২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মনোরোগবিদ্যাকে অগ্রাধিকার দেয়া হোক

  • ড. জীবেন রায়

জন্ম আমার বাংলাদেশে। বাংলাদেশই আমাকে বড় করেছে। বাংলাদেশ ছেড়ে বিদেশে জীবনযাপন করলেও প্রতিদিন সকালে বাংলাদেশের পত্রিকাগুলো পড়া আমার অনেককালের অভ্যাস এবং প্রতিদিনই মনটা খারাপ হয়। বেশিরভাগ খবরই থাকে মন খারাপ করার মতো। আহা, একটা পাতা যদি থাকত শুধু ভাল খবরে ভরা!

মৃত্যুর খবর কখনও ভাল হতে পারে না। তবু মৃত্যু যদি হয় সত্তর উর্ধে, মেনে নেয়া যায়। জীবনচক্র তো মানতে হবেই। তবে বাংলাদেশে অহেতুক মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক অনেক বেশি। ঈশ্বর মৃত্যু বেঁধে দিয়েছেন, সুতরাং মানুষের কিছু করার নেই। কথাটা কি সাম্প্রতিক তেরো বছর বয়সী রাজনের মৃত্যুর জন্য প্রযোজ্য? মানুষের করার অনেক কিছুই আছে এবং থাকে। ঈশ্বর হয়ত তাতেই খুশি হন। বাংলাদেশের গড় আয়ু সত্তর বলে খবরে প্রকাশ। দারুণ একটা ভাল খবর বটে। রাজন ছেলেটির মৃত্যু পরিসংখ্যান মতে গড় আয়ু কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে বৈকি!

রাজনৈতিক কর্মকা-েও অহেতুক মৃত্যু বেড়ে যায়। পেট্রোলবোমার মৃত্যুগুলো অহেতুক নয়? প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনাগুলো অহেতুক নয়? পিটিয়ে কিংবা চাপাতি দিয়ে হত্যাগুলো অহেতুক তো অবশ্যই। বিল্ডিং ধসে পড়ে মৃত্যুও অহেতুক। এ রকম আরও অহেতুক মৃত্যু ঘটছে বাংলাদেশে, যেখানে মানুষের অনেক কিছুই করার আছে।

ভাল খবরের মাঝে একটা খবর খুবই উল্লেখযোগ্য। তাহলো অচিরেই বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হতে চলেছে। দেশের যত উন্নয়ন হবে, পরিকল্পনাবিদদের সচেতন হতে হবে মনস্তত্ত্ব নিয়ে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোরোগবিদ্যাকে অগ্রাধিকার দেয়ার সময় এসেছে। এ আমি কি বলছি?

আমার বড় মেয়ে মেডিক্যাল পড়া শেষে ঠিক করল, সে সাইকিয়াট্রিতে বিশেষজ্ঞ হবে। ওর মা কিছুটা কষ্ট পেল। শিশু ডাক্তার, সার্জন, হৃদরোগের ডাক্তার ইত্যাদি না হয়ে কিনা মানসিক রোগের ডাক্তার হচ্ছে? আমি কিন্তু বিষয়টা অন্যভাবে দেখা শুরু করলাম। যুক্তরাষ্ট্র উন্নত দেশ- এটা নতুন কোন খবর নয়। কিন্তু এই উন্নত দেশ বলেই এই দেশ একটা পাগলের দেশও বটে। সম্প্রতি টেক্সাসে একটি মামলা জুড়ি বোর্ডের মতামতের অপেক্ষায় আছে। পাগল প্রমাণ করতে পারলেই বিচারে শাস্তি মওকুফ। অথচ সে বারো জনকে গুলি করে মেরেছে!

আমার কথা, দেখুন, এই ‘মন’ দিয়ে মানুষ মানুষকে ভালবাসে। এই মন দিয়ে ধনী মানুষ গরিব মানুষকে উদার হস্তে দান করে। আবার এই মন দিয়েই যুদ্ধ করতে লেগে যায়। এই মন দিয়েই এক মানুষ অন্য মানুষকে কুপিয়ে বা পিটিয়ে হত্যা করে। তাহলে কি আপনার মনের চিকিৎসার প্রয়োজন আছে না? সুতরাং মানুষের দেহের চিকিৎসা যেমন দরকার, মনের চিকিৎসা আরও বেশি দরকার। এক সময় ভাবা হতো গরিব লোক, গরিব দেশ, মনোরোগ আবার কি? এক ঘা বেত দিলেই ঠিক হয়ে যাবে। অবশ্যই নয়।

