২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পূর্ণাঙ্গ দুই রায় ও সাকা ঘিরে সারাদেশের দৃষ্টি সুপ্রীমকোর্টে

আরাফাত মুন্না ॥ একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগে চূড়ান্ত দ-প্রাপ্ত দুই কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের পূর্ণাঙ্গ রায় ঝুলে আছে দীর্ঘদিন। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ না হওয়ায় আপীল বিভাগে সাঈদীর সাজা লঘু হওয়ার রায় রিভিউ করার আবেদন করতে পারছে না রাষ্ট্রপক্ষ। অন্যদিকে, রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ না হওয়ায় মুজাহিদের দ- কার্যকরের পরবর্তী পদক্ষেপও নেয়া যাচ্ছে না। এদিকে, আগামীকাল বুধবার আবার নতুন করে আরেক কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর চূড়ান্ত রায় শোনাতে যাচ্ছে সুপ্রীমকোর্ট।

যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদ- হলেও সুপ্রীমকোর্টে এসে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতির মতের ভিত্তিতে আমৃত্যু কারাদ- হয় দেইল্লা রাজাকারখ্যাত কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর। গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ সংক্ষিপ্ত রায় দেয়ার পর ১০ মাস পার হলেও এখনও প্রকাশ হয়নি পূর্ণাঙ্গ রায়। মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণের পরও এই কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি না হওয়ায় এখন অনেকটা হতাশা নিয়েই পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য অপেক্ষা করছে রাষ্ট্রপক্ষ। আর পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে করা যাবে রিভিউ আবেদন।

অন্যদিকে, গত ১৬ জুন অন্যতম জামায়াত নেতা কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে মৃত্যুদ- দিয়ে চূড়ান্ত রায় দেয় সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ। এক মাসেরও বেশি সময় পার হলেও এখনও রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ না হওয়ায় পরবর্তী কোন পদক্ষেপ নেয়া বা মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর করা যাচ্ছে না।

সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ এখন পর্যন্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের চারটি মামলার রায় ঘোষণা করেছে। এরমধ্যে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা ও মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদ- কার্যকর হয়েছে। কাদের মোল্লার মৃত্যুদ- কার্যকরের অনেক পর তার রিভিউ বিষয়ক রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়। আর ওই রায়ে বলা হয়েছে, যুদ্ধপরাধের মামলায়ও অন্যান্য মামলার মতো সুপ্রীমকোর্টের চূড়ান্ত রায় রিভিউ করার আবেদন করা যাবে। তবে অন্য মামলার মতো এখানে সময় এক মাস না দিয়ে দেয়া হয়েছে ১৫ দিন। আর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির কথাও বলা হয়েছে ওই রায়ে। রিভিউ আপীলের সমতুল্য নয়, এ কথাও বলা হয়েছে কাদের মোল্লার রিভিউ বিষয়ক রায়ে। আর এরপরই মূলত আপীল বিভাগে সাঈদীর সাজা কমার বিষয়ে রিভিউর চিন্তা-ভাবনা শুরু করে রাষ্ট্রপক্ষ। রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মাহবুবে আলম ওই সময় বলেছিলেন, সাঈদীর রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পাওয়া গেলে রায় পর্যালোচনা করে রিভিউর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। রাষ্ট্রপক্ষের ধারণা, যেহেতু রায়ে একজন বিচারপতি সাঈদীকে মৃত্যুদ- দিয়েছেন, সেক্ষেত্রে এই রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করার সুযোগ থাকতে পারে। তবে কবে নাগাদ সাঈদীর রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি হাতে আসবে সে বিষয়ে জানা নেই কারও। তবে খুব শীঘ্রই মুজাহিদের ফাঁসির চূড়ান্ত রায়ের অনুলিপি পাওয়া যাবে বলে মন্তব্য করেছেন এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তিনি রবিবার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আশা করছি খুব শীঘ্রই জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদ-ের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ পাবে।

সাঈদী ॥ যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদ- হলেও সুপ্রীমকোর্টে এসে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতির মতের ভিত্তিতে আমৃত্যু কারাদ- হয় দেইল্লা রাজাকারখ্যাত কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর। গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ এ রায় দেয়। ওই দিন আদালত সংক্ষিপ্ত রায় দেয়। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মোঃ মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপীল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে ওই রায় দেয়। বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা হলেনÑ বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহা, বিচারপতি মোঃ আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক।

