১৬ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাঘের সংখ্যা নেমে এসেছে চার ভাগের এক ভাগে

বাঘের সংখ্যা নেমে এসেছে চার ভাগের এক ভাগে
  • সর্বশেষ জরিপে ১৬

কাওসার রহমান ॥ বাংলাদেশে বাঘের সংখ্যা আশঙ্কাজনক ভাবে কমে যাচ্ছে। আমরা এতদিন যা বিশ্বাস করে এসেছি বা জেনে এসেছি সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা তার চার ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের এই দুষ্প্রাপ্য প্রাণীর সংখ্যা এতটাই কমেছে যে, তা এক শ’র কাছাকাছি চলে এসেছে। ক্যামেরা পদ্ধতিতে বাঘ গণনা জরিপ শেষে এমন তথ্যই দিচ্ছে বন বিভাগ।

আগামাী ৩০ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস। এ দিবসকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলো সোমবার বাঘের এ হিসাব ফলাও করে প্রচার করেছে। এবারের বাঘ দিবসের মূল প্রতিপাদ্যই করা হয়েছে ‘বাঘ বাঁচলে বাঁচবে বন, রক্ষা পাবে সুন্দরবন’। সুন্দরবনের বাঘ রক্ষার ব্যাপারে জাতীয়ভাবে সচেতনতা তৈরির জন্য আগামী বৃহস্পতিবার মানিক মিয়া এ্যাভিনিউতে এক সমাবেশেরও আয়োজন করা হয়েছে।

গাছে গাছে গোপন ক্যামেরার মাধ্যমে করা জরিপে জানা যায়, বাংলাদেশের সুন্দরবনে এখন সব মিলিয়ে বাঘ রয়েছে ১০৬টি। এর আগে সর্বশেষ জরিপে বাঘের সংখ্যা বলা হয়েছিল ৪০০ থেকে ৪৫০টি। ২০১০ সালে বন বিভাগ ও ওয়াইল্ড লাইফ ট্রাস্ট অব বাংলাদেশ যৌথভাবে সুন্দরবনের খালে বাঘের বিচরণ পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে ওই জরিপ চালায়। তবে এবারের জরিপে বাঘের সংখ্যায় এই বিশাল ফারাক উঠে এসেছে। তবে কি কমে গেল রয়েল বেঙ্গল টাইগার?

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বাঘের সংখ্যা কমে যায়নি। অতীতে সনাতন পদ্ধতিতে করা জরিপ যথেষ্ট বিজ্ঞানসম্মত ও আন্তর্জাতিক মানের ছিল না। বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ও বাঘ গণনা জরিপের প্রধান জাহিদুল কবীর বলছেন, ‘সনাতন পদ্ধতিতে বাঘের পায়ের ছাপ এবং গতিবিধির ওপর ভিত্তি করে অতীতের জরিপের মাধ্যমে বাঘের প্রকৃত সংখ্যা জানা সম্ভব ছিল না। ফলে ক্যামেরায় ছবি তুলে, খালে বাঘের পায়ের ছাপ গুনে ও তার গতিবিধির অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ ব্যাখ্যা করে এই সংখ্যা নির্ধারণ করা গেছে।’

এ প্রসঙ্গে বন সংরক্ষক ড. তপন কুমার দে বলেন, ক্যামেরা ফুটেজের মাধ্যমে করা এই জরিপ গত এপ্রিলে শেষ হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ৮৩ থেকে ১৩০ এর মধ্যে রয়েছে। গড় হিসাবে বাঘের সংখ্যা ধরা হয়েছে ১০৬টি।

তিনি বলেন, ‘আমরা কাটছাঁট করে সুন্দরবনে আমাদের অংশে বাঘের সংখ্যা ১০৬টি নির্ধারণ করেছি। এটি অনেক সঠিক হিসাব।’

ইতোপূর্বে ভারতীয় অংশে ৭৪টি বাঘের হিসাবে পাওয়া গেছে। ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার সুন্দরবন এলাকার ৪০ শতাংশ রয়েছে ভারতে।

বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, নেপাল, মিয়ানমার ও চীনে রয়েল বেঙ্গল টাইগার দেখতে পাওয়া যায়। এরমধ্যে ছোট-বড় মিলিয়ে পুরো ভারতে বাঘের সংখ্যা রয়েছে ২ হাজার ২২৬টি।

ওয়াইল্ড লাইফ ফান্ডের তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী বাঘ এখন একটি বিপন্ন প্রাণী। বন্য এই প্রাণীটি এখন বেশ হুমকির মুখে রয়েছে। উনিশ শতকে এর সংখ্যা ছিল এক লাখ, যা বর্তমানে তিন হাজার ২০০ তে নেমে এসেছে।

ভারতের ওয়াইল্ড লাইফ ইনস্টিটিউটের প্রফেসর ওয়াই ভি ঝালহা বলেন, ‘২৪৪০টি বাঘের হিসাবে কাল্পনিক। সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে এই বাঘের সংখ্যা বড়জোর ২০০ হতে পারে।’

ম্যানগ্রোভ এই বনাঞ্চলে বাঘের সঠিক সংখ্যা কত তা জানতে ক্যামেরা পদ্ধতিতে বাঘ গণনা জরিপ কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৩ সালে। মাঝে বিরতি দিয়ে ২০১৪ সালের নবেম্বরে আবার শুরু হয় জরিপ শেষ হয় চলতি বছরের মার্চ মাসে। গত রবিবার বন বিভাগ জরিপের এই ফলাফল চূড়ান্ত করেছে। জরিপের পর বাংলাদেশে সুন্দরবনে বাঘের ঘনত্ব শিরোনামে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবৈধ শিকার, খাবারের অভাব এবং প্রাকৃতিক বিভিন্ন দুর্যোগের কারণে সুন্দরবনের বাঘের অস্তিত্ব কমছে। এছাড়া সুন্দরবন এলাকার ভেতরের নদী দিয়ে যান চলাচল ইত্যাদিও প্রভাব ফেলছে বাঘের নির্বিঘœ বসবাসের ওপর।

বন বিভাগের জরিপ দল সুন্দরবনে ৩৮টি পূর্ণবয়স্ক ও চারটি বাঘের বাচ্চার ছবি তুলতে পেরেছে। ক্যামেরাবন্দী হওয়া ৩৮টি বাঘের শতকরা ৩০ ভাগ পুরুষ এবং বাকিরা নারী। জরিপে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতীয় অংশ মিলে সুন্দরবনে মোট বাঘের সংখ্যা ১৭০টি। সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের বিচরণের প্রধান ক্ষেত্র বাগেরহাটের কটকা, কচি খালী ও সুপতি, সাতক্ষীরার মুন্সীগঞ্জ, দোবেকি ও কৈখালী এবং খুলনার নীলকমল, পাটকোষ্টা ও গেওয়াখালী। এর মধ্যে বাগেরহাটে ১৭টি, সাতক্ষীরায় ১৩টি ও খুলনায় আটটি বাঘের ছবি ধারণ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, সুন্দরবন হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্তম ম্যাগগ্রোভ বনভূমি। যা বিপন্ন এই বন্য প্রাণীর শেষ আশ্রয়স্থল।