২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কুষ্টিয়ায় দুই বীরাঙ্গনার দিন কাটছে অনাহারে

  • দুঃসহ স্মৃতিই তাদের সম্বল

এমএ রকিব, কুষ্টিয়া ॥ কুষ্টিয়ার দুই বীরাঙ্গনা নারী আজ কেমন আছেন? কেমনই বা কাটছে তাদের জীবন-সংসার? তা জানতে ছুটতে হলো জেলার কুমারখালী উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের হাশিমপুর ও সদকী ইউনিয়নের মট মালিয়াট গ্রামে। জানা গেল, চরম দুঃখ-কষ্ট আর দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটছে তাদের। যাঁদের মূল্যবান ত্যাগের বিনিময়ে বাঙালী আজ স্বাধীন, পেয়েছে নিজস্ব ভূখ-। তাঁদের শেষ বয়সের সম্বল শুধুই চোখের জল। দেখার কেউ নেই। কেউ কোন খোঁজখবরও রাখে না এই বীরাঙ্গনাদের। জরাজীর্ণ তাদের বাড়ি-ঘর। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৪ বছর পরও তাদের ভাগ্যে জোটেনি কোন মূল্যায়ন। পাননি তাঁরা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও ন্যূনতম সহায়তা। সরকারী ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা থেকেও তাঁরা বঞ্চিত। ফলে জীবনের এই শেষ বয়সে এসে তাদের দিন কাটছে অতিকষ্টে আর নীরবে চোখের জল ফেলে। ১৯৯৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বীরাঙ্গনা দুই নারীকে ৫০ হাজার টাকা করে অনুদান প্রদান করেন। কিন্তু এরপর আর কেউ তাদের দিকে ফিরেও তাকায়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একাত্তরে হাশিমপুর গ্রামে ঘটে যায় অমানবিক নির্যাতন ও পাশবিক অত্যাচারের বীভৎস ঘটনা। পাক হানাদাররা ঘরে ঘরে ঢুকে নারী-পুরুষের ওপর শুরু করে শারীরিক নির্যাতন ও পাশবিক অত্যাচার। ওই হায়েনাদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি সেদিনের অষ্টাদশী গৃহবধূ এলেজান নেছা (৬১)। একইভাবে পাক সেনাদের পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন সদকী ইউনিয়নের মট মালিয়াট গ্রামের মোমেনা খাতুন (৬০)। এ প্রতিবেদকের কাছে একাত্তরের সেই বীভৎস দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেন এলেজান নেছা ও মোমেনা খাতুন।

এলেজান নেছা ॥ বীরাঙ্গনা স্বীকৃতি পেয়ে কী লাভ আমাদের? সরকার ও প্রশাসন এ পর্যন্ত আমাদের জন্য কিছুই করেনি। সাংবাদিকরা বার বার সেই বীভৎস ও লজ্জাকর ঘটনার বিবরণ শুনতে চায়। কিন্তু আমাদের দুঃখ-কষ্ট কেউ বোঝে না। তিনি জানান, যুদ্ধ চলাকালীন হাশিমপুর গ্রামে স্বামীর বাড়িতেই পাক সেনারা তাঁর ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। ঘটনার সময় মাছ ব্যবসায়ী স্বামী আকবর আলী বাড়িতে ছিলেন না। সম্ভ্রম হারানো এই বীরাঙ্গনা এখন অসহায় জীবন-যাপন করছেন। তার দুই ছেলেই কৃষি শ্রমিক এবং স্বামী বার্ধক্যজনিত কারণে উপার্জনে অক্ষম।

ফলে অভাব তাঁর নিত্যসঙ্গী। মোমেনা খাতুন ॥ সদকী ইউনিয়নের মট মালিয়াট গ্রামের বীরাঙ্গনা মোমেনা খাতুন। তাঁর ওপর পাক হানাদারদের পাশবিক নির্যাতনের ঘটনাটি আরও করুণ ও মর্মান্তিক। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাশের কল্যাণপুর গ্রামে পিতার বাড়িতে ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে একই দিনে মারা যায় তাঁর ছোট দুই ভাই ওসমান ও বক্কার। দুই ভাইয়ের আকস্মিক মৃত্যুতে মুষড়ে পড়েন মোমেনা খাতুন। দুই ভাইয়ের লাশ দেখতে ছুটে যান পিতার বাড়িতে। সেখানে গিয়েই পাক সেনাদের নির্যাতনের শিকার হন মোমেনা খাতুন। এ সময় তাঁর পিতা এজো শেখও হানাদারদের চরম নির্যাতনের শিকার হন। মুক্তিযুদ্ধের সময় সম্ভ্রম হারানো বীরাঙ্গনা মোমেনা খাতুন পাক সেনাদের নির্যাতনের সেই দুঃসহ ও ভয়ঙ্কর স্মৃতি বুকে ধারণ করে কোনমতে বেঁচে আছেন। স্বামী আব্দুল কাদেরেরও নেই কোন উপার্জন।

কৃষি শ্রমিক একমাত্র ছেলের পরিবারেও টানাটানি লেগে থাকে। আয়-উপার্জনের অন্য কোন অবলম্বন নেই এই বীরাঙ্গনার। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে দ্রুত সরকারী ভাতা প্রাপ্তির দাবি জানান বীরাঙ্গনা দুই নারী।