২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শিল্পকলায় শিল্পী লিটন ভূঁইয়ার তৃতীয় একক প্রদর্শনী রং তুলির আঁচড়ে ‘বিজয় কেতন

সাজু আহমেদ ॥ চারপাশে ঘটে যাওয়া দৈনন্দিন ঘটনায় আমাদের চিন্তা ও মননে ছাপ ফেলা উপলব্ধিগুলো শিল্প সৃষ্টির মাধ্যমে নান্দনিকতার রূপ দেন শিল্পী। এই উপলব্ধিগুলো বোধের জায়গাকে শাণিত করে সচেতন একজন শিল্পীকে প্রতিনিয়ত শিল্প সৃষ্টির জন্য তাড়িত করে। ফলে সেই তাড়নায় শিল্পীদের মধ্যে কেউ সৃষ্টি করেন সাহিত্য, কবিতা, গান, নাচ, কেউবা ছবি আঁকেন। তবে চিন্তাশীল বা বোধসম্পন্ন হলেই যে সবাই শিল্প সৃষ্টির ক্ষেত্রে সফল হন বা শিল্পের নান্দনিকতা ছুঁয়ে যায় ভোক্তা দর্শকদের, এমনটিও ঠিক নয়। শিল্প সৃষ্টির ক্ষেত্রে কেউ কেউ সফল হন। শিল্প সৃষ্টির ক্ষেত্রে সফল এমন একজন বোধসম্পন্ন নন্দনতাত্বিক শিল্পী লিটন ভূঁইয়া। সামাজিক নৈতিক দায়বদ্ধতায় তাড়িত এই শিল্পী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি সমকালীন পারিবারিক এবং রাষ্ট্রিক নৈতিক বোধগুলো তাকে ছবি আঁকার দায়িত্ববোধের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। তবে সেখানে দাঁড়িয়ে সমকালীন প্রেক্ষাপটে তিনি কেবল নিজের জন্য আঁকতে পারেন না। তাঁর রূপ ও রঙের ভাষায় রং তুলির আঁচরে তিনি মানুষের কথা মানুষেরই মাঝে ছড়িয়ে দিতে চান। কারণ বিশ্ব সৃষ্টিকর্তার অন্যতম সৃষ্টি মানুষের চেয়ে শিল্পকর্ম তৈরির আর কোন বড় এবং উৎকৃষ্ট উপাদান থাকতে পারে না। এই বোধের ফলে চিত্রকলা শাস্ত্রের ইজম তাঁর ভাবনার বিষয় হয় না। তিনি কেবল তাঁর ভাষায় কথা বলতে চান। সবাই যেন তাঁর ভাষা বুঝতে পারেন। সেজন্য তার শিল্পের উপজীব মানুষ। তিনি মনে করেন তিক্ত তিষ্ট এই যান্ত্রিক এবং তথাকথিত আধুনিক সময়ে মানুষ যখন নৈতিক অনুভূতিহীন, চারপাশ ধোঁয়ায় গন্ধময়, মতানৈক্যের কোলাহলে যখন মানুষের কান্না চাপা পড়ে যায় মানুষেরই তৈরি অবিবেচক কর্মকা-ে, তখন আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার গৌরব গাথা আরেকবার স্মরণ করিয়ে দেয়া একজন সচেতন শিল্পীর কর্তব্য। অন্তত চিত্রশিল্পী লিটন ভূঁইয়া তাই মনে করেন। তাই তো তিনি তাঁর চেতনার মানসপটে ধারণ করা শৈল্পিক নৈসর্গ তিনি আঁকেন বাস্তবতার ক্যানভাসে, রং তুলির আঁচরে। বিশেষ করে ঐক্যবদ্ধ মানুষের শক্তি, স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধে বাঙালীর জীবন দানের কথা, পাশাপাশি রীরাঙ্গনা মায়েদের আত্মত্যাগের ইতিহাস ও তাঁদের প্রতি বাঙালী সমাজের পশ্চাদপদ দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিজয়ের গান এ সবই তাঁর সমকালীন ছবিতে মূর্ত হয়ে ওঠে। এছাড়া স্বাধীনতার সংগ্রামে জাতি হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা, কোথায় কোথায় ত্রুটি ছিল, আজ সেগুলোকে মনে করে আত্ম-উপলব্ধির মধ্য দিয়ে ঐক্যবদ্ধ শক্তিশালী বাঙালী জাতি হয়ে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। তবেই আমাদের সঠিক বিজয় রচিত হবে। চিত্রকলায় সেই সরল আহ্বানটাই জানাতে চেয়েছেন শিল্পী লিটন ভূঁইয়া। তবে তিনি মনে করেন তাঁর আঁকা অসংখ্য কাজের মধ্যে প্রদর্শনীর জন্য বাছাইকৃত ছবিগুলো কোন সঠিক ক্রমানুসার তৈরি করা যাবে না। সেটা তাঁর লক্ষ্যও ছিল না। ১৯৭৮ সালে এইচএসসি পাসের পর চট্টগ্রাম আর্ট কলেজ থেকে ৫ বছরের ব্যাচেলর ডিগ্রী সম্পন্ন করা লিটন ভূঁইয়া ফ্রিল্যাঞ্চার চিত্রশিল্পী হিসেবে ছবি এঁকে চলেছেন। পাশাপাশি উপন্যাস, গল্প ও নাটক রচনা এবং চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট লিখে থাকেন তিনি। এ পর্যন্ত তিনি অসংখ্য ছবি এঁকেছেন। সেসব ছবির মধ্যে সাম্প্রতিককালের আঁকা কিছু ছবি নিয়ে একক প্রদর্শনী হতে যাচ্ছে। এটিই তাঁর তৃতীয় একক প্রদর্শনী। এর আগে তিনি ঢাকা চট্টগ্রামে দুটি একক এবং অসংখ্য যৌথ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন। তাঁর আঁকা ছবিগুলোতে মুগ্ধ হয়েছেন দর্শক। এসব আয়োজনে চিত্রবোদ্ধাদেরও আকুণ্ঠ প্রশংসা পেয়েছেন তিনি।

চিত্রশিল্পী লিটন ভূঁইয়া জানিয়েছেন আগামী ৩০ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত চার দিনব্যপাী বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালার তৃতীয় তলায় শুরু হচ্ছে ‘ব্যানার অব ভিক্টরি বা বিজয় কেতন’ শীর্ষক তৃতীয় একক চিত্রপ্রর্দশনী। প্রদর্শনীতে শিল্পীর বড় ক্যানভাসের মোট ৪০টি ছবি স্থান পাচ্ছে। আগামী বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টায় প্রদর্শনীর উদ্বোধন করবেন শিল্পী হাসেম খান। এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক নাট্যজন লিয়াকত আলী। প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা এবং শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রদর্শনী সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। প্রদর্শনী চলবে ২ আগস্ট পর্যন্ত। এবারের প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া নিজের চিত্রকলার বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে শিল্পী লিটন ভূঁইয়া জনকণ্ঠকে বলেন, আমার সাম্প্রতিক সময়ের আঁকা ছবিগুলো এবারের প্রদর্শনীতে এনেছি। চারদিকে অস্থিরতা আর বিশ্বাসহীনতা। এমনি সময়ে এই ছবিগুলোর মাধ্যমে মনে করিয়ে দিতে চাই আমাদের সোনালি অতীত। সেটা অনেক রক্তঝরা সময়ের কাল হলেও তখন এদেশের মানুষ একটি লক্ষ্যে এক হয়েছিল। মানুষের সংগ্রাম, পুঞ্জিভূত শক্তি আর শক্তির আন্দোলিত গতি জীবনের মুক্তির হাতিয়ার হয়েছিল। ফলে ১৯৭১ এ সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে। সেই যুদ্ধে আছে অনেক আত্মত্যাগের ইতিহাস আর সব শেষে বিজয়ের জয়গান। এখানে আমার উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার ‘চলুন আবার এক হই সবাই’। এখন সবাই এক হওয়া খুব জরুরী অনুভব করছি। সেটাই আমার ছবিগুলোর আহ্বান।