১০ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কথা বলতে বলতে চলে গেলেন ভারতরত্ন এপিজে আবদুল কালাম

বিশেষ প্রতিনিধি॥ কথা বলতে বলতে চলে গেলেন ভারতরতœ এপিজে আবদুল কালাম। সোমবার সন্ধ্যায় হার্ট এ্যাটাকে তার মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। শিলংয়ে একটি অনুষ্ঠানে ভাষণ দেয়ার সময় বুকের বাঁ দিকে ব্যথা অনুভব করেন এপিজে। সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ তাকে নিয়ে যাওয়া হয় শিলংয়ের বেথানি হাসপাতালে। সেখানেই মৃত্যু হয় ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতির। ওই হাসপাতালের চিকিৎসক জন শৈল তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন।

‘ভারতের মিসাইলম্যান’ এপিজে আবদুল কালাম সোমবার শিলংয়ে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের এক অনুষ্ঠানে ভাষণ দেয়ার সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হন। বেথানি হাসপাতালে ভর্তির পর বহু চেষ্টা করেও তাঁকে বাঁচাতে পারেননি ডাক্তাররা। সংবাদ মাধ্যম জানায়, ভারতীয় সেনা ডাক্তার গিয়ে পরীক্ষা করে আবদুল কালামকে মৃত ঘোষণা করেন। সোমবার দুপুরে গুয়াহাটি বিমানবন্দরে পৌঁছার পর সেখান থেকে হেঁটে বিমানবন্দর থেকে বেরোন আবদুল কালাম। ‘বাসযোগ্য পৃথিবী’ বিষয়ে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে শিলংয়ের ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টে গিয়েছিলেন উইংস অব ফায়ারের রচয়িতা এপিজে আবদুল কালাম।

অকৃতদার এই বিজ্ঞানী একাধিকবার বাংলাদেশে এসেছেন। তাঁর মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বলে তাঁর প্রেস সচিব ইহসানুল করীম জানিয়েছেন। এছাড়া রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আবদুল হামিদ, স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন।

বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আবদুল কালামের মৃত্যুতে ভারতে সাত দিনের জাতীয় শোক পালনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। দেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. এপিজে আবদুুল কালামের আকস্মিক মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব এলসি গোয়েল টুইটে বলেছেন, আবদুল কালামের মৃত্যু দেশের কাছে এক বিরাট ক্ষতির শামিল।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এপিজের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের কেন্দ্রীয় পরিবহনমন্ত্রী নীতিন গড়কড়ি, অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। তাঁরা তাঁকে জনগণের রাষ্ট্রপতি আখ্যায়িত করে টুইট বার্তায় বলেছেন, আবদুল কালাম ছিলেন ভারতের পুরো প্রজন্মের প্রেরণা।

এপিজে আবদুল কালাম ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ভারতের ১১তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও পালন করেন। ‘স্মল এম ইজ এ ক্রাইম’কে বরাবরই বিশ্বাস করে এসেছেন এপিজে আবদুল কালাম। বিভিন্ন কেতাবি আলোচনায় সে বিশ্বাসই তুলে ধরতেন বার বার। এই বিশ্বাসই রামেশ্বরমের এক জেলে পরিবারের ছেলেকে তুলে এনেছিল রাইসিনা হিলসে ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে।

১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর তামিলনাড়ুতে জন্ম আবুল পাকির জয়নুল আবেদিন আবদুল কালামের। তাঁর পিতার নাম জয়নুল আবেদিন ও মাতার নাম আসিয়াম্মা। তিনি খুব গরিব পরিবারের সন্তান ছিলেন, খুব অল্প বয়সেই তাঁকে জীবিকার প্রয়োজনে বিভিন্ন পেশায় কাজ করতে হয়েছিল। সংসারে সাহায্য করতে এক সময় কাগজ বিক্রি করেছেন। তবে থামার মানুষ তিনি নন। ১৯৫৪ সালে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক হন। পরে তিনি ‘এ্যারোস্পেস’ নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৬০ সালে ডিআরডিও’র সঙ্গে যুক্ত হন। সেনাবাহিনীর প্রয়োজনমতো ছোট হেলিকপ্টারের নকশা বানাতেন। তবে তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘোরে শীঘ্রই। তাঁকে বদলি করা হয় ইসরোতে। সেখানে ছিলেন প্রবাদপ্রতিম বিজ্ঞানী বিক্রম সারাভাই। কালামকে দেখেই পছন্দ হয়ে যায় তাঁর। ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি এসএলভি-৩ প্রকল্পের ডিরেক্টর করা হয় কালামকে। ১৯৭০ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত কালাম প্রধানত পিএসএলভি এবং এসএলভি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। উভয় প্রকল্পই সাফল্যের মুখ দেখে। কালামকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য বিজ্ঞান উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয় ১৯৯২ সালে। ১৯৯৯ পর্যন্ত তিনি ওই পদে ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ডিআরডিও’র সেক্রেটারির দায়িত্বও সামলেছেন। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৯৮ সালে পোখরানে দ্বিতীয়বারের জন্য পরীক্ষামূলক পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটায় ভারত। কাকপক্ষীর নজর এড়িয়ে এই পরীক্ষার সাফল্য কালামকে বিপুল খ্যাতি এনে দেয়। ২০০২ সালে তিনি ভারতের একাদশ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এরপরও তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বে। তাঁর ৭৯তম জন্মদিনকে বিশ্ব ছাত্র দিবস হিসেবে ঘোষণা করে জাতিসংঘ। ১৯৯৭ সালে তিনি ভারতরতœ পুরস্কারে ভূষিত হন।

চল্লিশ বছর ধরে তিনি ভারতের বিভিন্ন বিজ্ঞান ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে ডিফেন্স রিসার্চ এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ডিআরডিও) এবং ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশনে (আইএসআরও) কর্তব্যরত অবস্থায় তিনি বেসরকারী মহাকাশ গবেষণা ও সামরিক মিসাইল তৈরিতে প্রচুর অবদান রাখেন। ব্যালিস্টিক মিসাইল ও তার উৎক্ষেপণ যান তৈরিতে তাঁর অবদানের জন্য তিনি ‘মিসাইলম্যান’ হিসেবে স্বীকৃতি পান।

একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী এবং ভারতে প্রথম পারমাণবিক বোমা বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণ করে তিনি দেশটিকে বিজ্ঞান চর্চায় অসামান্য অবদান রাখেন। তিনি শুধু ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে সফল ছিলেন না, ভারতের চন্দ্রযান অভিযানেও উপদেশ দেন। এসব সাফল্যের জন্য তিনি পান ভারতের সর্বোচ্চ সম্মানসূচক খেতাব ভারতরত্ন।