২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জামায়াতের দখলে যাচ্ছে খেলাফত আন্দোলন ও কামরাঙ্গীরচর মাদ্রাসা

  • হাফেজ্জী হুজুরের পরিবারের বিরোধ কাজে লাগাচ্ছে দলটি

বিভাষ বাড়ৈ ॥ জামায়াতের দখলে চলে যাচ্ছে মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও ঐতিহ্যবাহী কামরাঙ্গীরচর মাদ্রাসা। হাফেজ্জী হুজুরের মাদ্রাসা নামে পরিচিত এ প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের দখলে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাফেজ্জী হুজুর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনেও ভাঙ্গন ধরানোয় তৎপর জামায়াত। জামায়াত ও মওদুদীবাদের এক সময়ের প্রবল বিরোধিতাকারী খেলাফত আন্দোলনে সঙ্কট তৈরি করে মাদ্রাসার দখল নিতে জামায়াত পুুঁজি করেছে হাফেজ্জী হুজুরের পরিবারের সদস্যদের বিরোধকে। আর্থিক সুবিধা দিয়ে ইতোমধ্যেই পরিবারের একটি পক্ষকে দলে ভিড়িয়ে নিয়েছে স্বাধীনতা বিরোধী চক্রটি। দল ভেঙ্গে মাদ্রাসা দখলের নীলনকশা বাস্তবায়নের ঘটনা নিয়ে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে কওমী মাদ্রাসাসহ পুরো ইসলামী দলগুলোর মাঝে। সংঘর্ষের আশঙ্কায় পুলিশ মহাপরিদর্শকের সহায়তা চেয়েছেন জামায়াতী তৎপরতায় উদ্বিগ্ন আলেমরা। পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক অভিহিত করে হাফেজ্জী হুজুরের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সঙ্গে তার অনুসারী বিভিন্ন দলের নেতৃবৃন্দ ঘটনার জন্য সরাসরি জামায়াতকে দায়ী করেছেন। তারা বলেছেন, একটি চক্র তৈরি করা হয়েছে যাদের টার্গেট হচ্ছে জামায়াতের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে স্বাধীনতা বিরোধীদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা। জামায়াতের দখলে যাচ্ছে হাফেজ্জী হুজুরের দল ও মাদ্রাসা এমন অভিযোগ এনে তারা বলেছেন, জামায়াতের গ্রাস করার নেপথ্যে মদদ রয়েছে দলটিরই স্বঘোষিত মহাসচিব জাফরুল্লাহ খানের। সংগঠনের মতো হাফিজ্জী হুজুরের প্রতিষ্ঠিত জামিয়া নূরিয়া কামরাঙ্গীরচর মাদ্রাসাকেও সুকৌশলে জামায়াতের হাতে তুলে দিচ্ছে জামায়াতের এজেন্ট জাফরুল্লাহ খান। মাদ্রাসার দীর্ঘদিনের প্রিন্সিপাল ও দলের সাবেক আমির মাওলানা আহমাদুল্লাহ আশরাফের অসুস্থতাকে তাকে পুঁজি করে চলছে দখলী তৎপরতা। নিজেদের লোকদের দিয়ে খেলাফতের কমিটি করা হচ্ছে অবৈধভাবে। ঐতিহ্যবাহী এ মাদ্রাসায় সরেজমিন অনুসন্ধান ও হাফেজ্জী হুজুরের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জামায়াতের তৎপরতার তথ্যই পাওয়া গেছে। জানা গেছে, ২০১৪ সালে ২৯ নবেম্বর কেন্দ্রীয় কাউন্সিলকে ঘিরে শুরু হওয়া বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনকে ভাঙ্গার জামায়াতী তৎপরতা এখনও চলছে। কামরাঙ্গীরচরে এক গ্রুপের বৈঠক হলে আরেক গ্রুপের বৈঠক চলে লালবাগ কিল্লার মোড়ে দলের কার্যালয়ে। এক পক্ষ জামায়াতের প্রভাব রুদ্ধ করতে চায়, অন্য গ্রুপ চায় জামায়াতের দেয়া আর্থিক সুবিধার ভিত্তিতে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে। তৎপরতায় যুক্ত হয়ে পড়েছেন হাফেজ্জী হুজুরের ছেলে সাবেক আমির আহমদ উল্লাহ আশরাফ, ছোট ছেলে আতাউল্লাহ আমির এবং আহমদ উল্লাহর দুই স্ত্রীর তিন সন্তান। দীর্ঘদিন ধরে হাফেজ্জী হুজুরের নাতিদের পারিবারিক দ্বন্দ¦কে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনে ভাঙ্গনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। যদিও এর আগে হাফেজ্জী হুজুর জীবিত থাকতেই ছেলে আহমদ উল্লাহ আশরাফ ও জামাতা প্রয়াত মুফতি ফজলুল হক আমিনীর পারিবারিক দ্বন্দে দলটি ভাঙ্গে। বর্তমানে খেলাফত আন্দোলনের শীর্ষ কয়েকজন নেতার সঙ্গে জামায়াতের সখ্যতার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভাঙ্গন ও বিরোধ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর ১৯৮১ সালে খেলাফত আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন। একই সঙ্গে কামরাঙ্গীরচরে প্রতিষ্ঠা করেন জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া (মাদরাসা-ই-নূরিয়া) মাদ্রাসা। হাফেজ্জী হুজুরের মৃত্যুর পর দলের নেতৃত্ব ও কামরাঙ্গীর চরের মাদ্রাসা পরিচালনা নিয়ে দ্বন্দে¦ জড়ান তার দুই ছেলে আহমদ উল্লাহ আশরাফ, হামিদুল্লাহ এবং মেয়ের জামাতা ফজলুল হক আমিনী।

