২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সেদিন মুসলমান বাড়িতে জ্বলবে মোম, হিন্দুরা জ্বালাবে প্রদীপ

  • ৩১ জুলাই ছিটমহলে বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ

স্টাফ রিপোর্টার, পঞ্চগড় ও কুড়িগ্রাম ॥ দু’দেশের ১৬২ ছিটমহলে ৩১ জুলাই মধ্যরাতে একই সঙ্গে উৎসবমুখর পরিবেশে পালন করা হবে বর্ণাঢ্য নানা কর্মসূচী। এদিন ছিটমহলের প্রত্যেকটি মুসলিম বাড়িতে ৬৮টি মোমবাতি আর হিন্দু বাড়িতে ৬৮টি প্রদীপ জ্বালানো হবে। এছাড়াও প্রতিটি অন্ধকার সড়কে মশাল জ্বালিয়ে আলোকিত করার পাশাপাশি ওড়ানো হবে আকাশ প্রদীপ। বাদ্য-বাজনা ও নাচ-গানসহ নানা অনুষ্ঠানমালারও আয়োজন করা হয়েছে। ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি যৌথভাবে বাংলাদেশের মধ্যে ১১১ ছিটমহলে এবং ভারতে ৫১ ছিটমহলে এসব অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। দীর্ঘ ৬৮ বছরের নিদারুণ কষ্ট আর নাগরিকত্বহীন জীবনের যন্ত্রণার অবসানের প্রতীক হিসেবে দু’দেশের ছিটমহলবাসী এই অভিনব কর্মসূচী পালন করবে বলে ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

বিনিময় সমন্বয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক দীপ্তিমান সেনগুপ্ত স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, ৩১ জুলাই হচ্ছে ছিটমহলে বসবাসকারী মানুষের একটি ঐতিহাসিক দিন। ১৯৭৪ সালে ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির পর থেকে দু’দেশের ১৬২ ছিটমহলের নাগরিকত্বহীন মানুষ নিজের পরিচয় আর একটি দেশের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছিলেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বেঁচে থাকতে ছিটমহল বিনিময় করতে পারেননি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছিটমহলের বন্দী মানুষদের পাশে দাঁড়িয়ে ভারতের তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে প্রটোকল চুক্তি স্বাক্ষর করেন। পরবর্তীতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্থলসীমান্ত বিল লোকসভায় পাস করেন। আর যে কারণে দু’দেশের ১৬২ ছিটমহলে বসবাসকারী রাষ্ট্রহীন মানুষগুলো তাদের নাগরিক অধিকার ফিরে পাওয়ায় ৩১ সন্ধ্যার পরই প্রত্যেকটি ছিটমহলের মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে পড়বে। নাচবে, গাইবে, আনন্দ উল্লাস করবে, নানা রঙে রাঙিয়ে তোলা হবে পুরো ছিটমহলের পরিবেশ। এই রাতটি হবে ছিটমহলবাসীর বড় উৎসবের রাত। শুধু ২০১৫-এর এ দিনই শেষ নয়, প্রতিবছর ৩১ জুলাই উৎসবমুখর পরিবেশে পালন করা হবে।

ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি আয়োজিত সবচেয়ে বড় উৎসবটি হবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কোচবিহার জেলার দিনহাটা মহাকুমার মশালডাঙ্গা ছিটমহলে। এ উৎসবে উপস্থিত থাকার জন্য বাংলাদেশের পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের ছিটমহল আন্দোলনকারী নেতা, ছিটমহলের চেয়ারম্যান, স্থানীয় সাংসদ, আইনজীবী, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার শতাধিক ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক দীপ্তিমান সেনগুপ্ত এর সত্যতা নিশ্চিত করে ভারতের দিনহাটা থেকে মোবাইল ফোনে বলেছেন, বাংলাদেশী বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানানোর উদ্দেশ্য হলোÑ মশালডাঙ্গা ছিটমহলটি এখনও বাংলাদেশী যা ৩১ জুলাই মধ্যরাত থেকে ভারতের হয়ে যাবে। এ ছিটমহলে আয়োজিত উৎসবে শেষবারের মতো যোগ দিয়ে বাংলাদেশী বন্ধুরা ছিটমহলবাসীর আনন্দটাকে ভাগাভাগি করে নেবেন বলেই আমাদের এ ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র। তবে, কতজন বাংলাদেশী অতিথি যাচ্ছেন তা এখনও নিশ্চিত হতে পারেননি তিনি।

