২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ডাবল সেঞ্চুরিতে উদ্ভাসিত স্মিথ

  • মোঃ নুরুজ্জামান

স্টিভেন স্মিথের টেস্ট অভিষেক ২০১০ সালের জুলাইয়ে। তবে অসি সেনসেশনের ব্যাটে উত্তুঙ্গ হাওয়া বইছে গত দেড় বছর ধরে। সেটা এতটাই উল্কার বেগে ধাবমান যে সম্প্রতি প্রথমবারের মতো জায়গা করে নিয়েছেন আইসিসি টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে (ব্যাটসম্যানদের তালিকায়)। ক্যারিয়ারের দশ সেঞ্চুরির আটটিই করেছেন ২০১৪Ñ এর ফেব্রুয়ারি পরবর্তী সময়ে। গত ডিসেম্বর-জানুয়ারি এক মাসের ব্যবধানে দুইবার আউট হয়েছেন ১৯০-এর ঘরে, একবার তো ১৯৯-এ! এবার আক্ষেপ ঘুচল। ক্রিকেট মক্কা লর্ডসে পেলেন জীবনের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি (২১৫)। যার কল্যাণে বড় জয়ে ঐতিহ্যের এ্যাশেজ সিরিজে সমতা ফেরায় তার দল অস্ট্রেলিয়া।

অসিদের জন্য এই ডাবল সেঞ্চুরির মাহাত্ম্য আরও বেশি। কারণ দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর পর কোনো অস্ট্রেলিয়ানের বিদেশের মাটিতে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরির এটি। এর আগে ২০০৬ সালে সর্বশেষ বাংলাদেশ সফরে এমন কীর্তি গড়েছিলেন মূলত বোলার হিসেবেই যার প্রথম পরিচয় সেই জেসন গিলেস্পি! ৩০তম টেস্টে ক্যারিয়ারের দশম সেঞ্চুরিটাকে কাক্সিক্ষত ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দিলেন ২৬ বছর বয়সী নিউসাউথওয়েলস হিরো। তাও আবার ক্রিকেটমক্কা লর্ডসে। ২৫ চার ও ১ ছক্কায় খেললেন ২১৫ রানের ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস। যাতে ম্লান সতীর্থ ওপেনার ক্রিস রজার্সের ১৭৩। মূলত প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার ৫৬৬ রানের পাহড়সম স্কোরই লডর্স টেস্টের ভাগ্য গড়ে দেয়।

গত মাসে প্রকাশিত র‌্যাঙ্কিংয়ে টেস্ট ব্যাটসম্যানদের তালিকায় স্মিথকে জায়গা করে দিয়ে দ্বিতীয় স্থানে নেমে গেছেন অবসরের অপেক্ষায় থাকা সাঙ্গাকারা। এখন অবশ্য তিনি আছেন চতুর্থ স্থানে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে যথাক্রমে দুই প্রোটিয়া তারকা এবি ডিভিলিয়ার্স ও হাসিম আমলা। ২০১২ সালে মাইকেল ক্লার্কের পর কোনও অস্ট্রেলীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে গৌরবময় এক নম্বর জায়গাটি দখল করলেন ‘শিশুসুলভ চেহারার’ এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান। গত উইন্ডিজ সিরিজের আগে চার নম্বরে ছিলেন স্মিথ। জ্যামাইকায় সিরিজ নির্ধারণী দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে ১ রানের জন্য সেঞ্চুরি পাননি। দ্বিতীয় ইনিংসে অপরাজিত ৫৪ রান করে হন ম্যাচসেরা। ২৭৭ রানের বিশাল জয়ে স্বাগতিকের ২-০তে ‘হোয়াইটওয়াশ’ করে ফ্র্যাঙ্কওরেল ট্রফি করায়ত্ত করে অসিরা।

ব্যাট হাতে দুরন্ত পারফর্মেন্সের সুবাদে ৯১৩ রেটিং পয়েন্ট পেয়ে টেস্ট ব্যাটসম্যানদের তালিকায় সবাইকে পেছনে ফেরেন স্মিথ। লর্ডসে ডাবল সেঞ্চুরির পর সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৩৬। সাদা পোশাকের অভিজাত ঘরানায় গত এক বছরে ১০২.১৬ গড়ে মোট ১,২২৬ রান সংগ্রহ করেন তরুণ উইলোবাজ। কেবল তাই নয়, এ্যাশেজ শুরুর আগে পর্যন্ত উইন্ডিজে সেঞ্চুরি পূরণের পথে ২০১৪-২০১৫ টানা দুই বছর মিলিয়ে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ২ হাজার বা তার বেশি রানের অনন্য নজির স্থাপন করেন তিনি। কিংস্টন টেস্টে ব্যক্তিগত ১৯৯ রানে দলের নবম ব্যাটসম্যান হিসেবে স্বাগতিক পেসার জেরোমে টেইলরের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে সাজঘরে ফেরেন। ৩৬১ বলের ইনিংসটি ২১ চার ও ২ ছক্কায় সাজানো। আশা পূরণ হতে খুব বেশি সময় লাগল না। ক্রিকেট তীর্থ লর্ডসে হাসল স্মিথের ব্যাট। সে হাসির রোশনাইয়ে উড়ে গেল ইংলিশরা।

