১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিনা বিচারেই ১৭ বছর কারাগারে কেটে গেল বাবুলের

আরাফাত মুন্না ॥ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত পার করে দিলাম অন্ধকার জগতে। ১৭ বছর ধরে কারাগারে আছি। মামলা শেষ হয় না। অনেক বিচারক পরিবর্তন হয়েছে। আমার জীবনের কোন হেরফের হয় না। দিনের পর দিন কারাগার থেকে আদালতে আর আদালত থেকে কারাগারে আনা-নেয়া করা হচ্ছে। জেল-ফাঁস যা হয় হয়ে গেলে মনে হয় বেঁচে যেতাম। বিচার নয়, এখন জেল-ফাঁস দিয়ে দিতে বলেন। এমনভাবেই নিজের মনের আক্ষেপ প্রকাশ করছিলেন একটি হত্যা মামলার আসামি মোঃ বাবুল। সম্প্রতি মামলার শুনানির তারিখ ধার্য থাকায় আদালতে আনা হলে কথা হয় বাবুলের সঙ্গে।

মামলার নথি থেকে জানা গেছে, ১৯৯৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর। তৎকালীন ডেমরা থানার মীরহাজিরবাগের ৮৬ নম্বর বাড়ির একটি কুয়ার মধ্যে মোখলেছুর রহমান নামের এক ছাত্রের জবাই করা লাশ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় মোখলেছুর রহমানের বাবা আঃ সাত্তার বাদী হয়ে ওই দিনই ডেমরা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। রাত ১টা থেকে ৪টার মধ্যে কে বা কারা তার ছেলেকে হত্যা করেছে বলে এজাহারে উল্লেখ করেন বাদী। আসামি হিসেবে কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি। এরপর তদন্তকালে ১৯৯৯ সালের ১৭ জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মধ্যপাড়া গ্রামের মোঃ জয়নাল আবেদীনের ছেলে মোঃ বাবুলকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর বাবুল বার বার জামিন আবেদন করলেও লাভ হয়নি। সেই থেকেই বাবুল কারাগারে।

১৯৯৯ সালে যখন বাবুলকে গ্রেফতার করা হয় তখন তার বয়স ছিল ৩৫ বছর। বর্তমানে ৫২। তার জীবনের ১৭টি বছর ইতোমধ্যে কেটেছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। এত বছরেও শেষ হয়নি মামলাটির বিচার। রাজধানীর ডেমরা থানার ওই হত্যা মামলাটি ঢাকা মহানগর দ্বিতীয় অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতে (মেট্রো-দায়রা মামলা নম্বর ৪৪৮/০২) বিচারাধীন।

বাবুল জানান, ভাই জাফরও এই মামলার আসামি ছিলেন। তিনি বছর চারেক আগে মারা গেছেন। আসামি বাবুল বলেন, ‘আমাকেও হয়ত এভাবেই কারাগারে মরতে হবে।’ তার দাবি, মামলায় তাদের অহেতুক জড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘তদন্ত কর্মকর্তা এই ঘটনার ক্লু না পেয়ে প্রকৃত আসামি গ্রেফতার না করে আমাদের জড়িয়েছেন।’

বিচারিক আদালতের এপিপি (সহকারী সরকারী কৌঁসুলি) মোঃ শাহজামাল লিটন বলেন, আসামি বাবুল প্রায় ১৭ বছর ধরে কারাগারে আছেন, এটা সত্যি। এত দিনেও মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এরই মধ্যে সাতজন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। শুধু মৃত ব্যক্তির ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন যিনি দিয়েছেন সেই চিকিৎসকের সাক্ষ্য নিতে পারলেই নিষ্পত্তি হয়ে যেত। কিন্তু ওই চিকিৎসক সাক্ষ্য দিতে আসছেন না। চেষ্টা চলছে তাকে আদালতে হাজির করার। হাজির না হলে আগামী তারিখে সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত ঘোষণা করা হবে বলে আদালত আদেশ দিয়েছেন।

