১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভারি বর্ষণে ভেঙ্গে পড়েছে অর্থনীতি ॥ বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম

ভারি বর্ষণে ভেঙ্গে পড়েছে অর্থনীতি ॥ বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম
  • ক্ষতি চার হাজার কোটিরও বেশি ;###;রাজস্ব আয় অর্ধেকে নেমেছে;###;পণ্য খালাস হয়নি দেড় লাখ টনের

মোয়াজ্জেমুল হক, চট্টগ্রাম অফিস ॥ চার দিনের টানা ভারি বর্ষণে বৃহত্তর চট্টগ্রামে ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে ব্যাপক। চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও কক্সবাজারের সর্বত্র কয়েক লাখ মানুষ জলবন্দী থাকা ছাড়াও সহায়-সম্পদ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে। টাকার অঙ্কে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা কঠিন হলেও বাণিজ্যনগরী চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক কর্মকা-ে ক্ষতির পরিমাণ চার হাজার কোটি টাকারও বেশি ছাড়িয়ে যাবে বলে ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের বিভিন্ন সূত্রে জানানো হয়েছে।

পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর পরবর্তী সময়ে এমনিতেই বাণিজ্যিক কর্মকা- ছিল ধীরগতির। তার ওপর গত ২৩ জুলাই থেকে শ্রাবণের অঝর ধারায় যে বর্ষণ শুরু হয় তা টানা রবিবার রাত পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। সোমবার দুপুরের আগ থেকে এ অঞ্চলে সূর্যের দেখা মিলেছে। এরপরও আগামী আরও কয়েকদিন বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা করছে আবহাওয়া অধিদফতর। টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম মহানগরীর বাণিজ্যপাড়া তথা দেশের ভোগ্যপণ্যসহ বিভিন্ন আমদানিপণ্যের একক বৃহত্তম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই, আসাদগঞ্জ, কোরবানিগঞ্জ, মাঝিরঘাট, সদরঘাট, বন্দর এলাকার বাণিজ্যিক কর্মকা- মুখথুবড়ে পড়ে। চট্টগ্রাম বন্দরে এ সময়ে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল বন্ধ ছিল। বহির্নোঙরে পণ্য খালাসের কাজ সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে থাকে। দেশের আমদানিপণ্যের প্রায় নব্বই শতাংশ আসে সমুদ্রপথে চট্টগ্রাম বন্দরে। চার দিনের ভারি বর্ষণের কারণে এ বন্দর থেকে পণ্য যেমন খালাস করা যায়নি, তেমনি রফতানিপণ্যও জাহাজে ওঠানো যায়নি। এর ফলে বন্দর কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে প্রতিদিন গড়পড়তা যে রাজস্ব আদায় হয়ে থাকে তা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বাণিজ্যিক কেন্দ্র খাতুনগঞ্জে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাত হাজার ট্রাকের আনাগোনা চলে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই, আসাদগঞ্জ, কোরবানিগঞ্জ ও মাঝিরঘাট এবং বন্দর এলাকার গুদামগুলো থেকে কোন পণ্য পরিবাহিত হয়নি।

চট্টগ্রাম চেম্বার, চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন চেম্বার ও খাতুনগঞ্জ ট্রেড এ্যাসোসিয়েসন সূত্রে সোমবার জানানো হয়েছে, এ চার দিনের বৃষ্টির কারণে বাণিজ্যিক ক্ষতি চার হাজার কোটি টাকার বেশি ছাড়িয়ে যাবে। বন্দর সূত্রে জানানো হয়েছে, কন্টেনার হ্যান্ডলিং বাধাপ্রাপ্ত না হলেও বাল্ক পণ্য পরিবহন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকে। বহির্নোঙরে প্রতিদিন গড়ে ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার মেট্রিক টন খালাস হয়ে থাকে। লাইটার জাহাজগুলোর চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ চার দিনে দেড় লাখ টনেরও বেশি পণ্য খালাস হতে পারেনি। আবার এসব পণ্য খালাস হয়ে যেতে পারেনি চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। অপরদিকে, বন্দরের জেটি ও বহির্নোঙরে পণ্য খালাস না হওয়ায় চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস তাদের স্বাভাবিক রাজস্ব আয় থেকে বড় ধরনের ঘাটতির মুখে পড়েছে। কেননা, স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতিদিন গড়ে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ সোয়া শ’ কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু বর্ষণের ফলে স্বাভাবিক কার্যক্রম থমকে যাওয়ায় তা এ হাউসের রাজস্ব আয়কেও ব্যাহত করেছে চরমভাবে। কাস্টমস সূত্রে জানানো হয়, এ চার দিনে রাজস্ব আয় স্বাভাবিকের তুলনায় অর্ধেকেরও কম হয়েছে।

