১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ধর্ষক, বলাৎকার, নির্যাতক, খুনীদের বয়কট করুন

  • মমতাজ লতিফ

বাঙালী পুরুষ কতটা বর্বর, পিশাচ হয়েছে তার জ্বলজ্যান্ত অসংখ্য প্রমাণের একটি উদাহরণ শিশু রাজনকে ২/৩ ঘণ্টা সময় ধরে পিটিয়ে হত্যা করা! স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে- প্রথমত, কি কারণে একটি শিশুকে প্রায় তিন ঘণ্টা যাবত খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করে মানুষ পৈশাচিক আনন্দ পায়? দ্বিতীয়ত, শিশু রাজনের আকাশ-বাতাস দীর্ণ করা কান্না ও চিৎকার নিশ্চয়ই শুনেছে স্থানীয় জনগণ। তারা রাজনের মৃত্যু পর্যন্ত নিষ্ক্রিয় রইল কেমন করে? এদের কি প্রথম দায়িত্ব ছিল না রাজনকে সম্মিলিত উদ্যোগে প্রাণে রক্ষা করা? ঐ এলাকার ইমাম, শিক্ষক, কৃষক, দোকানদার, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি ইউপি সদস্য, উপজেলা পরিষদ সদস্য, চেয়ারম্যান, পুলিশ কর্মকর্তা, আনসার এরা প্রায় তিন ঘণ্টার দীর্ঘ সময় রাজনের মর্মভেদী চিৎকার শুনেও কেন তার প্রাণ রক্ষায় এগিয়ে এলো না? এটি তার হত্যাকারীদের ধরে দেবার চাইতে অনেক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল, যা তারা দুঃখজনকভাবে করেনি। নির্মম নির্যাতনের সময় শিশুটি একজন প্রতিবেশীরও সাহায্য পেল নাÑ এ কেমন সমাজ? প্রায় একইভাবে সাভারে হত্যা করা হলো আরেক শিশুকে! এর আগেও বহু শিশু-কিশোরের মৃত্যু হয়েছে মানুষরূপী পিশাচদের হাতে। এর পাশে চলছে ধর্ষণ ও খুন, যৌতুকের জন্য পৈশাচিক নির্যাতন-হত্যা, লেখাপড়া করার অপরাধে হাত কেটে দেয়া, চোখ তুলে ফেলার মতো নারীদের ওপর অমানবিক নির্মম নির্যাতন! অন্যদিকে ছেলে শিশুরা বলাৎকারের শিকার হতে বাধা দিয়ে নিহত হচ্ছে! মেয়ে শিশুরা ধর্ষণের শিকার হয়ে খুন হচ্ছে! বিবাহিত তরুণীরা স্বামী ও শাশুড়ি, দেবর, ননদ, ননদের স্বামী, ভাসুর, শ্বশুরদের সম্মিলিত আক্রমণে ভয়াবহ নির্যাতনে হত্যার শিকার হচ্ছে। এসব কোনমতেই উচ্চ প্রবৃদ্ধি, মধ্যম মানের আয়ে পৌঁছানো দেশের নারী ও শিশুদের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

এই শিশু ও নারী নির্যাতন আর চলতে দেয়া যায় না। সরকারকে, বিশেষত শিশু ও মহিলা মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়টিকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে জেলা, উপজেলা ও গ্রামে গ্রামে সমাজের সব শ্রেণী-পেশার পুরুষ-মহিলাকে তাদের সামাজিক এবং মানবিক দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্বন্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখা যে নাগরিক দায়িত্ব সেটি সম্পর্কে অবগত করতে কর্মসূচী হাতে নিতে হবে। এখানে এ কাজটি সরকারের দায়িত্ব হলেও এটি সমাজের অন্যান্য শ্রেণী-পেশার জনমানুষের, বেসরকারী নারী-শিশু উন্নয়নে ব্রতী সংস্থাগুলো, সর্বোপরি ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পুলিশ প্রশাসন, অর্থাৎ নিরাপত্তা বাহিনী, সবশেষে স্থানীয় ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সমান দায়িত্ব। এর পাশে রয়েছে মিডিয়া- সংবাদপত্র ও বেতার, টেলিভিশনের দায়িত্ব। কি কি দায়িত্ব-কর্তব্য এরা পালন করতে পারে তার একটি রূপরেখা তৈরি করা যেতে পারে, যেমন-

ক) সমাজে মুরতাদ, কাফের ফতোয়া প্রদানকারী মোল্লা-মৌলভীরা এবার অবশ্যই শিশু বলাৎকারক, ধর্ষক ও নারী-শিশু হত্যাকারীদের মুরতাদ, কাফের ঘোষণা করতে পারে। কেননা তারা এতদিন শুধু মুরতাদ, কাফের ঘোষণা করে নিজেদের হেয়, জঙ্গীপন্থী প্রতিপন্ন করছিল। শিশু রাজনসহ অনেক শিশুই বলাৎকারককে বাধা দিতে গিয়ে খুন হয়েছে, নারী ধর্ষণকারীও একই রকম অপরাধ করে, নারীর চোখ তুলে ফেলা, যৌতুকের জন্য নারীকে চরম মারপিট করা পুরোপুরি অইসলামিক। ইসলামে যৌতুক নয়, বরং নারীকে মোহরানা দেবার রীতির উল্লেখ আছে। অথচ মোহরানা দূরে থাক, পুরুষগুলো স্ত্রীর বাবা-মার কাছে যৌতুকের নামে বার বার চাঁদাবাজি করে চলেছে। আশা করি, শীঘ্রই মোল্লা-মৌলভীরা জঙ্গী, খুনী, নারী ও শিশু ধর্ষণ-হত্যাকারীদের ‘মুরতাদ’ ঘোষণা করবেনÑ এ আশাই করে সমাজ।

খ) সমাজ থেকে শিশু ও নারী নির্যাতকের ব্যাপকতা দূর করতে মিডিয়া খুব সহজ একটি কাজ করতে পারে। আমরা চাই নির্যাতনের শিকারদের ছবি বাদ দিয়ে সংবাদপত্রে প্রথম পৃষ্ঠায় ধর্ষক, নির্যাতক, শিশু বলাৎকারক, নারী-শিশু-পুরুষ হত্যাকারীদের বড় বড় ছবি দিয়ে, নাম, ঠিকানা লিখে নির্যাতনের পুরো সংবাদটি পরিবেশন করতে হবে। ফলে পাড়া, মহল্লা, গ্রামে, শহরে পরিচিতজনেরা ওদের ঘৃণ্য অপকর্ম জানবে এবং সমাজ তাদের ধরিয়ে দেবে, তাদের বিপক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ দেবে এবং সামাজিক কাজে তাদের বয়কট করে লজ্জার পাত্র করবে। ঘটনার শিকার পরিবারকে আইনী ও আর্থিক সহায়তার জন্য আসামি পরিবারের অংশগ্রহণের জন্য চাপ তৈরি করবে।

গ) এই বৃদ্ধি পেতে থাকা শিশু ও নারী নির্যাতনকারীর জন্য মৃত্যুদ-ের বিধান, জামিন অযোগ্য গ্রেফতারের ব্যবস্থা রেখে এসব মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে শক্ত প্রমাণসহ এফআইআর প্রদান করে বিচার ও রায় বাস্তবায়নের গতি বৃদ্ধি করতে হবে। দুর্বল এফআইআর, স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে আসামিদের অর্থ লেনদেন, এসব অপরাধের অধিকাংশ শিকার গ্রামীণ দরিদ্র হওয়ার কারণে তাদের পক্ষে বিচার চেয়ে মামলা করা, মামলা চালানোকে প্রায় অসম্ভব করে তোলে। অথচ এই বর্বর অপরাধগুলোর বিচার হয়ে আসামি দ-িত, অন্তত কয়েকজন অপরাধীর মৃত্যুদ- না হলে এসব চরম অগ্রহণযোগ্য নির্মমতাকে মেনে চলায় অভ্যস্থ হয়ে পড়া সমাজ থেকে অপরাধ হ্রাস করা কঠিন হবে। আইনমন্ত্রীকে বলব, এসব অপরাধীর মৃত্যুদ- এবং তাদের সম্পদ জব্দ হলেই একমাত্র তারা দুর্বল হবে। সুতরাং আইনে এদের পরিবারের সম্পদ জব্দ, অর্থদ-ের ব্যবস্থাও রাখতে হবে। ফলে অপরাধ করার আগে আসামিদের দু’বার ভাবতে হবে। তাছাড়া এই আইনী ব্যবস্থাগুলো সম্বন্ধে স্থানীয় জনসভায় জনগণকে আইন হওয়া মাত্র অবহিত করতে হবে।