মামলার নথি থেকে জানা গেছে, ডেমরা থানায় তৎকালীন এসআই মোঃ আঃ হামিদ মামলাটি তদন্ত করে ১৯৯৯ সালের ১১ এপ্রিল ছয়জনকে আসামি করে আদালতে চার্জশীট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন। ১৭ বছর ধরে কারাগারে থাকা আসামি বাবুল ও তার ভাই জাফর ছাড়া চার্জশীটভুক্ত অন্যরা হলেন নাজু, জহির, সেলিম ও বদরুল। জাফর মারা গেছেন। অন্যরা পলাতক রয়েছেন।

মামলার তদন্ত প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, আসামিরা এই হত্যাকা-ের সঙ্গে কেন, কিভাবে জড়িত তার কোন ব্যাখ্যা নেই প্রতিবেদনে। শুধু বলা হয়েছে, আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে চার্জশীট দাখিল করা হলো।

বিচারাধীন এই মামলায় মোট ১৪ জনকে সাক্ষী করা হয়। তাদের মধ্যে মাত্র ছয়জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করতে পেরেছে রাষ্ট্রপক্ষ। সরকারী আইনজীবী দাবি করেন, মামলার সাক্ষী স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজের তৎকালীন চিকিৎসক (মেডিসিন বিভাগ) ডাঃ মোঃ নুরুল ইসলাম সাক্ষ্য দিলে আগেই চাঞ্চল্যকর এই মামলাটি নিষ্পত্তি হতো। কিন্তু তিনি আদালতে আসছেন না। মামলার নথি থেকে দেখা যায়, বারবার আদালত তাকে তলব করলেও তিনি আদালতে হাজির হচ্ছেন না। এমনকি তার বিরুদ্ধে অজামিনযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানাও ইস্যু করা হয়েছে। কিন্তু তাকে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশও হাজির করছে না। এ কারণে আগামী ধার্য তারিখে তাকে হাজির করা সম্ভব না হলে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত ঘোষণা করা হবে বলে গত ২৮ জুনের আদেশে বলেছেন আদালত।

মামলার নথি থেকে আরও দেখা যায়, দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা বাবুলের জামিন আবেদন বারবার নাকচ করেছেন আদালত। গত ২৮ জুনও তার জামিনের আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু ঢাকা মহানগর দ্বিতীয় অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোসাম্মাৎ শামসুন্নাহার এটি একটি নৃশংস ঘটনার মামলা বিবেচনায় আসামির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে দেন।

ঘটনাটি নৃশংস হলেও আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করার মতো সাক্ষ্য পাওয়া যায়নি। এ পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়েছেন নিহত মোখলেছুরের বাবা আঃ সাত্তার, তার দুই ভাই, একজন এলাকাবাসী ও দুজন পুলিশ সদস্য। ঘটনায় আসামিরা জড়িত মর্মে কোন সাক্ষ্য দেননি নিহত ব্যক্তির স্বজন ও এলাকাবাসী। এমন মামলায় ১৭ বছরেও আসামির জামিন না পাওয়া দুঃখজনক ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী বলে আসামির আইনজীবীরা শুনানির সময় আদালতকে জানান। কিন্তু ফল কিছুই হয় না।

আইনজ্ঞদের মতে, এমন মামলার বিচারকাজ দীর্ঘদিন চালানোর কোন সুযোগ নেই। ১৭ বছর ধরে কারাগারে বিনা বিচারে একজন আসামিকে রাখা অমানবিক। অনেক আগেই জামিন পাওয়া উচিত ছিল। আইনজীবী ইমতিয়াজ আহমেদ জনকণ্ঠকে বলেন, ১৭ বছর ধরে কারাগারে বিনা বিচারে কোন আসামিকে রাখা শুধু অমানবিক নয়, সব মানবতাকে হার মানায়। এ ঘটনা মানুষকে বিচার বিভাগ সম্পর্কে বিরূপ ধারণা দেবে। আস্থাহীন করে তুলবে। হত্যা মামলায় একজন আসামি হলেই ধরে নেয়া যাবে না যে সেই খুনি।