তবে সোমবার সকাল থেকে বর্ষণ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটায় বন্দরে দুপুরের পর থেকে জাহাজের আসা-যাওয়াও স্বাভাবিক হয়েছে। বহির্নোঙরে পণ্য ওঠা-নামার কাজ চলছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী বহির্নোঙরে পণ্যবোঝাই জাহাজ রয়েছে ৩৬টি। এ চার দিনে বর্ষণের আগ্রাসনে বহির্নোঙরে জাহাজের অবস্থানকাল প্রয়োজনের তুলনায় বিলম্বিত হবে নিশ্চিতভাবে। এতে করে পণ্যবোঝাই জাহাজগুলোকে অলস ভেসে থাকার বিপরীতে প্রতিদিন মোটা অঙ্কের ডেমারেজ গুনতে হবে।

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সূত্রে সোমবার জানানো হয়, এ এলাকা সংলগ্ন চাক্তাই খাল পুরো বাণিজ্যিক এলাকার জন্য বড় ধরনের সমস্যা হয়ে আছে। চাক্তাই খাল ভরাট হতে হতে বর্তমানে এটির অবয়ব সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন হয়ে গেছে। এক সময়ের বৃহত্তর হামিদউল্লাহ বাজার একেবারে অচল হয়ে গেছে। দেশের বৃহত্তম শুঁটকিপট্টিও অচল হওয়ার পথে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, চাক্তাই খালের দৈর্ঘ্য প্রায় তিন কিলোমিটার। এ খালের তলা পাকাকরণ করার কথা থাকলেও তা আঁতুড়ঘরেই মরেছে। গেল পাঁচ বছরে চট্টগ্রামের চাক্তাই খালসহ ছোট-বড় প্রায় এক শ’ খাল ও ড্রেনেজের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে এক শ’ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ের ঘটনা রয়েছে। কিন্তু এবারের বর্ষা মৌসুমে প্রমাণ হয়েছে বিপুল পরিমাণ এ অর্থ পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার নামে লোপাটই হয়েছে। অপরদিকে, কর্ণফুলী নদীর অবস্থাও সঙ্কটাপন্ন। ড্রেজিং বন্ধ। দু’পাড়ে চলছে দখলের মচ্ছব। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) যেসব আবসিক এলাকা প্রতিষ্ঠা করেছে এগুলোতে কোন সুষ্ঠু ড্রেনেজ সিস্টেম রাখা হয়নি। উপরন্তু নতুন নতুন ভবন নির্মাণ করতে গিয়ে ফাইলিংয়ের কারণে যেসব মাটি উঠে এসেছে বৃষ্টির কারণে এগুলোর বেশিরভাগ খালে ও নর্দমায় গিয়ে পড়েছে, যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। এ বিষয়ে চউক ও সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশল বিভাগের অবহেলা ও বিভিন্ন অনিয়মের জের হিসেবে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের জলজট পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। এবারের বর্ষা মৌসুমে যা ঘটেছে তা অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। শুধু নিম্নাঞ্চল নয়, উঁচু এলাকার বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কোথাও হাঁটু ও কোথাও কোমর পানিতে সয়লাব হয়ে যায়। যদিও সোমবার থেকে বৃষ্টি না হওয়ায় জলজট পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। অর্থাৎ পানি সরে গেছে। কিন্তু রেখে গেছে মারাত্মক ক্ষতির ছাপ। আবাসিক বাসাবাড়িগুলোর বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জীবনযাত্রা তছনছ করে দিয়েছে। ঘরের আসবাবপত্র থেকে শুরু করে সব ধরনের জিনিস নষ্ট হয়ে গেছে। এ অবস্থায় গত রবিবার চট্টগ্রামের নবনির্বাচিত মেয়র ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন। এ উপলক্ষে তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে জলজট পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে সচেষ্ট হবেন। কিন্তু বিভিন্ন সূত্রে বলা হচ্ছে, এ কাজ তার একার পক্ষে করা কখনও সম্ভব হবে না। চট্টগ্রামের অবকাঠামোগত উন্নয়নে মূল কাজ যে প্রতিষ্ঠানের, সেই চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বাড়িঘর নির্মাণের অনুমোদন প্রদানে নিয়মনীতি মানার ক্ষেত্রে শক্ত ভূমিকা না নিলে যত্রতত্র এবং আইনবহির্ভূত বাড়িঘর নির্মাণ থামানো যাবে না। আর এতে করে নগরীর খাল ও নালাসমূহের ড্রেনেজ ব্যবস্থায় বিপর্যয় ঘটতেই থাকবে, যার কারণে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি ও পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির গতিপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়ে জলজট পরিস্থিতির আগ্রাসী তৎপরতা চলতেই থাকবে।

