমনি গ্রাম থেকে বড় হওয়া শহরের মানুষগুলোর অবস্থা। গ্রাম ও শহর এই দুই পরিবেশের সেতু বন্ধন হওয়াও কিন্তু কম সৌভাগ্যের নয়। বিষাদময় ভাললাগায় ভরে আছে মন। হঠাৎ হার্ড ব্রেক করে গাড়ি থেমে যাওয়ায় লোকটির চিন্তায় ছেদ পড়ল। লক্ষ্য করল নিজের অজান্তেই কখন যে চোখে দুই ফোঁটা অশ্রু জড়ো হয়েছে। স্ত্রী-সন্তানদের কাছ থেকে অশ্রু লুকানোর জন্য দ্রুত রুমাল বের করে চোখ-মুখ মুছে ফেলল। সামনে দীর্ঘ গাড়ির লাইন। আবার সেই একই বিড়ম্বনা। কখন যানজট ছুটবে কে জানে। ঈদের আগে যাওয়ার সময় এই বিড়ম্বনা বাড়ি ফেরার আনন্দ ততটা খারাপ লাগেনি। এখন ফেরার পথে গাড়ির এই দীর্ঘ লাইন দেখেই বিরক্তিভাব চলে এলো।

লোকমুখে জানা গেল সামনে গাড়ি এক্সিডেন্ট করেছে। সেটা কত সামনে সঠিকভাবে কেউ বলতে পারছে না। কয়েকজন যাত্রী নাকি মারা গেছে। একটি দূরপাল্লার বাস নাকি ব্যাটারীচালিত অটোরিকশাকে ধাক্কা মেরেছে। অটোরিকশার প্রায় সকলেই মারা গেছে। অটোরিক্শাকে বাঁচাতে গিয়ে বাসও রাস্তার পাশে খাদে পড়ে গেছে। বাসযাত্রী অনেকেই গুরুতর আহত হয়েছে।

এই দুর্ঘটনাটি প্রতিবার ঈদের সময় ঘটে যাওয়া অনেক দুর্ঘটনার একটি প্রতীক মাত্র। প্রতিবারই কেন ঈদের সুখ স্মৃতি বেদনার স্মৃতিতে পরিণত হবে। ঈদ আনন্দ কেন রাস্তার ভোগান্তির কারণে যন্ত্রণাদায়ক হবে। হাইওয়েতে দ্রুতগতির যানবাহনের পাশাপাশি কেন ধীরগতির অটোরিকশা, সিএনজি বেবিট্যাক্সি, নসিমন চলবে। ঈদ আসলেই হাঁকডাক শুরু হয়ে যায় রাস্তা-ঘাট মেরামতের। আন্তঃজেলা সড়কের বেশিরভাগই এখন নাম হয়েছে বিশ্বরোড। কিন্তু এই রোডগুলো কি বিশ্বমানের? মেগা প্ল্যান করা হয়েছে চার লেন সড়কের। কেন আর একটু মেগা করে হাইওয়েতে রোড ডিভাইডার বা সড়ক দ্বীপের প্লান করা হয় না।

সড়ক দ¦ীপে গাছ লাগালে তো বিপরীতমুখী গাড়ির হেড লাইটের আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে না। কোন কোন সড়কের একই স্থানে বার বার দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু সে সব স্থানের ব্যবস্থার নেয়ার দৃশ্যমান কোন প্রতিকার চোখে পড়ে না। চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ এর মিছিল কেন দীর্ঘ হয় না? সড়ক যেন মৃত্যু ফাঁদ। আমরা ধরেই নিয়েছি এটাই নিয়তি। ঈদ আসলেই যেমন নতুন ডিজাইনের, নতুন ব্যান্ডের পোশাক বাজারে আসে। তেমনি শিকড়ের টানে বাড়ি ফেরা মানুষে উপচেপড়া যানবাহনের ছবি, অতঃপর কিছু মৃত্যু, শোকাহত স্বজনের কান্নার ছবি পত্রিকায় বড় শিরোনাম হবে। যেন রঙিন পোশাক ও রক্তাক্ত লাশের ছবিসহ পত্রিকার ঈদ স্পেশাল মুদ্রণ।

প্রায় দুই ঘণ্টা হলো গাড়ি যেখানে ছিল সেখানেই আছে। লোকটি স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে গরমে, ঘামে অস্থির। মৃত্যু সংবাদে প্রথমে বিচলিত হলেও এখন গা সয়ে গেছে অন্য সবার মতো। সে ঈদের সুখস্মৃতি ভাবতে চেষ্টা করছে। ঈদের দুই দিনে আগে তিন ঘণ্টার রাস্তা ছয় ঘণ্টা লাগিয়ে যখন রাতে বাড়ি গেল তখন আপনজন পেয়ে পথের ক্লান্তি ভুলে গেল। ঈদ উপলক্ষে তার ছোট বোনটিও স্বামীকে নিয়ে এসেছে। এসেছে ফুফুও। অনেক রাত পর্যন্ত বড় ভাই-ভাবী, ফুফু, বোনসহ সবাই মিলে গল্প গুজব করল। তার মনে হলো একেই বলে ঘরে ফেরার শান্তি, একেই বলে নাড়ীর টান। পরদিন নাস্তা সেরে গ্রামের বাজারে যেতেই গ্রামের বন্ধুরা সব ঘিরে ধরল। শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন, মুরব্বিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করতে করতেই দুপুর গড়িয়ে গেল। সারাদিন আনন্দ যেন তাকে ঘিরে রাখল। ঈদের দিন বাবার সঙ্গে সে এবং তার সঙ্গে তার ছেলে তিন প্রজন্ম একসঙ্গে নামাজ পড়তে গেল। ঈদের মাঠে পুরনোদের সঙ্গে দেখা হওয়ায় খুব ভাল লাগল। নামাজের পর প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ানো। এক বাড়িতে যায় তো আরেক বাড়ির লোক টানাটানি করে। এটাই তো আমাদের ঈদের মহিমা। সব ভেদাভেদ ভুলে যাওয়ার দিন। দেখতে দেখতেই ঈদের ছুটি শেষ হয়ে গেল। আবার কর্মব্যস্ততা, আবার যান্ত্রিকতা। সুখের মুহূর্তগুলো যেন আহ্নিক গতিতে চলে না, চলে আলোর গতিতে।

প্রতি বছর ঈদ আমাদের কাছে আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। সেই আনন্দ যেন বেদনাময়, যন্ত্রণাময় না হয়ে ভবিষ্যতের মধুরতম সুখ স্মৃতি হয়- এটাই আমাদের সকলের কাম্য।

মডেল : সামী