২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রায়ে হতাশ বিস্মিত বেদনাহত বিএনপি

  • যুদ্ধাপরাধ বিচারের রায়ের প্রথম প্রতিক্রিয়া

স্টাফ রিপোর্টার ॥ অবশেষে যুদ্ধাপরাধ বিচারের রায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিএনপি। বুধবার বিকেলে নয়াপল্টন বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলের মুখপাত্র ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, আপীল বিভাগের রায়ে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ন্যায় বিচার লাভ করেননি। তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। এ বিচারে আইনী স্বচ্ছতা ছিল না। তাই এই রায়ে আমরা হতাশ, বিস্মিত ও বেদনাহত হয়েছি।

উল্লেখ্য, এর আগে কখনও বিএনপি যুদ্ধাপরাধের বিচারের কোন রায়ের পর প্রতিক্রিয়া জানায়নি। প্রতিটি রায়ের পরই রহস্যজনক কারণে দলটি নীরব ছিল। তবে ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির রায়ের এক দিন পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক সংবাদ সম্মেলনে বার বার প্রশ্ন করার পর বিএনপি বিস্মিত বলে মাত্র এক শব্দের একটি প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন । বুধবার সকালে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে সুপ্রীমকোর্টের আপিল বিভাগ ফাঁসির রায় বহাল রাখার পর প্রথমে কোন প্রতিক্রিয়া না জানালেও বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় বিএনপি।

বুধবার সকালেই প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপীল বিভাগের বেঞ্চ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি বহালের আদেশ দিয়ে রায় ঘোষণা করেন। রায়ের পর বিএনপি নেতারা আগের মতোই নীরব হয়ে পড়েন। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলেই এড়িয়ে যান তারা। তবে দুপুরের দিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার বিবিসি বাংলাকে এ বিষয়ে প্রথম প্রতিক্রিয়া দিয়ে বিএনপি হতাশ হয়েছে বলে জানান। এর পর বিকেল ৫টায় নয়াপল্টন বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের মুখপাত্র ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, এ রায়ে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ন্যায় বিচার লাভ করেননি। তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে রিপন বলেন, কোন ব্যক্তি যেন রাজনৈতিকভাবে প্রতিহিংসার শিকার না হন এবং অভিযুক্তরা যাতে ন্যায় বিচার পান তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্তদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো বা তাদের অপরাধের বিচারের ব্যাপারে বিএনপির অবস্থান শুরু থেকেই স্পষ্ট। আমরা সর্বদা এ বিচারের পক্ষে। আমরা শুরু থেকে বলে আসছি, এ বিচারের প্রক্রিয়া হতে হবে সকল রাজনৈতিক প্রভাব ও চাপমুক্ত পরিবেশে এবং স্বচ্ছ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদ-ের ওপর ভিত্তি করে। কোনভাবে যেন কোন ব্যক্তি রাজনৈতিকভাবে প্রতিহিংসার শিকার না হন এবং অভিযুক্তদের প্রতি যেন ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা হয়। এতদসত্ত্বেও আমরা লক্ষ্য করছি, এ বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার জন্য রাজনৈতিক চাপ অব্যাহত ছিল। তাসত্ত্বেও আমরা আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের প্রতি বরাবর আস্থা রেখে এসেছি।

আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এ দেশের একজন জনপ্রিয় ও বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ। তাকে ছয়বার জাতীয় সংসদে তার নির্বাচনী এলাকার জনগণ প্রতিনিধিত্ব করার জন্য ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি দেশ ও মানুষের কল্যাণে রাজনীতি করেছেন। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তার কণ্ঠ ছিল সুউচ্চ।

রিপন বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী যেসব অভিযোগ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনা হয়েছে, তিনি তার সংশ্লিষ্টতা সব সময় অস্বীকার করেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন তিনি যে দেশে ছিলেন না, এর স্বপক্ষে উপযুক্ত প্রমাণাদিও আদালতের বিবেচনায় উপস্থাপন করেছিলেন। ওই সময়ে দেশে তার অনুপস্থিতির দাবির স্বপক্ষে তিনি দেশের কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিককেও সাক্ষী মেনেছিলেন। কিন্তু বিষয়টি আমলে নেয়া হয়নি। তাসত্ত্বেও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী অভিযুক্ত হওয়ায় আমরা বিস্মিত।

