২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিকল্পধারা কি বিএনপিতে বিলুপ্ত হবে!

  • শাহীন রেজা নূর

পত্রিকান্তরের খবরে প্রকাশ, ডাঃ বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ‘বিকল্পধারা’ নামক সংগঠনটি বিএনপিতে একীভূত হতে চলেছে। অর্থাৎ লজ্জায়-অপমানে-ঘৃণায় একদিন বিএনপি থেকে সরে এসে তিনি যে ‘বিকল্পধারা’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, এবার তার পরিসমাপ্তি ঘটতে চলেছে। অথচ এই মাত্র ক’দিন আগেই তিনি বিএনপি আয়োজিত একাধিক সমাবেশে বিএনপিপ্রধান খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। তিনি খালেদার নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণটি ঠিকই শনাক্ত করে তাকে জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচীতে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। জামায়াতে ইসলামীর সহিংস রাজনীতি এবং বাংলাদেশ-বিরোধী রাজনীতির করাল গ্রাসে পতিত হয়ে বিএনপি আজ সখাত সলিলে নিমজ্জিত বা পতিত, এই সত্যোপলব্ধি শুধু বদরুদ্দোজা চৌধুরীর একার নয়, দলের অপর উর্ধতন নেতা জেনারেল (অব) মাহাবুবুর রহমান, ড. মঈন খান প্রমুখের ক্ষেত্রেও লক্ষণীয়। এরা সকলেই এক বাক্যে বলেছেন যে, জামায়াতের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে বেগম জিয়া বিএনপিতে যে রাজনীতির আমদানি করেছেন, তা দলের জন্য আত্মাহুতির শামিলরূপেই প্রমাণিত। সুতরাং, বিএনপিকে বাঁচতে বা বাঁচাতে হলে জামায়াতের সংশ্রব ত্যাগ এবং দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচীতে ফিরে যেতে হবে। বদরুদ্দোজা চৌধুরীই সম্প্রতি বেগম জিয়াকে দল উদ্ধারকল্পে এই নোসখা বাতলেছেন এবং তিনিও এই লক্ষ্যে স্বীয় ‘বিকল্পধারা’ সংগঠনটিকে বিএনপিতে ফিরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নিচ্ছেন। শোনা যায়, এলডিপি নেতা কর্নেল অলিও সদলবলে বিএনপিতে যোগ দিতে মনস্থির করেছেন। যা হোক, ২০০৪ সালে শহীদ জিয়ার আদর্শের সৈনিকরা তখন রাষ্ট্রপতি পদে আসীন বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে কি জঘন্য উপায়ে হেনস্তা করেছিল, সে কথা এখন আর চৌধুরী সাহেবের মনে নেই। আমরা আমজনতা অবশ্যই মনের আয়নায় চাইলেই এখনও রেললাইনের ওপর দিয়ে তার এবং মেজর (অব) মান্নানের সেই ৪০০ মি. দৌড়ের দৃশ্যটি স্পষ্ট দেখতে পাই। দেখা যাচ্ছে, শহীদ জিয়ার আদর্শের সৈনিকরা ঐ দুই নেতাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার উদ্দেশ্যে এ্যায়সা ধাওয়া করেছে যে, নেতৃদ্বয়ের তখন ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা।’ অতঃপর ক্ষোভে-দুঃখে, লজ্জায়-অভিমানে ডাঃ চৌধুরী বিএনপিকে গুডবাই জানিয়ে নতুন দল বিকল্পধারা গঠন করলেন। জিয়াউর রহমানের আদর্শের সবচেয়ে বিশ্বস্ত অনুচর হিসেবে সংশ্লিষ্ট মহলে ডাক্তার সাহেবের পরিচিতি আছে। যদিও জিয়ার হত্যাকালীন সময়ে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে জেনারেল জিয়ার সবচেয়ে নিকটবর্তী কক্ষে থাকা সত্ত্বেও নিরাপদে বেঁচে যাওয়ায় ঐ হত্যাকা- বিষয়ে বিএনপি মহলেই তাকে ঘিরে নানা সন্দেহ-অবিশ্বাস এবং ক্ষোভও কম ছিল না। সে যাক।