সেই কত আগে আমরা উত্তমÑসুচিত্রার ‘হারানো সুর’ দেখেছিলাম। ‘মন’ কিই না করতে পারে? কাঁদায়, হাসায় আবার রাগিয়েও তোলে। আমাদের তাই মানুষের মনের সুস্থতা ফিরিয়ে আনতে হবে। আপনার মনের কনফিডেন্সই আপনাকে স্বপ্ন দেখাবে। স্বপ্ন দেখাবে, কিভাবে ক্রিকেটে বাংলাদেশ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হবে। আমার মতে, বাংলাদেশ তো চ্যাম্পিয়ন হয়েই গেল। দরকার শুধু অস্ট্রেলিয়াকে ডেকে এনে সিরিজ জয়টা করে নেয়া।

আবার টিনএজ ছেলেটার মর্মান্তিক মৃত্যুর কথায় ফিরে আসি। চারজন অভিযুক্ত এবং সেই সঙ্গে আরও একজনকে যোগ করা দরকার। তিনি একজন এসআই। পাঁচজনের মনোবিশ্লেষণ করুন এবং সেইভাবে ব্যবস্থা নিন। শাস্তি যা হওয়ার তা তো হবেই। কিন্তু এর থেকে মানুষকে বাঁচাতে হবে। দেশকে বাঁচাতে হবে। এই নশ্বর পৃথিবীতে তাহলেই আপনি শান্তিতে মরতে পারবেন।

প্রথমেই আসি এসআইয়ের বিষয়ে। আপাতদৃষ্টিতে তিনি টাকার বিনিময়ে অভিযুক্তদের সাহায্য করতে চেয়েছেন হয়ত। যদি সেই রকম কিছু করেই থাকেন, তাকে খুব একটা দোষ দেয়া যায় কি? এটাই তো অলিখিত নিয়মে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশে। তিনি তো সেই কাজটাই করতে গিয়েছিলেন। এই মৃত্যু চাপা পড়ে যেত এবং এসআই সাহেব একটা বাড়ি কিনতে পারতেন। বাদ সাধল ফেসবুক এবং সাধারণ মানুষ। অভিযুক্ত একজন যিনি ভিডিও করেছেন এবং ফেসবুকে দিয়েছেন, আমার মতে শাস্তি তুলনামূলক তার কম হওয়া উচিত।

তবে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধিÑ এই ক্ষেত্রে ভীষণ কাজে লেগেছে। এর জন্য ধন্যবাদ পাবেÑ স্থানীয় জনগণ, সৌদি আরবে বাংলাদেশ হাইকমিশন- এই একটা উদ্যোগের জন্য বিদেশ মন্ত্রণালয় প্রশংসা পেতে পারে। প্রশংসা নিতে পারে সৌদিতে বাংলাদেশী কর্মজীবীরা এবং মিডিয়াকর্মী। মিডিয়ার ভূমিকা তো অনস্বীকার্য।

চৌকিদার সাহেব কেন কাজটা প্রথমে শুরু করেছেন? প্রথমত তাঁর কাজ চোর ধরা, তবে এক্ষেত্রে ছেলেটা চুরি করেছে কিনা, এখনও নিশ্চিত নয়। ধরে নেয়া যাক ছেলেটা চুরি করেছে। তাকে ধরল। পরবর্তীতে পয়সা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, তাহলে অন্য কিছু? পেডোফাইল কিনা খতিয়ে দেখা দরকার।

সৌদিতে চাকরিরত ভদ্রলোক কেন বেদম প্রহারে অংশগ্রহণ করল? সেকি নেতা সাজতে চেয়েছিল? এখানেই মনোরোগবিদদের প্রয়োজন। তারপরও কথা থাকে, একটা লোকও ছেলেটাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি। এত দিনেদুপুরে একটা বাচ্চা ছেলেকে মারছে। আমার মনে হয়, প্রতিটি রিমান্ডে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ থাকা উচিত। সমাজকে সঠিক পথে আনার জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞের মতামতকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। এই যে একদল মানুষ তৈরি হচ্ছে, যারা অন্য মানুষÑ ব্লগার হোক, বুদ্ধিজীবী হোক, শিক্ষক হোক কিংবা রাজনীতিবিদ হোক বা রাজনৈতিক কর্মী হোক, তাদের মারার শিক্ষা নিচ্ছেÑ তাদের সুস্থ পথে আনা তো সমাজেরই দায়িত্ব। আইন প্রয়োগে কোনরূপ বরখেলাপ যেমন চলবে না, তেমনি অঘটন যাতে না ঘটে, তার ব্যবস্থাও নিতে হবে তো।

এক একটি ঘটনা বাংলাদেশের জন্য মাইলফলক হয়ে থাকছে। অগ্রগতি যেমন আছে, তেমনি পেছনে টেনে নেয়ার মাইলফলকও আছে। অন্যদিন লেখা যাবে। আজ বরং দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে বাংলাদেশের সিরিজ জয়টাই আমাদের তিরিশ বছরের বিবাহবার্ষিকীর সঙ্গে উপভোগ করি।

লেখক : আমেরিকা প্রবাসী অধ্যাপক