২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাকার চূড়ান্ত রায় আজ

সাকার চূড়ান্ত রায় আজ

স্টাফ রিপোর্টার ॥ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল কর্র্তৃক মৃত্যুদ-প্রাপ্ত বিএনপির শীর্ষ নেতা সাকা বাহিনীর (নিজস্ব বাহিনী) প্রধান সালাউদ্দিন কাদের (সাকা ) চৌধুরীর আপীলের চূড়ান্ত রায় আজ ঘোষণা করা হবে। রায়কে কেন্দ্র করে সুপ্রীমকোর্ট অঙ্গনে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এদিকে আপীল বিভাগে রায় ঘোষণার জন্য সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগের কার্যতালিকায় এসেছে। বুধবার কার্যতালিকায় রায়টি ১ নম্বরে রয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে এ কার্যতালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। আজ বুধবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপীল বিভাগের চার সদস্যবিশিষ্ট বেঞ্চ এই ঐতিহাসিক মামলার রায় ঘোষণা করবেন। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেনÑ বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। রায়কে ঘিরে দেশের প্রধান আইনকর্মকর্তা ও সাকার আইনজীবী পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিয়েছেন। এ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন রায় নিয়ে আদালতের ওপর একটি মহল চাপ প্রয়োগ করছে বলে মন্তব্য করেছেন। অপরদিকে রাষ্ট্রের প্রধান কর্মকর্তা মাহবুবে আলম বলেছেন, চাপ থাকার প্রশ্নই ওঠে না। আমি মনে করি, কোন চাপ নেই বরং সাকার পরিবার অপকৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি আরও বলেন আমি আশা করি, আপীল বিভাগে সাকা চৌধুরীর রায় বহাল থাকবে।

৭ জুলাই যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর আপীল বিভাগ ২৯ জুলাই রায় ঘোষণার জন্য দিন নির্ধারণ করেন। ওই দিন রাষ্ট্রের প্রধান আইনকর্মকর্তা বলেছেন, আমরা আশা করি ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদ- বহাল থাকবে আপীল বিভাগেও। প্রধান আইনকর্মকর্তা মাহবুবে আলম বলেছেন, আমি আশা করবো যে চার অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল ফাঁসি দিয়েছিলো সেটা বহাল থাকবে। তার মৃত্যুদ- হবে। অন্যদিকে আসামি পক্ষের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, আপীলের চূড়ান্ত রায়ে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী খালাস পাবেন।

সাকা চৌধুরীর রায় হবে আপীল বিভাগে এটি হবে পঞ্চম রায়। এর আগে আরও চারটি মামলার আপীল নিষ্পত্তি হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা (মৃত্যুদ- কার্যকর), নায়েবে আমির দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী (আমৃত্যু কারাদ-), সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামান (মৃত্যুদ- কার্যকর), জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহাসান মুহাম্মদ মুজাহিদ (ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদ- বহাল আপীল বিভাগে)। জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদ- প্রদান করা হয়েছে। তবে সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত না হওয়ায় রিভিউ নিষ্পত্তি হয়নি। মুজাহিদের আপীলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়নি। আর আপীলে থাকা অবস্থাতেই জামায়াত সাবেক আমির গোলাম আযম ও বিএনপির সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলীমের মৃত্যু হওয়ায় তাদের আপীলের নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। বর্তমানে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী, জামায়াতের নির্বাহী কমিটির সদস্য মীর কাশেম আলীসহ আরও ৮টি মামলা আপীল নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা ২৩টি অভিাযোগে মধ্যে নয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ১৪টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। ২৩টি অভিযোগের মধ্যে ৯টি ঘটনায় সাকা চৌধুরীর সংশ্লিষ্টতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে চারটি চার্জ ৩, ৫, ৬ ও ৮ নম্বর অভিযোগে হত্যা, গণহত্যার দায়ে সাকা চৌধুরীকে মৃত্যুদ- দেয়া হয়। ১৭ ও ১৮ নম্বর অভিযোগে অপহরণ ও নির্যাতনের দায়ে পাঁচ বছর করে ১০ বছর কারাদ-। ২, ৪ ও ৭ নম্বর অভিযোগে হত্যা, গণহত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও দেশান্তরে বাধ্য করার মতো অপরাধের জড়িত থাকা এবং এর পরিকল্পনা করার দায়ে ২০ বছর করে ৬০ বছর কারাদ- দেয়া হয়েছে।