ডাঃ চৌধুরী জিয়ার জীবদ্দশায় অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তার সেবা করেছেন এবং জিয়ার হত্যাকা-ের পরও দলকে শক্তিশালী করে তুলতে সদা তৎপর থেকেছেন। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মিথ্যা, কুৎসা ও প্রতারণামূলক অপপ্রচার চালাতেও তিনি সকলকে টেক্কা দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগকে ইসলামবিরোধী একটি সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে জনমনকে বিভ্রান্ত করার যে অপকৌশল সেদিন তিনি প্রদর্শন করেছিলেন তা আর কিছুই নয়, বিএনপি রাজনীতির মৌলচরিত্র ছাড়া। অর্থাৎ আওয়ামী লীগকে সেই পাকিস্তান আমলে যেভাবে ইসলামবিরোধী ও ভারতপন্থী দল হিসেবে চিহ্নিত করা হতো এবং তাদের তল্পিবাহকবিরোধী সংগঠনগুলোর ঠিক ঐ একই ধারা অনুসরণ করাই হচ্ছে বিএনপি রাজনীতির চালিকাশক্তি। কেননা, দলটি প্রতিষ্ঠিতই হয়েছিল আওয়ামী লীগের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরোধিতা করার জন্য। সর্বোপরি এই অসাম্প্রদায়িক চেতনার রাজনীতি প্রতিষ্ঠায় যে সফল মুক্তিযুদ্ধটি এদেশের মানুষ একাত্তরে করেছিল, তার সেই অর্জনকে নানা মিথ্যা ছলচাতুরী দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করে সাধারণ শান্তিকামী ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা এর উদ্দেশ্য। আর সেইসঙ্গে পাকিস্তানী আমলের সেই বস্তাপচা তথাকথিত ইসলামী ভাবধারা ফিরিয়ে এনে এদেশের গণমানুষের ওপর শোষণ-বঞ্চনা বজায় রাখা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী ধর্মব্যবসায়ী, অসৎ অসাধু আমলা-ফড়িয়া, সেনা কর্মকর্তা ও বিভিন্ন পেশার ঐ জাতীয় মানুষজনকে বিএনপির ছাতার নিচে সমবেত করে অর্থে-বিত্তে বলীয়ান করে তোলা। একইসঙ্গে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কব্জা করে নিজেদের কায়েমি স্বার্থের ভিত শক্তিশালী করা। সোজা কথায়, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনগোষ্ঠীকে বিভ্রান্ত করে পাকিস্তানী তথাকথিত ইসলামী শাসনধারা ফিরিয়ে আনতে পারলেই তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণ হয়। এক্ষেত্রে পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই আর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের অনেক দেশ তাদের স্ব স্ব বাণিজ্যিক ও আধিপত্যবাদী কর্তৃত্ব বজায় রাখার উদ্দেশ্যে বিএনপিকে সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা দান করে আসছে। গণভিত্তিক ও আদর্শবাদী কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এসব বৈদেশিক শক্তির বন্ধুত্ব হয় না। কেননা, গণতান্ত্রিক ও আদর্শভিত্তিক দলের পক্ষে জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ঐসব দেশের এজেন্ট হিসেবে কাজ করা বা নিজ দেশের জনগণের স্বার্থবিরোধী কোন অবস্থান গ্রহণ করা সম্ভব হয় না বিধায় যুক্তরাষ্ট্র বা ঐ জাতীয় মুরব্বিরা বিএনপির মতো আদর্শহীন ও গণস্বার্থের পরিপন্থী দলকেই সার্বিক সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা করে। এক্ষেত্রে স্মর্তব্য, আফগানিস্তানে তালেবানদের এবং লিবিয়া, ইরাক বা সিরিয়ায় জঙ্গীদের সার্বিক সহায়তা প্রদানের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও অন্য দেশগুলোর নিজেদের রাষ্ট্রিক এবং বাণিজ্যিক স্বার্থটাই ছিল বড়। আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়া, ইরাক কোন দেশেই যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যদের সামরিক অভিযান আর সেসব দেশের সরকারবিরোধী জঙ্গীদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান কোন অবস্থাতেই এসব দেশের জনগণকে সুখে-শান্তিতে রাখার অভিপ্রায়ে করা হয়নি। অথচ, এসব দেশের জনগণের ভালর নামে দেশগুলোকে সম্পূর্ণভাবে আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে সাম্রাজ্যবাদীরা নিছক নিজ নিজ বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনীতির সঙ্কীর্ণ স্বার্র্থে। এ উদ্দেশ্যে দেশে দেশে এনজিওর নামে হাজার হাজার এজেন্টকে পোষে ওরা। বাংলাদেশে আমরা হর-হামেশাই কিছু প্রতিষ্ঠিত এনজিওর রাষ্ট্রীয় বিষয়ে তর্জন-গর্জন লক্ষ্য করি। জনগণকে বুঝতে হবে যে, এসব এনজিও আর কিছুই নয় তাদের বিদেশী প্রভুদের তাঁবেদার ছাড়া! সাম্রাজ্যবাদীরা ইতোপূর্বে কোন একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সেনা অভ্যুত্থানে সহায়তা যুগিয়ে তাদের মনমতো সরকার প্রতিষ্ঠার আয়োজন করত। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। মানুষের চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণাও বদলেছে। আর তাই ওরা এনজিও নামক নতুন নতুন এজেন্ট সৃষ্টি করে। নিজেদের স্বার্থোদ্ধারের সবচেয়ে বিশ্বস্ত অনুচররূপে তাদের প্রশিক্ষণ দেয় এবং এজন্য এজেন্টদের অর্থের যে প্রলোভন দেখানো হয়, তা এড়িয়ে চলার মতো ‘বুদ্ধিজীবী’ আমাদের মতো দেশে ক’জন আছে? ফলে অর্থের কাছে এরা বিবেক-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা সব সহজেই বন্ধক রেখে বিদেশী প্রভুদের স্বার্থোদ্ধারে সর্বপ্রকার সহযোগিতা যোগায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ হচ্ছে এক বিরাট বাস্তবতা। পাঠক, দেশে সরকারের সামান্যতম ভুল-ভ্রান্তি-ত্রুটিকে এই এনজিওগুলো মানবাধিকারের নামে কিভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে এবং মিথ্যার প্রলেপ দিয়ে প্রচার করে তা নিশ্চয়ই আপনাদের চোখ এড়ায়নি। এ জাতীয় দেশী-বিদেশী প্রভুদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে বিএনপির মতো সংগঠনগুলোই সর্বাপেক্ষা উত্তম। তাই বিএনপির মিথ্যাচার, গণবিরোধী ভূমিকা, ধোঁকাবাজি, ভ-ামি, প্রতারণা ইত্যাদি বারবার ধরা পড়ে গেলেও ঐসব দেশের সংশ্লিষ্ট স্বার্থবাজরা বিএনপির অকুণ্ঠ সমর্থন দেয়। ডাঃ বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ এমনই ধারার বহু ডক্টর এবং ডাক্তার (অন্যান্য পেশার লোকও আছে প্রচুর) দেশী-বিদেশী প্রভুদের হয়েই তাদের রাজনীতি পরিচালনা করেন। এসব কথা ডক্টর কামাল হোসেন, ডাক্তার বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ড. দেবপ্রিয়, ডঃ জাফরুল্লাহ, ড. ইফতেখার গংরা বোঝেন না তা নয়; কিন্তু তারা নাছোড়। কেননা, ঐ প্রভুদের মনস্তুষ্টি বিধানের মাধ্যমে দেশে রাষ্ট্রীয় যাবতীয় আরাম-আয়েস, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, সুবিধা ইত্যাদি ভোগ করার অন্য কোন উপায় দেশে অবস্থানকারী সুখের পায়রাদের যে আর নেই।

