২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সম্ভাবনাময় খাত ইলিশ

  • আজিজুর রহমান

স্বাদে-ঘ্রাণে-বর্ণে আর আকার-আকৃতিতে অতুলনীয় বাঙালীর সবচেয়ে প্রিয় মাছ- মাছের রাজা ইলিশ। বাঙালীর যে কয়টি গৌরবময় নিজস্ব ঐতিহ্য রয়েছে, এর মধ্যে অন্যতম ইলিশ। আবহমানকাল থেকেই ইলিশ মাছের কদর বাংলার ঘরে ঘরে। আর এ কারণেই ইলিশ বাঙালীর জাতীয় মাছ। এই রুপালি মাছটি আমাদের জাতীয় মর্যাদার প্রতীক, অর্থনীতির সহায়ক এবং পুষ্টির যোগানদাতাও। তাই এই ইলিশ শুধু আমাদের জাতীয় মাছই নয়, আমাদের জাতীয় সম্পদও বটে।

ইলিশ আমাদের জাতীয় সম্পদ এ কারণে যে, দেশের মোট মাছ উৎপাদনের ১৩ ভাগ আসে ইলিশ মাছ থেকে, যার আনুমানিক অর্থমূল্য ৮ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। জিডিপিতে ইলিশ মাছের অবদান ১.২৫ শতাংশ। প্রায় ৫ লাখ মানুষ ইলিশ আহরণে সরাসরি নিয়োজিত এবং ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ পরিবহন, বিক্রয়, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রফতানি ইত্যাদি কাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল প্রায় ৩ লাখ টন। ২০১২-১৩ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় সাড়ে ৩ লাখ টন। আর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে প্রায় ৪ লাখ টনে গিয়ে দাঁড়াবে বলে আশা করা যায়। জাটকা নিধন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সমর্থ হওয়ায় এই সাফল্য এসেছে। জাটকা নিধন না করতে সরকার দেশের ১৫ জেলার ২ লাখ ২৪ হাজার ১০২ জেলেকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে। জাটকা নিধন পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হলে প্রতিবছর ২১ হাজার কোটি থেকে ২৪ হাজার কোটি নতুন পরিপক্ব ইলিশ আহরণ করা যাবে। এতে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা মূল্যের ইলিশের বাজার সৃষ্টি হবে। আহরিত ইলিশের সামান্য পরিমাণ রফতানি করে প্রতিবছর দেড় শ’ কোটি থেকে ৩০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। প্রতিবছর ভারত ও মিয়ানমারে ইলিশ রফতানি হয় ৮ হাজার থেকে ৯ হাজার টন। ৮০০ থেকে ৯০০ টন রফতানি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে।