রিপন বলেন, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবীদের মতো আমাদের দলও মনে করে, তিনি ন্যায় বিচার লাভ করেননি। অন্যায্যভাবে তাকে মৃত্যুদ-াদেশ দেয়া হয়েছে। আমরা এ রায়ে সংক্ষুব্ধ ও সত্যিই মর্মাহত। আমাদের দল মনে করে তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। আমাদের দল আরও মনে করে, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিচারে আইনী স্বচ্ছতার অভাব ও নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে।

বিএনপির মুখপাত্র বলেন, পৃথিবীর বহু দেশে অনেক দ-াদেশের পর পর্যালোচনায় এসেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে দেয়া রায় যেন ভবিষ্যতে যেন একটি ‘জুডিশিয়াল কিলিং’র ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত না হয় এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, সে জন্য প্রত্যাশা করব, এ রায়ের রিভিউ চলাকালে ভবিষ্যতে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ন্যায় বিচার থেকে যেন বঞ্চিত না হন।

রিপন বলেন, বিএনপি বরাবরই বিচার বিভাগের প্রাজ্ঞতা ও বিচক্ষণতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং তাদের কাছ থেকে রাজনৈতিক চাপের উর্ধে থেকে সুবিচার প্রত্যাশা করে। এ রায়ের বিরুদ্ধে দলীয় কোন কর্মসূচী আসছে কি? এমন প্রশ্নের জবাবে রিপন বলেন, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী রায়ের রিভিউ করার সুযোগ পাবেন। রায়ের রিভিউ চলবে, এরপর আমরা জানাব। এ ব্যাপারে এখন কোন কর্মসূচী দেয়া হচ্ছে না। বিএনপির গঠনতন্ত্রে আছে, দলের কেউ কলাবরেটর এ্যাক্ট অনুযায়ী দ-িত হলে তিনি সদস্য পদে থাকতে পারবেন না এমন একটি প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দল চলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী। তবে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিষয়টি এখনও বিচারাধীন।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার জিয়াউর রহমান খান, শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল কবির খোকন, যুব বিষয়ক সম্পাদক সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এ্যাডভোকেট আবদুস সালাম আজাদ, সহ-দফতর সম্পাদক আবদুল লতিফ জনি, শামীমুর রহমান শামীম, আসাদুল করিম শাহীন, মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজীজ উলফাত প্রমুখ।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টায় গুলশানে ভারতীয় হাইকমিশন থেকে বেরিয়ে এলে সাংবাদিকরা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে আপীল বিভাগের রায়ের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আজকে আমরা এখানে এসেছি ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে শোক জানাতে। আজ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর রায়ের বিষয়ে কোন কথা বলব না। একই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে একদমই চুপ ছিলেন বিএনপির আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে (অব.) মাহবুবুর রহমান। তিনি কোন জবাব না দিয়েই সেখান থেকে দ্রুত চলে যান।

তবে দুপুরের দিকে সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির রায় বহাল রাখার পর দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। বিবিসি বাংলাকে দেয়া রায়ের এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, রায়ে বিএনপি হতাশাগ্রস্ত, দুঃখিত ও মর্মাহত। তবে আমার বিশ্বাস যার ওপর ভিত্তি করে রায় হয়েছে রিভিউ করা হলে এ রায় টিকবে না। রিভিউ হলে সুপ্রীমকোর্টের বিজ্ঞ বিচারকরা হয়ত তাদের বিবেচনায় রায় পাল্টাতেও পারেন।

জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও একজন সোচ্চার কণ্ঠের কার্যকর বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন। দলের পক্ষ থেকে আমরা দুঃখিত।

ভারতীয় হাইকমিশনে শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেন বিএনপির ৩ নেতা : ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালামের মৃত্যুতে শোক জানাতে গুলশানে ভারতীয় হাইকমিশনে গিয়েছিলেন বিএনপির ৩ নেতা। বুধবার দুপুরে তারা সেখানে গিয়ে শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেন। তারা হলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, ড. আবদুল মঈন খান ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা সাবিহ উদ্দিন আহমেদ।

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া