যাক, ডাঃ বদরুদ্দোজা, ড. মঈন খান, জেনারেল (অব) মাহবুবদের বিএনপি সম্পর্কিত সাম্প্রতিক উপলব্ধি আসলে এক ধরনের নিজ নিজ সঙ্কীর্ণ স্বার্থবোধ থেকে উৎসারিত। এটি কোন সার্বিক জনকল্যাণমুখীনতা থেকে উৎসারিত নয়। যদি তা হতো, তাহলে হয় এতদিন মিথ্যা ও জনগণকে বিভ্রান্তকারী রাজনীতির পরিচর্যা করার দরুন তারা জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে রাজনীতি থেকে নিজ অবসর গ্রহণের কথা ঘোষণা করতেন অথবা খালেদা-তারেকের মিথ্যা-গণবিরোধী রাজনীতির বিপরীতে সত্যিকারের জনমুখী একটি বিএনপি বা নতুন দল গঠনে উদ্যোগী হতেন। কিন্তু যেহেতু বিবেকের অনুশাসন মেনে চলার মতো সৎ সাহসের প্রচ- অভাব এবং নিজেদের দুনিয়াবী বস্তুতান্ত্রিক স্বার্থোদ্ধারের মানসিকতা পরিহার করা এদের কারও পক্ষেই সম্ভব নয়, সেহেতু পরিস্থিতির চাপে এখন দু’একটি কথা তারা বলেছেন বটে, যা কিনা বিএনপির আজকের দুর্যোগে নিজেদের গায়ে কাদা না মাখানোর একধরনের কৌশল বা চেষ্টা ছাড়া কিছু নয়। আমি নিশ্চিত, যে বেগম জিয়ার প্রতি এত উষ্মা প্রদর্শন করেছেন, সেই বেগম জিয়া একটু সোহাগ করে ডাক দিলেই এরা সুরসুর হাজির হবেন খালেদা-তারেকের ছায়ার নিচে।

ডাঃ বদরুদ্দোজা জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচীকেই বিএনপির প্রাণভোমরা বলে মনে করেন। কিন্তু বিএনপি যে উদ্দেশ্যে এবং যেসব পাকিস্তানী ভাবধারায় সম্পূর্ণভাবে নিমজ্জিত ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল, তাতে করে ১৯ দফাই কি আর ১৯০ দফাই কি! এ জাতীয় সকল দফাই যে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় দর্শন বা মূল্যবোধের বিপরীতধর্মী, এতে আর সন্দেহ কী! বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের ইনডেমনিটি, সংবিধানে ‘বিস্মিল্লাহির রাহ্মানির রাহিম’ সন্নিবেশিত করে আমরা মুসলমান এটি প্রমাণের চেষ্টা (বাংলাদেশ প্রধানত মুসলিম অধ্যুষিত দেশ এটি সংবিধানে উল্লেখ থাকা-না থাকার ওপর নির্ভরশীল নয় নিশ্চয়ই)। যাদু মিয়া, শাহ আজিজুর রহমানের মতো মুক্তিযুদ্ধবিরোধী লোকজন ও অন্যান্য চিহ্নিত রাজাকারকে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়দানকারী জিয়া সিনিয়র মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বানিয়ে কি বোঝাতে চেয়েছিলেন? একদিকে সংবিধানে বিসমিল্লাহ সংযোজন এবং অন্যদিকে লাকী খানদের অশ্লীল নৃত্যকে সাংস্কৃতিক মর্যাদা দিয়ে, অস্ত্র ও অর্থের যোগান দিয়ে যুবশক্তির নৈতিক অধঃপতন ঘটিয়ে, রাজনীতিকদের জন্য রাজনীতি ‘ডিফিকাল্ট’ করার প্রত্যয় ঘোষণা করে, ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’ ঘোষণার মাধ্যমে বাঙালী সংস্কৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের যাবতীয় অর্জন ধ্বংসের আয়োজন করে, উন্নতির নামে খাল কাটার মাধ্যমে আইওয়াশ, বাঙালী সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদের স্থানে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ আমদানি এবং তার পরিচর্যার নামে জাতিকে বিভক্ত করে, দালাল আইন বাতিল করে রাজাকার ও একাত্তরের ঘাতকদের রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক এবং সামাজিকভাবে পুনর্বাসিত হওয়ার ব্যবস্থা করে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ জিয়া যেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করেছিলেন, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ অত্যন্ত জরুরী। সর্ববিচারেই তিনি রাজাকার, আলবদরদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সুতরাং এ কারণেই তার ‘মুক্তিযোদ্ধার’ পরিচয় সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে এদেশের ইতিহাসে একজন রাজাকারের পৃষ্ঠপোষক পরিচয়ে আজ রূপান্তরিত ।