প্রমাণিত যে ৪টি অভিযোগে হত্যা ও গণহত্যায় ফাঁসি হয়েছে তা হলো, ৩নং অভিযোগে গহিরা শ্রী কু-েশ্বরী ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নূতন চন্দ্র সিংহ হত্যা, ৫নং অভিযোগে সুলতানপুরে শ্রী নেপাল চন্দ্র ও তিনজনকে হত্যা, ৬নং অভিযোগে ঊনসত্তর পাড়ায় ৬৯/৭০ জনকে গণহত্যা এবং ৮নং অভিযোগে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মোজাফফর আহমদ ও তার পুত্র আলমগীরকে হত্যার দায়ে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়েছে।

আর প্রমাণিত অপহরণ ও নির্যাতন সংক্রান্ত অভিযোগে আনা হয়েছে, ১৭নং অভিযোগে নিজাম উদ্দিন আহম্মেদকে অপহরণ ও নির্যাতন, ১৮নং অভিযোগে সালেহ উদ্দিন আহমেদকে অপহরণ ও নির্যাতন। আর এ দুই অভিযোগে সাকাকে দেয়া হয়েছে ৫ বছরের সশ্রম কারাদ-। অন্যদিকে ২, ৪ ও ৭নং অভিযোগে তাকে দেয়া হয়েছে ২০ বছরের কারাদ-। আর যে সব অভিযোগ থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে সেগুলো হলো, ১, ১০, ১১, ১২, ১৪, ১৯, ২০ ও ২৩নং অভিযোগ। এছাড়াও যে অভিযোগগুলো নিয়ে আদালত কিছু বলেনি সেগুলো হলোÑ ৯, ১৩, ১৫, ১৬, ২১ ও ২২নং অভিযোগ।

গত ৭ জুলাই যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে আপীল শুনানি শেষ হওয়ায় ২৯ জুলাই রায়ের দিন ধার্য করেন আপীল বিভাগ। গত ১৬ জুন শুরু হয়ে ১৩ কার্যদিবসে এ আপীল শুনানি শেষ হয়। ৫ থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত তিন কার্যদিবসে সাকা চৌধুরীর পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন তার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন ও এসএম শাহজাহান। এর আগে প্রথমে আসামিপক্ষের শুনানিতে ১৬ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালের রায়, সাক্ষীদের সাক্ষ্য-জেরা এবং রায় সংক্রান্ত নথিপত্র (পেপারবুক) উপস্থাপন করেন এসএম শাহজাহান। অন্যদিকে, গত ৩০ জুন এবং ১ ও ৭ জুলাই তিন কার্যদিবসে রাষ্ট্রপক্ষে সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

২০১৩ সালের ১ অক্টোবর বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য সাকা চৌধুরীকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদ- দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর, বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হকের সমন্বয়ে গঠিত তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এ রায় দেন।

একই বছরের ২৯ অক্টোবর খালাস চেয়ে সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগে আপীল করেন তিনি। তবে সর্বোচ্চ সাজা হওয়ায় আপীল করেননি রাষ্ট্রপক্ষ। যে চারটি হত্যা-গণহত্যার দায়ে সাকাকে মৃত্যুদ- দেয়া হয়েছে সেগুলো হলো ৩ নম্বর (অধ্যক্ষ নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যা), ৫ নম্বর (রাউজানের সুলতানপুর গ্রামে তিনজনকে গণহত্যা), ৬ নম্বর (রাউজানের ঊনসত্তরপাড়ায় ৫০-৫৫ জনকে গণহত্যা) এবং ৮ নম্বর (চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মোজাফফর আহম্মদ ও তার ছেলে শেখ আলমগীরকে হত্যা) অভিযোগে। অন্যদিকে, ২ নম্বর (রাউজানের গহিরা গ্রামের হিন্দুপাড়ায় গণহত্যা), ৪ নম্বর (জগৎমল্ল-পাড়ায় ৩২ জনকে গণহত্যা) এবং ৭ নম্বর অভিযোগে (রাউজানের সতীশচন্দ্র পালিতকে হত্যা) আনা তিন হত্যা-গণহত্যায় সাকা চৌধুরীকে ২০ বছর করে কারাদ- প্রদান করা হয়।

১৭ এবং ১৮ নম্বর অভিযোগে সাকা চৌধুরীকে আরও পাঁচ বছর করে কারাদ- দেয়া হয়েছে, যে দু’টি অভিযোগে যথাক্রমে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক নিজাম উদ্দিন আহম্মেদ, সিরাজ ও ওয়াহেদ ওরফে ঝুনু পাগলাকে অপহরণ করে নির্যাতন এবং চান্দগাঁওয়ের সালেহউদ্দিনকে অপহরণ করে সাকা চৌধুরীর পারিবারিক বাসভবন গুডসহিলে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

পাল্টা-পাল্টি বক্তব্য ॥ এদিকে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর রায় নিয়ে আদালতের ওপর একটি মহল চাপ প্রয়োগ করছে বলে মন্তব্য করেছেন তার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন। অপরদিকে, রাষ্ট্রের প্রধান আইনজীবী এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, চাপ থাকার প্রশ্নই ওঠে না। আমি মনে করি, কোন চাপ নেই বরং সাকার পরিবার অপকৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। মঙ্গলবার দুপুরে সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতির নিজ কক্ষে এ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন এ কথা বলেন। অন্যদিকে, এ্যাটর্নি জেনারেল নিজ কাযালয়ে তিনি পাল্টা জবাব দেন সাংবাদিকেদের।

খন্দকার মাহবুব বলেন, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনকে আদালত অবমাননার সমতুল্য। তিনি বলেন, যেখানে আদালতে মামলা বিচারাধীন সে অবস্থায় ফাঁসির দাবিতে সেøাগান দেওয়া, অবস্থান করা আদালত অবমাননার সমতুল্য। খন্দকার বলেন, আসামিকে ফাঁসি দিতে গণজাগরণ মঞ্চ রাজপথে নেমেছে। আমি অবাক হই যে দেশে বিন্দুমাত্র আইনের শাসন আছে সেখানে একটি বিচারাধীন মামলায় সাজা কি ধরনের হবে রাজপথে পুলিশি প্রটেকশন নিয়ে একটি বিশেষ গোষ্ঠী ফাঁসি চাচ্ছে। সুপ্রীমকোর্ট এ বিষয়ে কঠোর মনোভাব দেখাবেন বলে আশা করেন তিনি।

অন্যদিকে, এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাকার আইনজীবীর কথা অস্বীকার করে তিনি বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি, ফাঁসি চাওয়া নতুন কিছু না। প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই এটা ঘটেছে। সাকা চৌধুরী রায় নিয়ে আদালতের ওপর কোন ধরনের চাপ নেই বরং সাকার পরিবারই অপকৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ্যাটর্নি জেনারেলের নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের কাছে তিনি এ কথা বলেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ফাঁসির দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনকে আদালত অবমাননা বলে মনে করি না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই অপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন হয়। আমেরিকায় এক ব্যক্তিকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছিল। সেই হত্যার দাবিতে জনগণ রাজপথে নেমে এসেছিল। জাহানারা ইমাম প্রথম যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি করেছিল। এ দাবি এদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের। সরকার মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করছে। তিনি বলেন, সাকার পরিবারের দাবি বস্তুনিষ্ট না।