একপর্যায়ে দলের আমিরে শরিয়ত এবং মাদ্রাসার দায়িত্ব নেন আহমদ উল্লাহ আশরাফ। যিনি বর্তমানে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় শয্যাশায়ী। এখন মাদ্রাসা পরিচালনা নিয়ে বিরোধ রয়েছে আহমদুল্লাহ আশরাফের নয় ছেলের মধ্য।

পরিবারের এ বিরোধ আর আহমদ উল্লাহ আশরাফের অসুস্থতাকেই কাজে লাগাচ্ছে জামায়াতীরা। বলা হয়ে থাকে, কওমী আলেমদের মধ্যে মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুরই জামায়াতের মওদুদীবাদের বিরোধিতাক করেছেন সবচেয়ে বেশি। তার কাছে নানাভাবে ভিড়তে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় জামায়াত। হাফেজ্জী হুজুরের ছোট ছেলে মাওলানা আতাউল্লাহ বলছিলেন, যুদ্ধাপরাধের দায়ে দ-প্রাপ্ত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ‘ইসলামী’ অনুষ্ঠানের দাওয়াত দিতে একবার আব্বা হুজুরের কাছে আসেন। সাঈদী আব্বাকে বলেন, এটা জামায়াতের অনুষ্ঠান নয়, ইসলামী অনুষ্ঠান। আব্বা হুজুর তাকে জামায়াত ত্যাগ করে তারপর দাওয়াত দিতে আসতে বলেন। জামায়াতের প্রতি তার এই বিরূপ মনোভাব দূর করতে চেষ্টা করা হয় নানাভাবে। কিন্তু জামায়াত কোন চেষ্টাতেই সফল হয়নি। জানা গেছে, জামায়াতের দায়িত্বশীল সদস্য থাকাকালে খেলাফত আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন অধ্যাপক আখতার ফারুক। মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকার দায়ে অভিযুক্ত এই লেখক পরবর্তীতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমিরের দায়িত্ব পালন করেছেন। আখতার ফারুকের হাত ধরেই খেলাফত আন্দোলনে আসেন বর্তমান মহাসচিব মাওলানা জাফরুল্লাহ খান। যিনি জামায়াতের আশির্বাদপুষ্ট হওয়ায় হেফাজতেরও শীর্ষ নেতার কাতারে চলে আসতে পেরেছেন। বাংলাদেশ মসজিদ মিশনের সেক্রেটারি জামায়াত নেতা মাওলানা ড. খলিলুর রহমান মাদানী, অধ্যক্ষ যাইনুল আবেদীনের কাছ থেকে নিয়মিত উৎকোচ নেয়ার অভিযোগ রয়েছে জাফরুল্লাহ খান এবং আজিমপুর ফয়জুল উলুম মাদ্রাসার মুহাদ্দিস মাওলানা মহিউদ্দীন রাব্বানীর বিরুদ্ধে। এইসব তথ্যের উপর জোর দিয়ে ‘জামায়াত মাদ্রাসায় চক্রান্ত করছে’ এমন অভিযোগ করে জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল হাবিবুল্লাহ মিয়াজী পুলিশের মহা পরির্দশক বরাবর চিঠি লিখে সহায়তা চেয়েছেন। এই চিঠিতে অভিযোগ করা হয়েছে, জাফরুল্লাহ খান মাদ্রাসার ছাত্রদের জামায়াতের কর্মসূচীতে নিয়ে যান। এছাড়াও জাফরুল্লাহ খান জামায়াতের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন করতে উসকানি দেন। শাহ আহমদুল্লাহ আশরাফের ছেলে হাবিবুল্লাহ মিয়াজী বলেন, জাফরুল্লাহ খানসহ তার বলয়ের লোকজন দলকে নানাভাবে জামায়াতের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যবহার করে। তাদের কারণে আমার আব্বাও বিভ্রান্তিতে পড়েছেন বহুবার। জাফল্লল্লাহ খানের কারণেই আমাদের ভাইদের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। দলের গঠনতন্ত্রে কোন হরতাল নেই। অথচ জাফরুল্লাহ খান সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ পরিষদের ব্যানারে হরতাল দেন। দলের গত কাউন্সিলে নিজের লোকজন এনে হইহুল্লোড় করে নিজে মহাসচিব হয়েছেন হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন হাফেজ্জী হুজুরের এ নাতি। হাফেজ্জী হুজুরের অনুসারী বিভিন্ন দলের নেতৃবৃন্দ এক যুক্ত বিবৃতিতেও একই অভিযোগ করেছেন। তারা বলেছেন, খেলাফত আন্দোলন নিয়ে চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র চলছে দীর্ঘ দুই যুগ পূর্ব থেকে। এই গভীর চক্রান্তের নেতৃত্বে দিয়ে আসছেন জামায়াতে ইসলামী এককালিন ছাত্রসংগঠন ছাত্র সংঘ থেকে আসা খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব জাফর উল্লাহ খান। খেলাফত আন্দোলনে তিনি অনুপ্রবেশ করেছেন জামায়াতের রোকন ও দৈনিক সংগ্রামের সাবেক সম্পাদক আখতার ফারুকের মাধ্যমে।

নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, এই জাফরুল্লাহ খানের নাম হচ্ছে আহম্মদ আল। ছাত্র সংঘের কর্মী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে রাজাকার বাহিনীতে কাজ করেছেন। জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে জাফরুল্লাহ খানের ঘনিষ্ঠতা ভাবিয়ে তুলেছে হাফেজ্জী হুজুরের অনুসারীদের। বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন বাংলাদেশ কওমী মুভমেন্ট সভাপতি মুফতি ইমাম উদ্দিন রহমানী, হাফেজ্জী হুজুর ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শেখ বোরহান উদ্দিন নদভী, বাংলাদেশ ফতোয়া বোর্ডের মহাসচিব মুফতি আব্দুল্লাহ কাশেমী, জামিয়া রহমানীয়ার সিনিয়র মুহাদ্দেস মাওলানা আব্দুল হাই ইসলামাবাদী, হাক্কানি পীর মাশায়েখ ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক শায়েখ আব্দুল কুদ্দুস আজমী, মওদুদী ফেৎনা নির্মূল কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ইফতেখার মাহমুদ, ফেৎনা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মুফতি মাসুমবিল্লাহ, সিরাতুল মুসতাকিম মিশনের সভাপতি মাওলানা জাহিরুল ইসলাম (মোস্তাকিম হুজুর), ঢাকায় প্রাক্তন হাটহাজারী মাদ্রাসা ছাত্র পরিষদের আহ্বায়ক আব্দুল মুনঈম, ইত্তেফাকুল উলামার চেয়ারম্যান শাইখুল হাদিস আল্লামা আব্দুল আজিজ প্রমুখ।