২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

‘হ্যালো ডাক্তার’ কর্মসূচী চালু

নিখিল মানখিন ॥ অবশেষে দেশের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে সরকারী ডাক্তারের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ‘হ্যালো ডাক্তার’ কর্মসূচী চালু করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এ কর্মসূচীর আওতায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা আকস্মিকভাবে ল্যান্ডফোনের মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোয় নিয়োজিত চিকিৎসকদের উপস্থিতি পরিবীক্ষণ করবেন। ফলে কেউ কর্মস্থলের বাইরে থেকেও কর্মস্থলে উপস্থিত থাকার মতো অসত্য তথ্য দিতে পারবেন না। কর্মসূচী পরিচালনার জন্য একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে ৬৬ কর্মকর্তার সমন্বয়ে মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে ‘হ্যালো ডাক্তার’ কর্মসূচী সংক্রান্ত এক অফিস আদেশ জারি হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব ফাতেমা রহিম ভীনা স্বাক্ষরিত এ অফিস আদেশে বলা হয়েছে, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে এ আদেশ জারি করা হলো এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত এ আদেশ বলবত থাকবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ‘হ্যালো ডাক্তার’ কর্মসূচীর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা প্রতি মাসে দু’বার আকস্মিকভাবে ল্যান্ডফোনের মাধ্যমে চিকিৎসকদের উপস্থিতি পরিবীক্ষণ করবেন। পরিবীক্ষণকালে প্রতিষ্ঠানের প্রধান ছাড়াও অন্য ডাক্তারদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। এমনকি হাজিরা খাতাসহ উপস্থিতি সংক্রান্ত যে কোন দলিলাদি তাৎক্ষণিকভাবে ফ্যাক্স করার নির্দেশ দিতে পারেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আগের কলাকৌশল বা পদ্ধতি খুব বেশি কাজে দেয়নি। তাই এবার কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা ফাঁকিবাজ ডাক্তারদের আটকাতে সরাসরি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় ‘হ্যালো ডাক্তার’ জাল নিয়ে মাঠে নেমেছে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আশা করছেন এখন থেকে বিনা অনুমতিতে কোন ডাক্তার কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে কিংবা সময়মতো কর্মস্থলে না এলেই ধরা পড়তে হবে ‘হ্যালো ডাক্তার’ জালে। আর তাৎক্ষণিকভাবেই ওই ফাঁকিবাজ ডাক্তারের বিরুদ্ধে নেয়া হবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে একদিকে ডাক্তারদের ফাঁকিবাজির সুযোগ ও প্রবণতা যেমন কমে যাবে, অন্যদিকে হাসপাতালে রোগীদের সেবার মান ও পরিধি আরও সুরক্ষিত হবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অধিশাখা সূত্র জানায়, ‘হ্যালো ডাক্তার’ কার্যক্রমের আওতায় ঢাকাসহ দেশের সব এলাকার সর্বস্তরের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসকদের অবস্থান তাৎক্ষণিক নিশ্চিত হওয়ার জন্য ল্যান্ডফোন বা টিএ্যান্ডটির সংযোগকৃত ফোনকেই মনিটরিংয়ের জন্য বেশি কার্যকর বলে মনে করা হচ্ছে। এ জন্য মন্ত্রণালয়ের মনিটরিংয়ে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের ৬৬ জন কর্মকর্তাকে বিশেষ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এসব কর্মকর্তা প্রতি মাসে অন্তত যেকোন দুই দিন আকস্মিক ল্যান্ডফোনে নিজের আওতায় থাকা হাসপাতালের যেকোন চিকিৎসক-কর্মকর্তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলবেন। ফলে কেউ কর্মস্থলের বাইরে থেকেও কর্মস্থলে উপস্থিত থাকার মতো অসত্য তথ্য দিতে পারবেন না। অবশ্য যেসব কর্মস্থলে ল্যান্ডফোনের সুবিধা নেই সেগুলোর বিষয়ে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হবে।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সরকারী হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তারদের কর্মস্থলে অনুপস্থিতি রোধে হিমশিম খেতে হচ্ছে এই মন্ত্রণালয়কে। মন্ত্রণালয়ের অধীন দুটি অধিদফতর- স্বাস্থ্য অধিদফতর ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর ডাক্তারদের অনুপস্থিতি ঠেকাতে দিশাহারা। ফলে নিত্যনতুন কৌশল ও পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হচ্ছে অবাধ্য ও ফাঁকিবাজ ডাক্তারদের জন্য। আগের প্রচলিত পদ্ধতি অনুসারে নিজ নিজ জেলার সিভিল সার্জন, বিভাগীয় পরিচালকও ব্যর্থ হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। কয়েক বছর আগে উপজেলা পর্যায়ের ডাক্তারদের কর্মস্থলে আটকে রাখার কৌশল হিসেবে স্থাপন করা হয়েছিল বায়োমেট্রিক ফিঙ্গার পুশ মেশিন। তাতেও লাভ হয়নি, বরং ওই মেশিনও নষ্ট করে ফেলার অভিযোগ ওঠে। এমনকি মোবাইল ফোন কিংবা ল্যাপটপের মাধ্যমে ইন্টারনেটে ট্র্যাকিং পদ্ধতিও তেমন কাজ দেয়নি। আবার কেবল উপজেলা বা জেলা হাসপাতালই নয়, মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোতেও একই সমস্যা বিদ্যমান। এসব হাসপাতালের অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও ফাঁকি দেন রোগীদের। প্রায় প্রতিদিনই অনুপস্থিতির দায়ে কোন না কোন ডাক্তারের বিভাগীয় শান্তিও হচ্ছে। এত কিছুর মাধ্যমে পরিস্থিতি আগের তুলনায় কিছুটা উন্নতি হলেও তা এখনো আশানুরূপ পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাই এবার ফাঁকিবাজ ডাক্তারদের কর্মস্থলে বেঁধে রাখতে সরাসরি মন্ত্রণালয় থেকেই শুরু হয়েছে নতুন আরেক কার্যক্রম। এ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হচ্ছে ল্যান্ডফোনে মনিটরিং পদ্ধতি। যার নাম দেয়া হয়েছে ‘হ্যালো ডাক্তার’।

সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত মনিটরিং সেলের এক বৈঠকে চিকিৎসকের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে মনিটরিং সেলের কর্মকর্তাদের শৈথিল্য নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। তিনি যেকোন উপায়ে ডাক্তারদের স্ব স্ব কর্মস্থলে হাজিরা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। বৈঠকে গত ছয় মাসের মনিটরিং প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। মনিটরিং সেলের আহ্বায়ক, অতিরিক্ত সচিব বাসুদেব গাঙ্গুলীর গত ৬ জুলাই চিঠির আদেশেও মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেলের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মনিটরিংয়ের ক্ষেত্রে শৈথিল্যের বিষয়টি উঠে এসেছে। ওই চিঠিতে বলা হয়, মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং কার্যক্রম পর্যালোচনায় দেখা যায়, বেশিরভাগ কর্মকর্তা টেলিফোনে চিকিৎসকের উপস্থিতি পরিবীক্ষণ করছেন না, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান সরেজমিন পরিদর্শনও করছেন না। ফলে মনিটরিং সেলের কার্যক্রম পরিচালনা দুরূহ হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দিয়ে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিবিড় ও ধারাবাহিক পরিবীক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখা আবশ্যক এবং পরিবীক্ষণের পর সুপারিশ বাস্তবায়ন হওয়া প্রয়োজন বলে ওই চিঠিতে জানানো হয়।