এদিকে, ৩১ জুলাই মধ্যরাতে দু’দেশের ভেতরে থাকা ছিটমহলগুলোও আনুষ্ঠানিকভাবে বিনিময় সম্পন্ন হবে। এরপর থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবস্থিত ১১১ ছিটমহল বাংলাদেশী হয়ে যাবে। ১ আগস্ট সূর্য ওঠার আগেই মুছে যাবে ভারতীয় ছিটমহলের নাম। বাংলাদেশ নামে নতুন একখ- মানচিত্র ভেসে উঠবে। শুরু হবে বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসনিক কার্যক্রমসহ নানামুখী উন্নয়ন কর্মকা-।

কুড়িগ্রাম ॥ অধিক সুযোগ-সুবিধার আশায় ভারতে যেতে নাম লিখিয়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা প্রায় সহস্র্রাধিক ছিটমহলবাসী। কিন্তু তাদের মনে এখনও ভয় ঢুকে আছে। সত্যিই কি তারা এসব সুবিধা পাবেন? নাকি হতে হবে প্রতারণার শিকার। এ নিয়ে চলছে নানান জল্পনা-কল্পনা। কুড়িগ্রামের অভ্যন্তরে ১২ ভারতীয় ছিটমহলের মধ্যে ভারতে যেতে আগ্রহী হয়েছে ৩১৭ জন। এদের মধ্যে ১৫৮ জন হিন্দু এবং ১৫৯ জন মুসলমান পরিবার রয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ১৬২ ছিটমহলের মধ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ১১১ ছিটমহলে হেড কাউন্টিং-এর পর জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৪৪৯ জন। এর মধ্যে ভারত যেতে নিবন্ধন করেছে ৯৭৯ জন। অপরদিকে, ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশী ৫১টি ছিটমহল থেকে কেউ বাংলাদেশে আসতে আগ্রহ দেখায়নি। ফলে এ নিয়ে চলছে নানান আলোচনা-সমালোচনা।

ফুলবাড়ীর দাসিয়ারছড়া ছিটের কালিরহাট বাজারের শেফালী বেগম (২৪) এ সম্পর্কে জানান, ‘ভারত সরকার অনেক সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে, পরিবারের নিরাপত্তার জন্য আমরা সেখানে যেতে চাই। আমরা যাতে শান্তিপূর্ণভাবে থাকতে পারি, প্রতারণার শিকার না হই, এটাই সরকারের কাছে দাবি।’ এ এলাকার হামিদা (৩৫) জানান, ‘হামরা ইন্ডিয়া যাবার চাই। হামাক ভয় দেকায় কিছু দিবার নয়। কোন জাগাত নিয়া যাইবে, কোটে থুবে না থুবে ঠিক নাই। হামরা অত ভয় পাই না, হামরা ইন্ডিয়া যামোই।’ একই কথা জানালেন যারা এখান থেকে ভারতে যেতে নাম লিখিয়েছেন।

ছিটমহলের বিভিন্ন বয়সী লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বাংলাদেশ থেকে ভারতে যেতে বেশ কয়েকটি ফ্যাক্টর কাজ করেছে। এর মধ্যে ৪টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ছিটে জমিজমা ও পারিবারিকভাবে বিরোধ। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন মাদক ব্যবসা ও অসামাজিক কর্মকা-ে জড়িত হওয়ার কারণ এবং তৃতীয়ত, মাতৃভূমির প্রতি যে টান থাকা দরকার সেটি কমে গেছে বিভিন্নভাবে ভারতে গিয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করতে গিয়ে। চতুর্থত, ভারতীয় সরকারের বিভিন্ন লোভনীয় প্যাকেজ।

