১৩ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইলিশ শিকারে মৃত্যুর ঝুঁকি

  • সমুদ্রের সঙ্গে লড়াই, জলদস্যুদের উৎপাত আর দাদনের পীড়ন

নিজস্ব সংবাদদাতা, বরগুনা, ২৭ জুলাই ॥ সমুদ্রের সঙ্গে লড়াই, আরেকদিকে জলদস্যুর উৎপাত। তার ওপর রয়েছে দাদনের নিপীড়ন। অন্যদিকে প্রতিনিয়ত দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতিতে জর্জরিত উপকূলের জেলে পরিবারগুলোর ঋণের বোঝা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বরগুনা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, ভোলা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় জেলেদের জীবিকা চলে বঙ্গোপসাগরে ইলিশ শিকার করে। উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা এসব জেলের দুর্দশার শেষ নেই।

জেলেরা জানিয়েছেন, কিছু বুঝে ওঠার আগেই সাগরে বোটের পাশে (জেলে ট্রলার) জলদস্যুদের বোট লাগিয়ে অস্ত্র আউড়া-ধাউড়া (এলোপাতাড়ি) কেনু মারা শুরু করে। টাকার জন্য জিম্মি করে মাঝিকে ধরে নিয়ে যায় দস্যুরা। আবার কোন কোন সময় মাঝির সঙ্গে যুবক বয়সী থাকলে তাদেরও নিয়ে যায়। প্রতিবাদ তো দূরের কথা, বাঁচার চেষ্টা করলে মেরে নদীতে ফেলে দিয়ে যায় তারা। বাবা ছিলেন মাঝি, ছেলে হয়েছেন জেলে। ২৫ বছর ধরে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরছেন আল আমিন। দস্যুদের পিটুনি তার গা সয়ে গেছে। আতঙ্ক রয়েছে জেনেও প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জীবিকার জন্য সাগরে মাছ ধরতে যাচ্ছেন। দস্যুদের উৎপাতের কথা আক্ষেপ করে বলা ছাড়া আর কিছুই করার নেই জেলেদের। এসব গায়ে সয়ে নির্যাতনের কথা বলতে বলতে বিরক্ত হয়ে গেছেন উপকূলের জেলেরা। সবাই শুধু শুনেই যায়, পায় না কোন প্রতিকার। তাই এখন বলতে অনীহা তাদের কষ্টগাথা। গভীর সমুদ্রে যখন দস্যু আক্রমণ হয়, না থাকে কোস্টগার্ড, না থাকে কোন নিরাপত্তা বাহিনী। সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা করা ছাড়া আর কোন পথ থাকে না তাদের।

পাথরঘাটা উপজেলার জেলে নাসির বলেন, জীবনের নিরাপত্তা নেই জেনেও পেটে ভাত দিতে হলে যেতেই হবে গাঙ্গে। সাগরে ডাকাতি করতে এসে জলদস্যুরা ধরে পেটায়, অনেক সময় মেরে ফেলে, তারপরও সাগরে মাছ ধরতে যাই। বাপ জনমে শিখছি মাত্র একটাই কাজ। এ দিয়েই সংসার চালাই। তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরে খাই।

বঙ্গোপসাগরে দস্যুদের অপরহণ ও মুক্তিপণ বাণিজ্যে দিশাহারা হয়ে পড়েছে গোটা উপকূলীয় এলাকার জেলে। ইলিশ মৌসুমে বঙ্গোপসাগরে দস্যুতা চালিয়ে জেলে অপহরণ ও ট্রলার জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করছে বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন দস্যুবাহিনী। আর মুক্তিপণের এসব টাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাগালের মধ্যেই চলছে আদান-প্রদান। কর্তব্যরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার কারণে দস্যুদের মুক্তিপণ বাণিজ্য অনেকটা নীরবে মেনে নিয়েছেন এসব জেলে, ট্রলার মালিক ও মৎস্যজীবী।

জেলা ট্রলার মালিক সমিতি ও জেলে সমিতির হিসাবে গত বছর শতাধিক ট্রলারসহ তিন হাজার জেলে অপহৃত হয়েছেন। শেষ সম্বল ভিটেমাটি বন্ধক রেখে জেলেপ্রতি ৫০-৬০ হাজার থেকে এক লাখ ও ট্রলারপ্রতি তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণের বিনিময়ে দস্যুদের আস্তানা থেকে অপহৃতদের ফিরিয়ে এনেছেন স্বজনরা। এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতার ওপর ভরসা নেই জেলেদের। তাই তো দস্যুদের বেঁধে দেয়া সময়সীমার মধ্যে মুক্তিপণ পরিশোধ করে জেলেদের ফিরিয়ে আনাতেই নিরাপদ বোধ করেন জেলেদের স্বজনরা।

বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি আবদুল খালেক দফাদার বলেন, জেলেদের তো উপায় নেই, খেতে হলে সাগরে যেতে হবে, আর সাগরে গেলে দস্যুর কবলে পড়বেÑ এটা এখন নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছেন উপকূলীয় জেলেরা। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ করেও সরকারের উর্ধতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হননি তারা। পাননি গভীর সমুদ্রে নিরাপত্তার আশ্বাস।

জেলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি নজরুল ইসলাম বলেন, বিরূপ আবহাওয়া, দস্যুদের উৎপাতসহ নানা প্রতিকূলতা সামাল দিয়ে ইলিশ শিকার করতে হয় জেলেদের। প্রতি বছর মৌসুমের শুরুতে জেলেরা ইলিশ শিকারে গেলে দস্যুদের উৎপাত বাড়ে। সাগরে মাছ বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পায় দস্যুদের তা-ব। তবুও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত ভয়কে উপেক্ষা করে সাগরে যান জেলেরা দু’বেলা দু’মুঠো খেয়ে-পরে বাঁচার জন্য।

কোস্টগার্ডের পাথরঘাটা স্টেশন কমান্ডার লে. এফএ রউফ বলেন, জেলেদের নিরাপত্তায় আমরা সব সময় প্রস্তুত রয়েছি। প্রতিনিয়ত আমাদের টহল অব্যাহত আছে এবং গভীর সমুদ্রে নৌবাহিনীর টহল রয়েছে। কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে জেলেদের নিরাপত্তার জন্য নানামুখী কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।