ঘ) সরকারী জাতীয় মহিলা সংস্থা, শিশু একাডেমি, ইসলামী ফাউন্ডেশন, নারী ও শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করে এমন বেসরকারী সংস্থাগুলোকে মহিলা নয়, স্থানীয় পুরুষদের নিয়ে কাজ করতে হবে। পুরুষদের জানাতে হবে, উদ্বুদ্ধ করতে হবে যে, তারা তাদের মায়ের প্রতি যে আচরণ, সম্মান আশা করে, সে একই আচরণ তাদের সন্তানরাও তাদের মায়ের প্রতি আশা করে। শুধু তাই নয়, ছোট শিশু মাকে নির্যাতিত হতে দেখলে, নির্যাতনের ফলে তাদের পরম আশ্রয় মায়ের মৃত্যু হলে ঐ সন্তানরা পড়াশোনা করতে, সুস্থ মনে বেড়ে উঠতে পারে না- এ তো স্বভাবিক। এ বিষয়ে পুরুষদের বোঝাতে হবে। যৌতুকের জন্য নির্যাতন ও নারী হত্যার ফল সম্পর্কেও অবহিত করতে হবে। উদ্বুদ্ধমূলক বা সচেতনতা সৃৃষ্টির লক্ষ্যে আয়োজিত সভার টার্গেট দল হবেÑ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নেতৃত্বে স্থানীয় পুরুষ ও বয়স্ক নারী। এছাড়াও নারী ও শিশুর অধিকারগুলো, যৌতুক প্রথাকে অইসলামী এবং ইসলামী বিয়েতে স্ত্রীর প্রাপ্য মোহরানা দিতে যে স্বামী বাধ্য, খোরপোষ চালাতে বাধ্য, তালাক হলে সন্তানের অভিভাবকত্ব, ব্যয় প্রদানÑ এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা দরকার। নারীর ক্ষমতায়ন শিক্ষা ও কর্ম দ্বারা সম্ভব। কিন্তু তার শান্তিপূর্ণ পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের বড় বাধা হচ্ছে স্বামী ও বৈরী শাশুড়ি-শ্বশুর, ভাসুর, দেবর, ননদ, এমনকি ননদের স্বামী পর্যন্ত। অথচ একদিন এই শাশুড়ি বধূ হয়ে স্বামী-সন্তান নিয়ে পরিবার পরিচালনা করেছিল, তার নিজের মেয়ে অন্য বাড়ির বধূ হয়েছে, তার পুত্রের সন্তানরা তাদের মায়ের জন্য শান্তিপূর্ণ পারিবারিক জীবন আশা করতে পারবে নাÑ এ কেমন অন্যায় কথা?

