২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আমাদের গর্ব সাকিব আল হাসান

আলোকদিয়া পুখরিয়া হাইস্কুল খেলার মাঠ। বলা যায় এক অখ্যাত, অতি সাধারণ এই মাঠটাও আজ বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের একটা অংশ হয়ে গেছে। তারও একটা কারণ আছে। আর সে কারণটা হচ্ছে, স্বচ্ছ নীল জলে ধীরে বয়ে চলা নবগঙ্গা তীরের এই সাদামাটা মাঠেই ক্রিকেটে অভিষিক্ত হন আজকের বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান।

সাকিবের সে ক্রিকেট অভিষেক নিয়েও আছে এক চমকপ্রদ ও মজার ঘটনা। মাগুরা শহরে জন্ম নেয়া সাকিবের মামাবাড়ি আমার গ্রাম পুখরিয়ার পাশের গ্রাম পাইকেল। ছেলেবেলা থেকেই খেলার প্রতি সাকিবের ছিল প্রচ- ঝোঁক। মামাতো ভাই জাতীয় দলের ফুটবলার উজ্জ্বলের মতো ফুটবলের প্রতি তাঁর আগ্রহ থাকলেও ক্রিকেটের প্রতি তাঁর ঝোঁকটা ছিল আরও খানিকটা বেশি। কিন্তু সাকিবের বাবা মাসরুর রেজা (আমরা যাকে ডাক নামে কুটিল বলে চিনি। মাগুরা কলেজে সে আমার বছর দুয়েকের জুনিয়র ছিল)। ছিলেন মাগুরার একজন নামকরা ফুটবলার। এ কারণে তিনি চাইতেন তার ছেলে সাকিব আল হাসানও তারই মতো একজন ফুটবলার হবে, মস্ত বড় ফুটবলার। কথায় বলে, ‘মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক।’ সাকিবের বেলায়ও সেটাই হলো। বাবার বড় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন ছেলে সাকিব পূরণ করতে পারেনি। যদিও তাতে শাপে-বরই হয়েছে। ক্রিকেটার না হয়ে সাকিব যদি ফুটবলার হতেন তাহলে বিশ্বসেরা হতে পারতেন না সেটা নিশ্চয় সবাই মানবেন। বাংলাদেশের ফুটবলের যে অবস্থা তাতে করে ফুটবল খেলে সাকিবের আজকের এত যশ, খ্যাতি, অর্থ কোনটাই হতো না।

সে যাই হোক, বাবাকে না জানিয়েই একদিন সাকিব আলোকদিয়ায় অনুষ্ঠিত ক্রিকেট লীগে মাগুরার একটি দলের হয়ে ক্রিকেট খেলতে এলো। যেটি ছিল সাকিবের জীবনের প্রথম প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট ম্যাচ। আর এই ম্যাচটিই সাকিবের খেলোয়াড়ি জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। ফুটবলার না হয়ে হলো ক্রিকেটার। বিধিও প্রসন্ন ছিল বলা যায়। এরপর বিকেএসপিতে ক্রিকেটেই চান্স পেয়ে গেল। তারপর জাতীয় যুব দল, জাতীয় দল; অতঃপর একদিনের ক্রিকেটে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারসহ বিভিন্ন সময়ে টপ টেন ব্যাটসম্যান, টপ টেন বোলারসহ অসংখ্য কৃতিত্ব অর্জিত হলো। ক্রিকেটে সাকিবের যে অর্জন সেটা মাগুরার কোন ছেলের তো বটেই বাংলাদেশের কোন ক্রিকেটারের জন্যও অনন্য অর্জন। সাকিবের আগে বাংলাদেশের কোন খেলোয়াড় বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে সেরা তো দূরের কথা টপ টেন বা টপ টুয়েন্টিতেও আসতে পারেনি। আর সেখানে এতদিন ধরে একদিনের ক্রিকেটে সেরা অলরাউন্ডার থাকা চাট্টিখানি কথা নয়। এজন্য বাংলাদেশের আপামর মানুষ যতটা গর্বিত মাগুরার প্রত্যেকটি মানুষও তার চেয়ে এতটুকু কম নয়।