বিশ্বকাপের আগে ঘরের মাটিতে ভারতের বিপক্ষে সিরিজ হয়ে ব্যাট হাতে আকাশে উড়ছেন স্মিথ। শেষ ৯ টেস্টের ১৭ ইনিংসে ৫ হাফ সেঞ্চুরির বিপরীতে সেঞ্চুরি করেছেন ৬টি! ভারত সিরিজে স্মিথের ইনিংসগুলো ছিল ১৬২*, ৫২*, ১৩৩, ২৮, ১৯২, ১৪, ১১৭ ও ৭১। ওই সিরিজের অবিশ্বাস্য ব্যাটিংই মূলত প্রথমবারের মতো অভিজাত ঘরানার র‌্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে বসায় স্মিথকে। এত প্রাপ্তির মাঝেও মাত্র ১ রানের আফসোসে পুড়তে হয়েছিল। কিংস্টনে ১৯৯ রানে আউট হয়েছিলেন অসি-সেনশেসন। প্যাভিলিয়নে ফেরেন ক্যারিয়ারের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরির নিশ্বাস ছোঁয়া দূরত্বে। টেস্ট ইতিহাসের অষ্টম ও অস্ট্রেলিয়ার তৃতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে এমন দুর্ভাগ্যের খাড়ায় কাটা পড়লেন স্মিথ। ১৯৯ রানে আউট হওয়া অপর ৭ ক্রিকেটার পাকিস্তানের মুদাসসর নজর, ইউনুস খান, অস্ট্রেলিয়ার ম্যাথু এলিয়ট, স্টিভ ওয়াহ, ভারতের মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন, শ্রীলঙ্কার সনাথ জয়সুরিয়া ও ইংল্যান্ডের ইয়ান বেল। স্মিথের আগে সর্বশেষ ২০০৮ সালে লর্ডসে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে এমন দুর্ভাগ্যের শিকার হয়েছিলেন বেল। মজার বিষয়, সেই লর্ডসেই ডাবল সেঞ্চুরিতে উদ্ভাসিত স্টিভেন স্মিথ।

কেবল তাই নয়, বিশ্বকাপের আগে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে অধিনায়ক হিসেবে অভিষেকেই গড়েছিলেন নতুন ইতিহাস। অস্ট্রেলিয়াকে বোর্ডার-গাভাস্কার ট্রফি জেতানোর পাশাপাশি অভিষেকে সেঞ্চুরিসহ সিরিজে সেঞ্চুরিরর হ্যাটট্রিক করেছিলেন তিনি! বেইলির অনুপস্থিতিতে ওয়ানডেতে অধিনায়ক হিসেবে অভিষেকেও (ভারপ্রাপ্ত) হাঁকিয়েছিলেন সেঞ্চুরি। অধিনায়ক হিসেবে দুই ভার্সনে নিজের প্রথম ম্যাচে সেঞ্চুরির অনন্য নজির স্থাপন কর বুঝিয়ে দিয়েছেন চাইলে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া তার ওপর ভরসা করতেই পারে। স্মিথের বছরটা শুরুই হয়েছিল উৎসাহের এক অর্জন দিয়ে। গত বছর জুড়ে দুরন্ত ব্যাটিং, সঙ্গে নেতৃত্বের অভিষেকে আলোড়ন তুলে জানুয়ারির শুরুতেই অস্ট্রেলিয়ার বর্ষসেরা ক্রিকেটারের পুরস্কার ছিনিয়ে নেন তিনি।

দেশটির ২০১৪ সালের বর্ষসেরা হিসেবে ‘বোর্ডার গাভাস্কার ট্রফি’ জিতে নেন ‘বেবি ফেসের’ অধিকারী অসম্ভব প্রতিভাবান এই ক্রিকেটার। ২৪৩ ভোট পেয়ে ডেভিড ওয়ার্নার (১৭৫) ও আইসিসির বর্ষসেরা তারকা মিচেল জনসনকে (১২৬) পেছনে ফেলেন স্মিথ। দেশসেরার পাশাপাশি ‘টেস্ট প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার’ এবং ‘ওয়ানডে প্লেয়ার অব দ্য ইয়ারের’ পুরস্কারও বগলদাবা করেন তিনি! গত দশ বছর ধরে প্রবর্তিত আয়োজনে স্মিথ তৃতীয় ক্রিকেটার যিনি একইসঙ্গে তিন তিনটি বিভাগে বাজিমাত করেন। অপর দু’জন হলেন সাবেক অধিনায়ক রিকি পন্টিং (২০০৭) ও শেন ওয়াটসন (২০১১)। ব্যাট হাতে সত্যি অবিশ্বাস্য পারফর্মেন্স স্মিথের।

২০১০Ñএ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখা স্মিথের ৩০ টেস্টের ক্যারিয়ারে ৫৯ গড়ে ১০ সেঞ্চুরিতে মোট রান ২৯২৬। তার মাঝে সত্যিকারের এক লিজেন্ডের ছায়া দেখছেন অসিরা।

নির্বাচিত সংবাদ