এসব সভা-সমাবেশের পাশাপাশি তরুণদের নিয়ে ‘যৌতুকহীন গ্রাম’ প্রতিষ্ঠায় তরুণসংঘ বা ক্লাব গঠন করা দরকার। কেননা, তরুণরাই সমাজের কুপ্রথাগুলো শিশু ও নারীর ওপর অন্যায় দাবিতে বর্বর নির্যাতন বন্ধ করতে পারে। যুব মন্ত্রণালয় যুবকদের পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সমাজের কুপ্রথা, যৌতুক বন্ধ, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ বন্ধে ক্লাব করে স্ব স্ব এলাকায় সক্রিয়ভাবে সমাজে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে। পুরুষ যখন স্বামী হয়, তারপর পিতা হয়, তখন তাদের পক্ষে মায়ের পুত্র হয়ে থাকা, তার কথায় ওঠা-বসা করা অন্যায়। তাকে পুত্র, স্বামী ও পিতাÑ এই তিন ভূমিকায় পরিবারের কল্যাণে যথাযথ, উপযুক্ত ভূমিকা পালন করতে হবে। যা কখনও একপেশে হয়ে পরিবারের শান্তি বিঘœকর বিষয় হয়ে ওঠে। অপরদিকে নারীদেরও কন্যা, বধূ, মাতা হয়ে উঠতে হয়। তবে মেয়েরা তাদের এ ভূমিকা অধিকাংশ ক্ষেত্রে পালন করে থাকে। বিঘœকারীর সংখ্যা শহরের উচ্চবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে কিছু দেখা যায়, যা গ্রাম ও শহরের দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে নির্যাতিত নারীদের পাশে উল্লেখযোগ্য নয়। এটা কে না জানে, শহরের উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীরা কতটা দৈহিক ও মানসিক নির্যাতন ভোগ করেও সন্তানের জন্য পরিবার টিকিয়ে রাখার এক কঠিন জীবনযাপন করে!

আমি আগেও লিখেছি, আবারও লিখছি- জেলখানায় জঙ্গীদের, দাগী অপরাধীদের জন্য যেমন মানবিক মূল্যবোধের ওপর সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রচারণা, সাংস্কৃতিক কর্মকা- পরিচালনা করা দরকার, তেমনি ধরা যাক ট্রাক ড্রাইভার এ্যাসোসিয়েশন, বাস ড্রাইভার এ্যাসোসিয়েশন, মোটর চালক এ্যাসোসিয়েশন, রিকশা, সিএনজি চালক এ্যাসোসিয়েশন, বস্তিবাসী, গ্রামের কৃষক ও অন্য পেশাজীবীদের জন্য ‘শিশুর সুস্থ বৃদ্ধি ও বিকাশ’, ‘মানবিক মূল্যবোধ’ সম্পর্কে অবহিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অপরদিকে মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও মাসে একদিন এসব বিষয়ে আলোচনার ব্যবস্থা করা দরকার। বর্তমানে সব পেশাজীবীর আয়-উপার্জন বৃদ্ধি পেয়েছে, তাদের স্বাস্থ্য ভাল হয়েছে। কিন্তু মানবিক মূল্যবোধ, দয়া, মায়া, স্নেহ, ভালবাসা হ্রাস পেয়েছে। অর্থহীন ‘ইমানী দায়িত্ব’ বলে উচ্চশিক্ষিত তরুণরা মুহূর্তে খুনী, জঙ্গী হচ্ছে। একটি শিশুকে তিন ঘণ্টা যাবত মারতে পারে যে সমাজ, যে সমাজ শিশুর চিৎকার শুনেও তাকে মৃত্যুর আগে রক্ষা করতে পারে না, যে সমাজে স্ত্রীকে যৌতুকের জন্য হৃদয়হীন স্বামী, শাশুড়ি টেস্টার দিয়ে খুঁচিয়ে চোখ তুলে নিতে পারে, সন্দেহ নেই সে সমাজ অর্থলোভী হয়েছে; কিন্তু মানবিক হতে পারেনি। প্রশ্ন হচ্ছেÑ কি করব আমরা এ সমাজকে মধ্য, উচ্চ অর্থনীতিতে উত্তীর্ণ করে? অথচ সারা দুনিয়ায় শেখ হাসিনার মতো মানবিক সরকারপ্রধান একমাত্র আমাদেরই আছে।

লেখক : শিক্ষাবিদ, গবেষক