১৯৭৭ সালে মাগুরার আরেক কৃতীসন্তান ফুটবলার সৈয়দ নাজমুল হাসান লোভন যখন প্রথমবার জাতীয় ফুটবল দলে (১৯তম এশিয়ান গেমস, তেহরান) খেলার সুযোগ পান সেটাতেই মাগুরাবাসীর আনন্দ আর ধরে না। তারও অনেক পরে উজ্জ্বল, লাজুকসহ অনেকে জাতীয় দলে খেললেও সাকিবের কৃতিত্বে তা অনেকটাই ম্রিয়মাণ। এখন এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, ‘সবার ওপরে সাকিবÑ তার ওপরে কেউ নেই।’ এখন সাকিব কেবল মাগুরার নয়, সারা দেশের; সকল মানুষের গর্ব।

নিজের শীর্ষস্থানটা ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি ক্রিকেটে সাকিবের অর্জন অনেক, প্রাপ্তিও অনেক। সম্প্রতি সাকিবের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে আরও একটি সাফল্যের পালক যোগ হলো। আর সেটা হচ্ছে, দ. আফ্রিকার বিপক্ষে একদিনের ক্রিকেটের সিরিজ জয়ের ম্যাচে সাকিব আল হাসান বাংলাদেশের প্রথম অলরাউন্ডার হিসেবে একদিনের ক্রিকেটে ২০০ উইকেট ৪০০০ রান করার অনন্য গৌরব লাভ করেন। একদিনের ক্রিকেটে সপ্তম অলরাউন্ডার হিসেবে সাকিব ৪০০০ রান ও ২০০ উইকেট লাভ করেন। ৪০০০ রানের মাইলফলকটা যদিও আরও আগেই টপকেছিলেন। কম ম্যাচের হিসাবে সাকিবের অবস্থান প্রথম। অর্থাৎ সবচে’ কম মানে ১৫৬ ম্যাচ খেলে সাকিব এ কৃতিত্ব অর্জন করেন। সাকিব ছাড়া আর কোন ক্রিকেটার ২০০ ম্যাচের আগেও এ বিরল কৃতিত্ব অর্জন করতে পারেননি। ফলে একদিনের ক্রিকেটের শীর্ষ অলরাউন্ডার হয়ে সাকিব নিজেকে এক উচ্চতায় নিয়ে যান। আর ১৫৬ ম্যাচ খেলে ২০০ উইকেট ৪০০০ রান করার কৃতিত্ব তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তাকে হটিয়ে হয় তো অন্য কেউ শীর্ষ অলরাউন্ডার হতে পারবেন। তবে তার এই কম ম্যাচে গড়া এ কৃতিত্ব সহসা কেউ টপকাতে পারবেন বলে মনে হয় না। এটি নিঃসন্দেহে সাকিবের একটি বিরল অর্জন।

সাকিব আল হাসান বাংলাদেশের ক্রিকেটের অনেক জয়ের নায়ক। অনেক সাফল্যের সফল রূপকার। বদলে যাওয়া এই বাংলাদেশ দলের এক শক্ত খুঁটি। সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে টেস্ট ও একদিনের সিরিজে ধবল ধোলাইয়ের আগে ও পরে অনেক জয় এসেছে সাকিবের হাত ধরে। একজন বড় ক্রিকেটার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন অনেক আগেই। বড় ক্রিকেটার পানও অনেক, তার দানও হওয়া দরকার অনেক বড়। ভারতের ক্রিকেট লিজেন্ড শচীন টেন্ডুলকর টেস্ট ও ওয়ানডের অসংখ্য রেকর্ড নিজের থলিতে পুরলেও বিশ্বকাপটা ছুঁতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত ২০১১ বিশ্বকাপে শচীনের সে অপূর্ণতা ঘুঁচে যায়। আর তাই বাংলাদেশের ক্রিকেটানুরাগী দর্শক মনে করে সাকিবের হাত ধরেই বাংলাদেশও একদিন বিশ্বকাপের ট্রফিটাও জয় করবে। সাকিবই সেটা পারবে। আর সে দিনটাও হয়ত বেশি দূরে নয়। বাংলাদেশের দামাল ছেলেরা যেভাবে খেলছে এ খেলার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে তাতে করে ২০১৯ বিশ্বকাপেই সেটা সম্ভব হতে পারে। আর সাকিব যদি দেশবাসীকে সেটা উপহার দিতে পারেন তাহলে তারচেয়ে বড় উপহার আর কিছু হবে না।

লেখক : ক্রীড়ালেখক, কথাসাহিত্যিক ও সাহিত্য সংগঠক

syedmayharulparvey@gmail.com