আবহাওয়া অফিস সূত্র জানিয়েছে, এ মৌসুমে বৃহত্তর চট্টগ্রামে ভারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। চার দিনে বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে ৭৮৮ মিলিমিটার। যদিও এ রেকর্ড অতীতের বৃষ্টিপাতের পরিমাণকে ছাড়িয়ে যায়নি। কিন্তু মানুষের দুর্ভোগ ও ক্ষয়ক্ষতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। কেননা, প্রতি মৌসুমে নতুন নতুন এলাকায় প্লাবন সৃষ্টি যে হয়ে আসছে, এবার তার পরিধি বিস্তৃতি লাভ করেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জোয়ারের পানি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাগরের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় জোয়ারের সময় চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা ও আবাসিক এলাকাসমূহকে আঘাত করছে। এ এলাকা বর্ষণ ছাড়াই পানির নিচে তলিয়ে যায় জোয়ারের সময়। এ জোয়ারের পানি লবণাক্ত হওয়ায় তা বিভিন্ন সড়কসহ মানুষের বাড়িঘরের মূল্যবান সরঞ্জামাদিকে দ্রুত নষ্ট করে দিচ্ছে। এ পরিস্থিতি চলছে গত কয়েক বছর ধরে। কিন্তু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য চট্টগ্রামে যেসব সংস্থা রয়েছে বিশেষ করে সিটি কর্পোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সেদিকে কোন ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। আর এ ব্যর্থতার দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। আগ্রাবাদ আবাসিক এলাকাটি এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, রৌদ্রোজ্জ্বল পরিবেশেও সেখানে প্রতিদিন জোয়ারের পানি পুরো এলাকাকে সয়লাব করে দিচ্ছে। যে কারণে সেখানকার বাসাবাড়ির মালিকরা সঙ্কটে পড়েছে। বিভিন্ন ভবনের ভাড়াটিয়ারা বাসা ছেড়ে দিচ্ছে। এর পাশাপাশি সরকারী গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অফিসের অবস্থান থাকায় রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মাহবুবুল আলম জনকণ্ঠকে জানান, সিটি কর্পোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো এ বিষয়ে তৎপর না হলে এবং সরকারী প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া না গেলে বাণিজ্যিক নগরীখ্যাত এ শহরে বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে। খাতুনগঞ্জ ট্রেড এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এ্যাসোসিয়েসনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ছগীর আহমদ জনকণ্ঠকে জানান, চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৯৯৫ সালে গৃহীত মাস্টারপ্ল্যানের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং শহরজুড়ে প্রধান প্রধান যে খাল রয়েছে তা খনন করে আগের অবস্থানে নেয়া না গেলে জলজটের দুর্ভোগ থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব নয়।

এদিকে, চার দিনের ভারি বর্ষণে চট্টগ্রামের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় যে বিপর্যয় নেমে এসেছিল সোমবার থেকে এর উত্তরণ শুরু হলেও সৃষ্ট ক্ষতির কারণে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক হতাশার পাশাপাশি ক্ষোভও সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়েছে, সিটি কর্পোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কার্যকর তৎপরতা গ্রহণ না করলে পাহাড়ী এলাকার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ নগরী দেশের নিম্নাঞ্চলে যে বন্যা পরিস্থিতির ঘটনা ঘটে অনুরূপ পরিস্থিতির কবলে পড়বে, যা কখনও কাম্য হতে পারে না।

এই মাত্রা পাওয়া