ছিটমহল আন্দোলনের অন্যতম নেতা গোলাম মোস্তফা জানান, ছিটমহলবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রেশন কার্ড, ফ্ল্যাট বাড়ি আর কর্মসংস্থানসহ ভারত সরকারের দেয়া নানা সুযোগ-সুবিধা সত্ত্বেও ভারতীয় ছিটমহলের বেশিরভাগ মানুষ শেষ পর্যন্ত নাড়ির টানেই বাংলাদেশের ভূখ-ে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাছাড়া ভারতে গিয়ে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি আত্মীয়তার বন্ধন বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়।

ছিটমহলে আইনী সহায়তা সভা ॥ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ছিটমহল বিনিময় পরবর্তী আইনী সহায়তা নিয়ে এক সভা গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় কুড়িগ্রামের অভ্যন্তরে দাশিয়ার ছড়া কামালপুর শাখা অফিসে অনুষ্ঠিত হয়।

ভারত বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ অংশের সভাপতি ময়নুল হকের সভাপতিত্বে সভায় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমন্বয় কমিটির ভারতীয় অংশের আইন উপদেষ্টা এ্যাডভোকেট আহসান হাবিব ও বাংলাদেশ অংশের আইন উপদেষ্টা এ্যাডভোকেট আব্রাহাম লিংকন। মূল বক্তব্য রাখেন সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা খান ও দাশিয়ার ছড়া ছিটমহলের সভাপতি আলতাফ হোসেন।

গোলাম মোস্তফা খান জানান, আগামী ৩১ তারিখ ছিটমহল বিনিময়ের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে সভায় আলোচনা হয়। তিনি আরও জানায়, আগামী ১ আগস্ট থেকে ছিটমহলে নতুন কি পরিস্থিতি দাঁড়ায় তার ওপর ভিত্তি করে আলোচনা হয়েছে।

লালমনিরহাট ॥ নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, বাংলাদেশের ভেতরে থাকা ১১১ ছিটমহলের মধ্যে লালমনিরহাট জেলা সদর, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম উপজেলার ৫৯ যৌথ জনগণনা জরিপে বাদপড়ারা ৩১ জুলাইয়ের পর বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে যাবে। তারা আবেদন করে ভোটার তালিকায় নাম তুলতে পারবে। পাবে রাষ্ট্রের সকল সুযোগ সুবিধা। এদিকে হাতীবান্ধার গোতামারী ছিটমহেলর দু‘টি মুসলিম পরিবারের সদস্যরা ভারতে যেতে ইচ্ছুক নিবন্ধন করার পর সোমবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আবেদন করে তাদের মত পাল্টে ফেলেছে। তারা এখন বাপদাদার ভিটামাটি, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাংলাদেশে থাকতে চায়। মতপাল্টানো ছিটমহলের বাসিন্দারা হলেন মাহাবুবুর রহমান ( ৪৩) ও মজিবর (৪১)।

হাতীবান্ধা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মাহবুবুর রহমান জানান, হাতীবান্ধাসহ জেলার ৫৯ ছিটমহলে নোটিস দিয়ে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে নির্ধারিত ফরম পূরণ করে ভারতে যেতে ইচ্ছুক ছিটমহলবাসী তার মত পাল্টে বাংলাদেশে থেকে যেতে আবেদন করতে পারবেন। যৌথ জরিপ কমিটির মত অনুযায়ী এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আবার নতুন কেউ ইচ্ছা করলে ভারত যেতে আবেদন করতে পারেন। একইভাবে ভারতের ভেতরে থাকা বাংলাদেশের ছিটমহলের মানুষও একই সুযোগ পাচ্ছে।