গত শতাব্দীর ৮০-এর দশক থেকে ইলিশের আহরণের পরিমাণ ক্রমশ কমতে থাকে। চাহিদা অনুপাতে যোগানে চরম সঙ্কট শুরু হয় দেশজুড়ে। হাহাকার পড়ে ইলিশের জন্য। ইলিশ হয়ে ওঠে স্বপ্নের সোনালি মাছ। বাঙালীর অতিপ্রিয় আর অতিথি আপ্যায়নে সেই সুস্বাদু ইলিশ এক সময় উধাও হয়ে যায় দেশ থেকে। দেশকে ইলিশশূন্য করার জন্য দায়ী মূলত আমরাই। আমাদের অপরিসীম লোভ ও অজ্ঞতা আর অপরিমেয় বোধহীনতার জন্যই দেশ ইলিশশূন্য হয়ে পড়েছিল। প্রতিবছর হাজার হাজার টন অবাধে জাটকা ও নির্বিচার ডিমওয়ালা ইলিশ নিধন এবং মাত্রারিক্ত ইলিশ আহরণ করে এই মাছকে আমরা প্রায় নির্বংশ করে ফেলেছিলাম। এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮৪ সালে চাঁদপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট। ধারাবাহিকভাবে ইলিশের আহরণের পরিমাণ কমতে কমতে ১৯৮৬-৮৭ অর্থবছরে এসে দাঁড়ায় ১ লাখ ৯৪ হাজার ৯৮১ টনে। ইলিশ আহরণের পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণ নির্ণয়ের লক্ষ্যে ১৯৮৬ সালে ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা শুরু করেন দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা। মাঝে কয়েক বছর ইলিশ আহরণের পরিমাণ স্থিতিশীল থাকলেও ১৯৯৩-৯৪ অর্থবছরে আবার আশঙ্কাজনকভাবে তা কমে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৫২ হাজার ৫৩১ টন। বছরে পর পর নিরলস ও শ্রমলব্ধ গবেষণার ফলাফল থেকে পাওয়া তথ্যে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন যে, ইলিশের পোনা জাটকা অবাধে নিধন এবং ডিমওয়ালা ইলিশসহ নির্বিচারে ইলিশ আহরণই এ মাছের চরম সঙ্কট সৃষ্টির প্রধান কারণ। ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা ইলিশ উন্নয়ন ও সংরক্ষণের জন্য সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি উদ্ভাবন এবং এর ওপর ভিত্তি করে ইলিশ মাছ রক্ষার জন্য সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় পরামর্শ উপস্থাপন করেন। এই পরামর্শ অনুযায়ী সরকার আইন করে জাটকা মৌসুমে জাটকা নিধন এবং ডিম ছাড়ার দিনগুলোতে ডিমওয়ালা ইলিশ ধরা বন্ধের নির্দেশ জারি করে। এরপর শুরু হয় জাটকা নিধন বন্ধের অভিযান। শুধু অভিযানই নয়, আন্দোলন শুরু হয় জনসচেতনতা সৃষ্টির পরিকল্পিত কার্যক্রমও। জাটকা নিধন ও ডিমওয়ালা ইলিশ ধরা সম্পূর্ণ বন্ধ করা না গেলেও প্রতিবছর ইলিশ আহরণের পরিমাণ বাড়ছে এবং গত অর্থবছরে তা ৪ লাখ টনের কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে। এমন সাফল্য এসেছে মূলত জাটকা নিধন ও ভরা প্রজনন মৌসুমে ডিমওয়ালা ইলিশ ধরা বন্ধে সরকারের কঠোর আইনী পদক্ষেপ, দেশের ৪টি ইলিশ অভয়াশ্রমে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা জারি, ইলিশ প্রজনন ক্ষেত্রগুলো সংরক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জেলেদের আর্থিক সহায়তায়। কিন্তু তারপরও আইন অমান্য করে এক শ্রেণীর জেলে কারেন্ট জাল দিয়ে জাটকা নিধন চালিয়ে যাচ্ছে। মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, প্রতিবছর গড়ে ১৪ হাজার ১৫০ টন জাটকা নিধন করা হচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ জাটকার ২০ ভাগও যদি রক্ষা করা সম্ভব হতো, তাহলে ১ লাখ ৭০ হাজার টন অতিরিক্ত ইলিশ আহরণ করা যেত। যার বাজারমূল্য ৪ হাজার কোটি টাকার মতো। মাত্রারিক্ত আহরণ জাটকা ও ডিমওয়ালা ইলিশ নিধনের কারণে ইলিশের বংশবিস্তারে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে আতঙ্কিত ইলিশ গতিপথ (গরমৎধঃড়ৎু ৎঁঃব) পরিবর্তন করে আরও দক্ষিণে অর্থাৎ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চল বা দেশের সীমানার বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতি যদি অব্যাহত থাকে তাহলে নিশ্চিত করে বলে দেয়া যায়, সাগর থেকে বিপুল পরিমাণ ইলিশ ডিম ছাড়ার জন্য দেশের নদ-নদীতে উঠে আসবে না। ফলে স্বাভাবিক ‘পুনঃউৎপাদন চক্র’ ব্যাহত হবে এবং দেশ আবার ইলিশশূন্য হয়ে পড়বে।

ইলিশ সাধারণত ডিম ছাড়ে আগস্ট থেকে নবেম্বর মাসের মধ্যে। তবে ১৫ অক্টোবর থেকে ২৪ অক্টোবর ( ৩০ আশ্বিন থেকে ৯ (কার্তিক) পূর্ণিমার সময় অর্থাৎ পূর্ণিমার আগের ৫ দিন ও পরের ৫ দিনÑ এ ১০ দিন ইলিশের ডিম ছাড়ার সর্বোচ্চ সময়। এ সময় সাগর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ উঠে এসে উপকূলের নির্দিষ্ট কিছু নদীর মোহনায় ডিম ছাড়ে। প্রতিটি মা ইলিশ ২০ লাখ পর্যন্ত ডিম ছাড়ে। কিন্তু এ থেকে মাত্র ৫ শতাংশ অর্থাৎ ১ লাখ রেণু পোনা উৎপন্ন হয়। ইলিশের ডিম ছাড়ার উপকূলীয় সীমানা পয়েন্টগুলো হচ্ছে- ১. উত্তর-পূর্ব চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই উপজেলার শাহের খালী- হাইতকান্দি পয়েন্ট, ২. দক্ষিণ-পূর্বে কুতুবদিয়া-গ-ামারা পয়েন্ট, ৩. উত্তর-পশ্চিমে ভোলা জেলার তজুমদ্দিন উপজেলার উত্তর-তজুমদ্দিন-পশ্চিম সৈয়দ আওলিয়া পয়েন্ট এবং ৪. দক্ষিণ-পশ্চিমে পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপালি পয়েন্ট। এ ৪টি পয়েন্টের অন্তর্গত প্রায় ৭ হাজার বর্গকিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত ইলিশের সর্বোচ্চ ডিম ছাড়ার ক্ষেত্র। ইলিশের অবাধ প্রজননের সুযোগ সৃষ্টির জন্য প্রতিবছর ১৫ থেকে ২৪ অক্টোবর উল্লিখিত পয়েন্টগুলোতে আইন জারি করে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়।