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আবহে জন্মগ্রহণ ও বেড়ে ওঠা ডাঃ বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিবেকে উল্লিখিত বিষয়গুলোর সত্যসম্মত ও ইতিহাস-স্বীকৃত ব্যাখা কোন অনুরণন তোলে না নিশ্চয়ই! বরং একধরনের মনগড়া ব্যাখ্যা ও কথার ফুলঝুরিতে জিয়ার ঐসব অপকর্মের সাফাই গেয়ে তিনি জনগণকে বিভ্রান্ত করার মাঝেই স্বীয় রাজনীতির সাফল্য খুঁজে পান। বিবেকের কশাঘাত বা বিবেকের বালাই বলে কিছু থাকলে বিএনপির অপরাজনীতির এমন তাঁবেদারি করাটা কোন সৎ, সাধু ও ন্যায়পরায়ণ মানুষের পক্ষেই সম্ভব হতো না। ডাঃ চৌধুরী আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পরিচালিত একাত্তরের বাংলার মুক্তিযুদ্ধটিকে কী চোখে দেখেন, তাও স্পষ্ট করে জানা দরকার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি সত্যিকারের আস্থাবান কোন লোক ওপরে উল্লিখিত জিয়ার অপকর্মগুলোর এত বড় সমর্থক হতে পারেন কি? না পারেন না! কিন্তু ডাঃ চৌধুরীকে আমরা অনায়াসেই তা পারতে দেখি। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ব্যাপারে তার অবস্থানটি কি তা বোঝার জন্য কারুরই খুব কষ্ট করার প্রয়োজন পড়ে না। একাত্তরের ঘাতকদের ব্যাপারে বা তাদের বিচার বা শাস্তির প্রশ্নেও এই করিৎকর্মা বাক্যবাগীশ ডাক্তার সাহেব পরিষ্কার করে কিছু বলেননি আজও। অর্থাৎ, ইতিহাসের চরম এক সত্যের ব্যাপারেও তিনি সুবিধাবাদী অবস্থান গ্রহণ করেছেন। সত্যকে বুক চিতিয়ে সত্য বলার মতো নৈতিক শক্তি তার নেই। জিয়ার অন্যায়মূলক রাজনীতির পরিচর্যা করতে গিয়ে সে শক্তি তিনি খুইয়ে বসেছেন।

বেগম জিয়া বা তারেক কেন জামায়াতের তোষণ করে তা কি বদরুদ্দোজা চৌধুরী জানেন না বা বোঝেন না? তিনি তা বোঝেন না তা পাগলেও বিশ্বাস করবে না! বেগম সাহেবা ও তদীয় অর্বাচীন পুত্রতো মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী কুচক্রীদের সৃষ্টি। এরা এদেরই প্রতিভূ! বিশেষ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য কুচক্রীরা জিয়াউর রহমানের মিথ্যা ভাবমূর্তি তৈরি করে শিক্ষা-দীক্ষায় অতীব দুর্বল বেগম জিয়া ও তারেককে মিথ্যার আবরণে তৈরি করেছে। এজন্য তাদের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা কুচক্রীমহল যুগের পর যুগ ধরে দিয়ে আসছে। আজ তাই জামায়াত বা ঐ কুচক্রীদের খপ্পর থেকে বেগম জিয়া ও তারেকের বেরিয়ে আসা সম্ভবই নয়।

লোভ-লালসার কাছে তারা নিজেদের সম্পূর্ণভাবে বিক্রি করে দিয়ে একপ্রকার আত্মাহুতিই দিয়ে বসেছেন। অবস্থা তাদের- রবীন্দ্রনাথের হিং টিং ছট কবিতার রাজার মতে, ‘একটু নড়িতে গেলে গালে মারে চড়’- অবস্থা আর কী! অর্থাৎ জামায়াতের সংশ্রব ত্যাগ করতে গেলে বেগম জিয়া শানশওকতের সঙ্গে জীবন ধারণ করতে পারবেন কিনা বা রাজনৈতিকভাবে বেঁচে থাকতে পারবেন কিনা, তা বদরুদ্দোজা চৌধুরীদের কি অজানা? আসলে তিনি সবই জানেন, সবই বোঝেন। তার মতো ধীমান ও চৌকস ব্যক্তি যদি এসব না বোঝেন বা না জানেন, তাহলে বলতেই হবে ‘ধিক, শত ধিক তারে।’ কিন্তু সত্য এই যে, সবই তিনি বোঝেন এবং জানেন। তারপরও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপিতে সদলবলে পুনরায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে তিনি দেশবাসীকে জানিয়ে দিচ্ছেন যে, ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়।’ ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ হলে যা হয় আর কী!

লেখক : সাংবাদিক

নির্বাচিত সংবাদ