১৬ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত গত ৩ মাসে বাস্তবায়নের হার ৬৪ শতাংশ

  • অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রধানমন্ত্রীর

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন অগ্রগতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। গত তিন (এপ্রিল-জুন) মাসে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৬৪ দশমিক ৭১ শতাংশ। এছাড়া বৈঠকে ‘বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন-২০১৫’ নীতিগত এবং ‘বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন আইন-২০১৫’ তার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে চলতি বছরের দ্বিতীয় ত্রৈ-মাসিকের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন অগ্রগতি উপস্থাপন করা হয়। পরে এই অনুমোদন দেয়া হয়। সকালে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার নিয়মিত এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা সাংবাদিকদের বলেন, মন্ত্রিসভা যেসব সিদ্ধান্ত নেয় তা বাস্তবায়নের অগ্রগতি মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপন করতে হয়। গত বছরের দ্বিতীয় ত্রৈ-মাসিকের চেয়ে এ বছর ত্রৈ-মাসিকের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন বেশি ভাল। এতে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, চলতি বছর মন্ত্রিসভার বৈঠক হয়েছে ১৩টি। এই সময়ে ৬৮টি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বাস্তবায়ন হয়েছে ৪৪টি। এই সময়ে সংসদে আইন পাস হয়েছে তিনটি। কোন অধ্যাদেশ জারি হয়নি। নীতি বা কর্মকৌশল অনুমোদন হয়েছে দুটি। চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক অনুমোদন হয়েছে নয়টি। সার সংক্ষেপ উপস্থাপন করা হয়েছে বায়ান্নটি। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত সব সময়ই দীর্ঘ মেয়াদি হয়। তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়নের বিষয় নয়। তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়নযোগ্য সিদ্ধান্ত সাধারণত মন্ত্রিসভায় আসে না। সরকারের নীতি ও কর্মকৌশল মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হয়। যত বেশি সময় যাবে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের হার তত বেশি হবে উল্লেখ করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। ২০১৪ সালের দ্বিতীয় ত্রৈ-মাসিকে (এপ্রিল-জুন) সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল ৫৯টি। ত্রৈ-মাসিক বাস্তবায়ন ৩৩টি। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের হার ৫৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

বর্তমান ত্রৈ-মাসিকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ৬৮টি। বাস্তবায়ন ৪৪টি। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের হার ৬৪ দশমিক ৭১ শতাংশ।

সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর ৪ অনুশাসন ॥ মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিয়ে চারটি অনুশাসন রয়েছে। প্রথম অনুশাসন-প্রত্যেক মন্ত্রণালয় বা বিভাগ প্রতিমাসে সমন্বয় সভা করে। সেই অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন পরিস্থিতি যেন পর্যালোচনা করা হয়। তাতে বাস্তবায়ন পরিস্থিতি আরও ভাল হবে।

দ্বিতীয়ত : মন্ত্রিসভায় উত্থাপিত সরকারের মাল্টিসেক্টরাল পলিসি রয়েছে। সেসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ‘এক্সট্রা এফোর্ট’ প্রয়োজন। এ জন্য উদ্যোগী মন্ত্রণালয় অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, এটা করা হচ্ছে। তবে এটাকে রিমার্ক করা হয়েছে।

তৃতীয়ত : সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রিপরিষদকে অবহিত করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রও দিতে হবে।

চতুর্থ অনুশাসন : মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়টি সচিবরা পর্যালোচনা ও মনিটরিং করেন। সচিবদের পাশাপাশি মন্ত্রীরাও পর্যালোচনা ও মনিটরিংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবেন। যখন মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় তখন যেন মন্ত্রণালয়, অধিদফতর ও সংস্থার বাস্তবায়ন চিত্র প্রধানমন্ত্রী জানতে পারেন।

জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন ॥ জাহাজ ভাঙ্গার কাজে নিয়ম না মানলে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা জরিমানা ও এক বছরের কারাদ-ের বিধান রেখে আইন করার প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। অনুমতি ছাড়া জাহাজ আমদানি, ইয়ার্ড নির্মাণ ও আমদানিতে মিথ্যা তথ্য দিলে বিভিন্ন মেয়াদে এ শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। সোমবার মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে ‘বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন, ২০১৫’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এ আইনের আওতায় ‘জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ড’ গঠন করা হবে। মন্ত্রণালয়, সংস্থা, শিপ রিসাইক্লিং এ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি ও অন্যান্য বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা এই বোর্ডে থাকবেন। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হবেন এর চেয়ারম্যান। সর্বক্ষণিক দায়িত্বে থাকবেন সরকারের নিয়োগ পাওয়া একজন মহাপরিচালক, যিনি হবেন বোর্ডের প্রধান নির্বাহী। এই বোর্ড ইয়ার্ড স্থাপনের অনুমতি ও অনাপত্তিপত্র দেবে। রিসাইক্লিং ফ্যাসালিটি প্ল্যান তৈরি করবে। শ্রমিক নিরাপত্তা ও স্বার্থ সংরক্ষণ, দূষণ রোধ ও পরিবেশের বিষয়গুলো দেখবে এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃত মান নিশ্চিত করতে পরিবেক্ষণ করবে।

বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং এ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইস্পাতের চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশের জোগান দেয়া হয় জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প থেকে। এই ব্যবসার আকার প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।

তবে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ, দূষণ ও শ্রমিকদের নিরাপত্তার অভাবে বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নেতিবাচক শিরোনাম হওয়ায় আইন করে কড়াকড়ি আরোপের তাগিদ ছিল আগে থেকেই।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এ শিল্পে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের সুরক্ষা, কাজের পরিবেশ, সামুদ্রিক পরিবেশ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোকে চিহ্নিত করে শিল্প মন্ত্রণালয় আইনের এই খসড়া মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করে। এর আগে শিপ ব্রেকিংয়ের বিষয়টি নৌ পরিবহন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় দেখলেও এখন সমন্বিত ব্যবস্থাপনার জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

এ আইনের আওতায় বিভিন্ন শাস্তির বিধান তুলে ধরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ডের অনুমতি ছাড়া জাহাজ আমদানি করলে বা ভাঙলে ১০ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। সেইসঙ্গে এক বছরের কারাদ- বা উভয়দ-ের বিধান রাখা হয়েছে।

পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য জাহাজ আমদানিতে মিথ্যা তথ্য দিলে ৫ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা জরিমানা, বা ছয় মাসের কারাদ-, অথবা উভয় দ- হতে পারে।

আর বোর্ডের অনুমতি ছাড়া ইয়ার্ড নির্মাণ করলে ১০ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা জরিমানা, বা এক বছরের কারাদ- অথবা উভয়দ-ের বিধান রাখা হয়েছে।

এছাড়া বোর্ডের কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের সময় কেউ যদি ‘যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া’ সহযোগিতা না করে, সেক্ষেত্রে ৫ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা ছয় মাসের কারাদ- অথবা উভয় দ- হতে পারে বলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান।

হাই কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০১১ সালে বর্তমান ‘শিপ ব্রেকিং এ্যান্ড রিসাইক্লিং রুলস’ জারি করা হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার মনে করছে যে, এটার আইনী কাঠামো আরও শক্তিশালী করা দরকার। এর ব্যাখ্যায় মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা বলেন, বাংলাদেশের ইস্পাত কারখানাগুলোর কাঁচামালের বড় একটি অংশ এই জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প থেকেই আসে। আগে বলা হত শিপ ব্রেকিং। কিন্তু এখন বলা হয় শিপ রিসাইক্লিং। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।

২০১১ মাসের মার্চে সরকার জাহাজ নির্মাণ, জাহাজ ভাঙ্গা ও জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণকে শিল্প ঘোষণা করে। প্রস্তাবিত আইনে সাতটি অধ্যায় ও ২৯টি ধারা রয়েছে। এর আওতায় ‘জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ জোন’ হবে। সেখানেই ইয়ার্ড করতে হবে।

পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন আইন ॥ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন আইন-২০১৫ এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। সোমবার মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে এই অনুমোদন দেয়া হয়। এর আগে, গত ২ মার্চ মন্ত্রিসভা আইনের খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছিল।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভুইঞা বলেন, ভেটিং সাপেক্ষে আইনটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। এর আগে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এ আইনটি ১৯৩৪ সালের। ১৯৮৬ সালে আইনটি সংশোধন করা হয়। বর্তমানে আইনটি সংশোধনে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এটি বাংলায় করে কিছু সংশোধন এনে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হয়।

পেট্রোলিয়াম আমদানি মজুদ ও পরিবহনে বিধিমালা অনুযায়ী রেগুলেট করা হবে। উৎপাদন, শোধন ও রিসাইক্লিং করতে হবে বিধিমালা অনরে। আর সতর্কবাণী বাধ্যতামূলক থাকবে। এছাড়া বিধিমালা লঙ্ঘন করলে দ-ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

বর্তমান আইনে বাড়িয়ে করা হয়েছে ছয় মাস জেল বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দ-। দুর্ঘটনা সম্পর্কে অবহিত না করার ক্ষেত্রে এ অপরাধ বিবেচিত হবে। পঅপরাধ করলে এক বছর জেল বা ২০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দ- হবে বলে জানান তিনি।

এছাড়া গত ২৫ জুন কাঠমা-ুতে অনুষ্ঠিত নেপালের পুনর্বাসন ও উন্নয়নের জন্য আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অর্থমন্ত্রীর অংশগ্রহণ, গত ২৫ থেকে ২৯ মে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত ইউএন এসকাপের ৭১তম বার্ষিক অধিবেশনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণ, গত ৩১ মে থেকে ১৩ জুন সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত ১০৪তম আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ এবং গত ১৮ থেকে ২০ জুন অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত সাসটেনেবল এনার্জি ফর ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্ট শীর্ষক ফোর্থ ভিয়েনা এনার্জি ফোরামে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণসহ সাতটি বিষয় আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।