ইলিশের ডিম থেকে উৎপন্ন হয় রেণু পোনা যা প্রথমে জাটকা ও পরে পূর্ণ বয়স্ক ইলিশে পরিণত হয়। রেণু জাটকায় পরিণত হতে সময় লাগে ৫ থেকে ৬ মাস। উল্লেখযোগ্য যে, ৪-৫ সেন্টিমিটার থেকে ২৩ সেন্টিমিটার কম দৈর্ঘ্যরে অর্থাৎ ৯ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যরে ছোট শিশু ইলিশকে জাটকা বলা হয়। ১ নবেম্বর থেকে ৩১ মে এই ৭ মাস জাটকা মৌসুম। এ মৌসুমে জাটকা ধরা, বহন করা, ক্রয়-বিক্রয় করা, এবং মজুদ রাখা দ-নীয় অপরাধ। জাটকা মৌসুমের মার্চ ও এপ্রিল এই ২ মাস সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। প্রতিবছর এই ২ মাস চাঁদপুর জেলার ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুর জেলার চরআলেকজান্ডার পর্যন্ত মেঘনা নদীর নিম্ন অববাহিকার ১০০ কিলোমিটার এলাকা, ভোলা জেলার মদনপুর/চরইলিশ থেকে চরপিয়াল পর্যন্ত, মেঘনার শাহবাজপুর শাখা নদীর ৯০ কিলোমিটার এলাকা, একই জেলার ভেদুরিয়া থেকে পটুয়াখালীল চররুস্তম পর্যন্ত, তেঁতুলিয়া নদীর ১০০ কিলোমিটার এলাকা এবং নবেম্বর থেকে জানুয়ারি- এই ৩ মাস পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার আন্ধারমানিক নদীর ৪০ কিলোমিটার এলাকায় ইলিশ অভয়াশ্রমে সব ধরনের মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

মৎস্য গবেষণা ও ইলিশ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ইলিশের আহরণের পরিমাণ আরও বাড়ানো সম্ভব। ইলিশ মাছ ব্যবস্থাপনার মান উন্নয়ন ও গৃহীত কর্মপরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বছরে আরও ৫ থেকে ৬ লাখ টন ইলিশ আহরণ করা সম্ভব। এজন্য সরকারী উদ্যোগের পাশাপাশি প্রয়োজন বেসরকারী খাতকে উৎসাহিত করা। এবং ইলিশ মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত জেলেদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা। কেননা আইনের চোখ এড়িয়ে এখনও জাটকা ও ডিমওয়ালা ইলিশ নিধন করা হচ্ছে। এছাড়া জাটকা সংরক্ষণ আইন আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা এবং জাটকা ধরার সর্বনিম্ন আকার বর্তমানে প্রচলিত ৯ ইঞ্চি থেকে বাড়িয়ে ১২ ইঞ্চি করা। তাছাড়া ডিমওয়ালা ইলিশ সংরক্ষণের জন্য বর্তমানে ১৫ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত যে ১০ দিন মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেই সময়সীমা বাড়িয়ে ১৫ দিন করা যেতে পারে। আশ্বিন মাসের জোয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে এই ১৫ দিন ডিমওয়ালা ইলিশ ধরা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে পারলে মাছের ডিম ছাড়ার পরিমাণ ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে। প্রাকৃতিক পরিবেশ, ডিম ছাড়া ও বেড়ে ওঠা অর্থাৎ প্রজনন এবং বংশ বিস্তারের নিশ্চয়তা পেলেই ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। আরেকটি কথা, জাটকা নিধন ও ডিমওয়ালা ইলিশ ধরার ওপর যে আইনী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, সেই ইতিবাচক উদ্যোগটি যাতে যথাযথভাবে সর্বত্র বাস্তবায়িত হয়, সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিশেষ করে জেলা প্রশাসন, নৌবাহিনী, কোস্টকার্ড ও পুলিশ প্রশাসনের সজাগ দৃষ্টি সব সময় থাকা খুবই জরুরী।

ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হলে একদিকে যেমন ইলিশের যোগান বাড়বে, তেমনি মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণ হবে। অন্যদিকে এই মাছ রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রার আয়ও বেড়ে যাবে। এছাড়া দেশের প্রায় সোয়া কোটি মানুষ, যারা জীবিকার জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইলিশ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল, সেই জনগোষ্ঠীর জন্য ইলিশ সংরক্ষণ করার বিষয়ে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলে আমাদের এই ঐতিহ্যবাহী জাতীয় সম্পদও রক্ষা পাবে।

লেখক : গবেষক