এই মামলায় সাঈদী ও রাষ্ট্রপক্ষ পৃথক দুটি আপীল আবেদন দায়ের করেছিল। ট্রাইব্যুনালের রায়ে সাজা ঘোষিত না হওয়া ৬টি অভিযোগে শাস্তির আর্জি জানিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আর সাঈদীর ফাঁসির আদেশ থেকে খালাস চেয়ে আসামিপক্ষ আপীল করে। আদালত উভয়টির আংশিক মঞ্জুর করে। রায়ে ১০, ১৬ ও ১৯ নম্বর অভিযোগে জামায়াতের এই নায়েবে আমিরকে আমৃত্যু সশ্রম কারাদ- দেয়া হয়। আর ৮ নম্বর অভিযোগের একাংশের জন্য সাঈদীকে ১২ বছরের সশ্রম কারাদ- এবং ৭ নম্বরের জন্য ১০ বছর কারাদ- দেয় আপীল বিভাগ। এছাড়া ৮ নম্বর অভিযোগের অপর অংশসহ ৬, ১১ ও ১৪ নম্বর অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে ৮ ও ১০ নম্বর অভিযোগে ইব্রাহিম কুট্টি ও বিসাবালীকে হত্যা এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে আগুন দেয়ার দুটি অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই কুখ্যাত রাজাকার সাঈদীকে ফাঁসির সাজা দিয়েছিল। এই যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে ২০টি অভিযোগ থাকলেও চূড়ান্ত রায়ে তার বিরুদ্ধে প্রমাণিত হলো পাঁচটি অভিযোগ।

বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরীর দায়ের করা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে একটি মামলায় সাঈদীকে ২০১০ সালের ২৯ জুন গ্রেফতার করা হয়। ওই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এই কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

মুজাহিদ ॥ কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদ-ের রায় বহাল রেখে গত ১৬ জুন সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ রায় দেয়। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহার নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপীল বেঞ্চ এ রায় দেয়। বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা হলেনÑ বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।

প্রসিকিউশনের আনা সাতটি অভিযোগের মধ্যে প্রথম অভিযোগে সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে অপহরণের পর হত্যা এবং ষষ্ঠ অভিযোগে বুদ্ধিজীবীসহ গণহত্যার ষড়যন্ত্র ও ইন্ধনের অভিযোগে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ওই দ- কার্যকর করার আদেশ দিয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই রায় এসেছিল সপ্তম অভিযোগে ফরিদপুরের বকচর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর বর্বর হামলা চালিয়ে হত্যা-নির্যাতনের ঘটনায়। আপীল বিভাগের রায়ে আপীল আংশিক মঞ্জুর করে প্রথম অভিযোগে আসামিকে খালাস দেয়া হয়েছে। সপ্তম অভিযোগে তার সাজা কমিয়ে দেয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদ-। আর ষষ্ঠ অভিযোগে বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল রেখে মুজাহিদের ফাঁসির আদেশ দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত। পঞ্চম অভিযোগে সুরকার আলতাফ মাহমুদ, গেরিলা যোদ্ধা জহিরউদ্দিন জালাল ওরফে বিচ্ছু জালাল, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ছেলে শাফি ইমাম রুমি, বদিউজ্জামান, আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল ও মাগফার আহমেদ চৌধুরী আজাদসহ কয়েকজনকে ঢাকার নাখালপাড়ায় পুরনো এমপি হোস্টেলে আটকে রেখে নির্যাতন এবং জালাল ছাড়া বাকিদের হত্যার ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার জন্য ট্রাইব্যুনালে মুজাহিদকে দেয়া হয়েছিল যাবজ্জীবন কারাদ-। আপীল বিভাগের রায়ে সেই সাজাই বহাল রাখা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের রায়ে তৃতীয় অভিযোগে ফরিদপুর শহরের খাবাসপুরের রণজিৎ নাথকে অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনায় পাঁচ বছরের কারাদ- দেয়া হয় মুজাহিদকে। ওই সাজা তার প্রাপ্য বলে আপীল বিভাগও মনে করেছে।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সাংবাদিক, শিক্ষকসহ বুদ্ধিজীবী হত্যা এবং সাম্প্রদায়িক হত্যা-নির্যাতনের দায়ে ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই মুজাহিদকে মৃত্যুদ- দিয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এক বছর পর আপীলে সেই সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সাব্যস্ত হয় সুপ্রীমকোর্টে। ২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধের বহুল প্রতীক্ষিত বিচার শুরুর পর ট্রাইব্যুনালে দ-িতদের মধ্যে মুজাহিদ হলেন চতুর্থ ব্যক্তি, আপীল বিভাগে যার মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে।