২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আমরা কোথায় যাচ্ছি

  • মাহবুব রেজা

মাঝে মাঝে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। তখন নিজের ওপর নিজেরই মেজাজ খিচাং হয়ে যায়। খিচাং মানে খিচড়ে যায়। এ সময় কিছুই ভাল লাগে না। মনে হয় সবকিছুতে কেউ বুঝি অতিরিক্ত লবণ মিশিয়ে দিয়েছে। সবকিছুই তেতো লাগে। বিশ্বাস ঠেকে।

আজও তাই হয়েছে আকাশের। মেজাজটা একদম তিরিক্ষি হয়ে আছে। গতকাল টিভি চ্যানেলে সংবাদটা দেখে শিউরে উঠেছে সে। সামান্য মোবাইল চুরির অপবাদ দিয়ে একটা তেরো-চৌদ্দ বছরের ছেলেকে বাঁশের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে কয়েকজন পাষ- বেধড়ক পিটিয়ে হত্যা করেছে। পৈশাচিকভাবে পেটানোর এ দৃশ্য পশুরা আবার মোবাইলে ধারণও করেছে। তা-ও কী না আবার প্রকাশ্য দিবালোকে! উৎসাহী মানুষজনের সামনে একটা ছেলেকে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করার বিষয়টিকে কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। রাতে যখন টেলিভিশনের স্ক্রিনে শিশু পেটানোর এ দৃশ্যটা আকাশ দেখল তখন ওর মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করতে থাকল। পুরোটা দৃশ্য সে দেখতেও পারেনি। আরও পরিষ্কার করে বললে বলতে হয় পুরো দৃশ্য দেখার মতো মন-মানসিকতা ওর মধ্যে ছিল না। থাকবে কেমন করে? মেজাজ খারাপ করে সে টিভিটা অফ করে দেয়।

প্রকাশ্যে একটা বাচ্চা ছেলেকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে কয়েক তরুণ বেদমসে পেটাচ্ছেÑ পিটিয়েই তারা ক্ষান্ত হয়নি। সেই পেটানোর দৃশ্য আবার তারা মহাউৎসাহে মোবাইলে ধারণ করছে। মানুষের এই মানসিক অধ:পতন কোথায় গিয়ে ঠেকেছে।

পেটানোর সময় ছেলেটার অসহায় কাকুতি-মিনতি তরুণদের মধ্যে কোন সমবেদনা কিংবা মানবিকতা তৈরি করতে পারেনি। তারা নির্দয়ভাবে ছেলেটাকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। মেরে ফেলার পর তারা শিশু রাজনের লাশকে গুম করে ফেলতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা রাজনকে গুম করতে পারেনি। মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে না পারলেও গুমের হাত থেকে রাজন সত্যি সত্যি বেঁচে গিয়েছিল।

গুম থেকে বেঁচে যাওয়া রাজন দেশের মানুষের মধ্যে এক তীব্র প্রতিবাদ আর ক্ষোভের দাবানল ছড়িয়ে দিতে পেরেছিল। ছেলে-বুড়ো সব বয়সী মানুষ এই হত্যার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছে। মানব বন্ধন করেছে। সমাবেশ করেছে। গ্রেফতার করা হয়েছে রাজন হত্যাকারীদের।

গত কয়েকদিন ধরে আকাশ নিজের ওপর ক্ষেপে আছে। ভীষণ রকমের ক্ষেপে আছে। কোনকিছুতেই তার মন বসছে না। ভার্সিটির ক্লাসে বসে বসে রোবটের মতো স্যারের লেকচার শুনতেও ভাল লাগে না। স্যাররা ক্লাসে ঢুকে নামতা পড়ানোর মতো করে মুখস্থ জ্ঞান উগড়ে দিয়ে চলে যান। সেসব উগড়ে দেয়া জ্ঞানগর্ভ বিষয় ছাত্ররা বুঝল কী বুঝল না তা নিয়ে তাদের কোন বিকার নেই। তারা ক্লাস প্রতি টাকা পান। লেকচার দিলেই টাকা।

আজও আকাশ ক্লাসে বসে গুরুগম্ভীর বিষয়ের ওপর আলোচনা শুনছিল। আকাশের পাশে বসে আছে রাসেল। রাসেল পড়াশোনায় বেশ সিরিয়াস। স্যারের লেকচার শুনতে শুনতে রাসেল আকাশকে বলল, কী রে তোকে কয়েকদিন ধরে একটু অমনোযোগী দেখছি। ঘটনা কী?

রাসেলের কথায় আকাশ কী বলবে!

আকাশ কী বলবে কয়েকদিন ধরে ওর মন খুব খারাপ। রাজনের জন্য আরও অনেকের মতো ওর ভেতরটাও পুড়ে যাচ্ছে।

আমি মনোযোগী হলে তোদের লাভ কী?

পড়াশোনার ব্যাপারে মনোযোগী না হলে তো তোরই ক্ষতি।

কেমন ক্ষতি?

কেমন ক্ষতি সেটা তোকে আমি কী বোঝাবো!

রাসেলের চোখে মুখে ঘোর লাগা বিস্ময়। আকাশের মুখে আজ একটু অন্য ধরনের কথা শুনে সে অপ্রস্তুত। আচ্ছা, কী হয়েছে আকাশের?

ক্লাস শেষ হলো। স্যার চলে গেলেন। করিডর দিয়ে হেঁটে নিচে নামার সময় রাসেল আর তুলি সিঁড়ির কাছে এসে আকাশকে বলল, স্যার আপনি কী নিয়ে অমন চিন্তিত।

আকাশ ওদের কথার কোন জবাব দিল না। দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছে। রাসেল আর তুলি আকাশের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এর মধ্যে আরও বেশ কয়েকজন ওদের সঙ্গে যোগ দিল। ওরা বলিউডের সাম্প্রতিক খোশ গল্পে মেতে উঠল। সালমান খানের নতুন ছবি বজরঙ্গি ভাইজান মুক্তি পাচ্ছে। সেলফিতে ঢাকার কোন নায়িকা তার গরম মশলা মার্কা ছবি আফলোড করেছে।

আকাশ বাইরে এসে দেখল গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। বৃষ্টির মধ্যে সে বাস স্ট্যান্ডে এসে দাঁড়াল। সে এখন শুক্রাবাদ থেকে যাবে প্রেসক্লাব। রাজনের জন্য মানব বন্ধনের আয়োজন করা হয়েছে। গতকাল বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে শাহবাগের বিক্ষোভ মিছিলেও আকাশ ওর দু’বন্ধুকে নিয়ে গিয়েছে। আজও সে প্রেসক্লাব যাচ্ছে। যদিও গুরুত্বপূর্ণ একটা ক্লাস তার নষ্ট হবে। রাজনের জন্য এরকম একটা না, এক হাজার গুরুগম্ভীর ক্লাস সে নষ্ট করতে নির্দ্বিধায় রাজি আছে।

গাবতলী-সদরঘাটের একটা বাস এসে দাঁড়াতেই আকাশ লাফ দিয়ে উঠে পড়ল তাতে। বাসের ভেতর বেশ ভিড়। মানুষের কলরবে বাসের ভেতরটা গম গম করছে।

বাসটা বৃষ্টির মধ্যে ছুটে চলেছে। বাইরে বৃষ্টির তোড় বেড়ে যাচ্ছে। বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে। চারদিক ঝাপসা হয়ে উঠছে। আর সেই ঝাপসার ভেতর আকাশের চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠছে একটা শিশুর মুখ।

athairidha15@yahoo.com