২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মালয়েশিয়া শ্রমবাজার বন্ধ করে দিয়েছিল সাকার কারণেই

তৌহিদুর রহমান ॥ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর কারণেই মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার হারিয়েছিল বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক ইসলামিক সংস্থার (ওআইসি) মহাসচিব পদে সাকা চৌধুরীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘটনায় সে সময় মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনও শুরু হয়। পরবর্তীতে মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার সম্পর্ক উন্নত হয়। সে দেশের হারানো শ্রমবাজারও ফিরে পায় বাংলাদেশ। একাধিক কূটনৈতিক সূত্র এ তথ্য জানায়।

বিএনপি-জামায়াত জোট ২০০১ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর ওআইসির মহাসচিব পদে নির্বাচনের জন্য মনোনীত করা হয় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে। সে সময় মহাসচিব পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল তুরস্ক ও মালয়েশিয়া। দেশ দুটির পক্ষ থেকে প্রথমে বাংলাদেশের সমর্থন প্রত্যাশা করা হয়। তবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়, বাংলাদেশও ওআইসির মহাসচিব পদে লড়াই করবে। বাংলাদেশের এ ঘোষণার পর মালয়েশিয়া সরকার দুই দফা মহাসচিব পদ থেকে প্রত্যাহারের অনুরোধ জানায়। সে সময় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মাদ নিজে বাংলাদেশ সরকারকে এ বিষয়ে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তবে বাংলাদেশ সরকার মালয়েশিয়ার সেই অনুরোধ রক্ষা করেনি।

সাকা চৌধুরী ওআইসি মহাসচিব পদে লড়াই করার জন্য তিন বছর আগে থেকেই মাঠে নেমে পড়েন। তিনি নির্বাচনের জন্য দেশে দেশে লবিং চালান। এরপর ২০০৪ সালে সেই নির্বাচন হয়। সে সময় ওআইসি মহাসচিব পদে তুরস্ক জয়লাভ করে। ওই পদে তুরস্কের প্রার্থী একমেলেদ্দিন মেহমেদ জয়ী হন। হেরে যায় মালয়েশিয়াও। আর বাংলাদেশের মনোনীত প্রার্থী সাকা চৌধুরী তৃতীয় ও সর্বশেষ স্থান লাভ করেন। ওআইসির নির্বাচন কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়। মালয়েশিয়া বাংলাদেশের শ্রমবাজার বন্ধ করে দেয়। ২০০১ সালে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে ৪০ হাজার ৯৪১ শ্রমিক নেয়। তবে ওআইসি মহাসচিব পদে মালয়েশিয়াকে সমর্থন না দেয়ার কারণে নির্বাচনের আগেই শ্রমিক পাঠানো প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ২০০২ সালে মাত্র ৮৫ জন, ২০০৩ সালে ২৮ জন, ২০০৪ সালে ২২৪ জন শ্রমিক পাঠাতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। এছাড়া সে সময় বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্যও কমে যায়।

ওআইসির প্রথম মহাসচিব পদে নির্বাচিত হয়েছিল মালয়েশিয়া। টংকু আবদুর রহমান ছিলেন ওআইসির প্রথম মহাসচিব। ওআইসি মহাসচিব পদে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা ছিল বলেই তারা আবারও ওই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সহযোগিতাও চায় মালয়েশিয়া। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাদের সমর্থন দেয়া হয়নি।

এদিকে ওআইসি মহাসচিব পদে সাকা চৌধুরীকে মনোনীত করার বিষয়ে সে সময় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ করা হয়। আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ওআইসির মতো একটি বিশ্ববিখ্যাত সংগঠনে সাকা চৌধুরীর মতো একজন যুদ্ধাপরাধীকে যেন কোনভাবেই মনোনীত করা না হয়। তবে সে সময় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার কারও কথায় কান না দিয়ে সাকা চৌধুরীকেই ওই পদে মনোনীত করে।

ওআইসি মহাসচিব পদে জয়ী না হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল সাকা চৌধুরীর যুদ্ধাপরাধ। ওআইসি সদস্য দেশগুলোর মধ্যেও বিষয়টি প্রচার হয়। সে কারণে বিভিন্ন দেশ সাকা চৌধুরীকে তখন সমর্থন দেয়নি। তবে ওই নির্বাচনে জয়লাভের জন্য সাকা চৌধুরী বিশাল অংকের টাকা খরচ করেন বলে জানা যায়। এছাড়া সাকা চৌধুরীর পক্ষে তখন পাকিস্তানও কাজ করে। এতসব করার পরও তিনি ওআইসি মহাসচিব পদে জয়ী হতে পারেননি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, ওআইসির মতো একটি সংগঠনের মহাসচিব পদে জয়ী হতে হলে সেই ব্যক্তিকে ‘ক্লিন ইমেজের’ হতে হয়। যেটা সাকা চৌধুরীর ছিল না। তাই সাকা চৌধুরীর মতো একজন যুদ্ধাপরাধীকে ওই পদে মনোনীত করাটা ভুল ছিল। আর এসব ভুলের খেসারত দিতে হয় বিভিন্নভাবে। বাংলাদেশকেও সেই ভুলের খেসারত দিতে হয়েছে।

ওআইসির মহাসচিব পদে সাকা চৌধুরীকে মনোনীত করার ঘটনায় বিভিন্ন ব্যক্তি তাকে সমালোচনা করে আসছিলেন। তবে একবার তাকে এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তবে এ প্রেক্ষিতে সুরঞ্জিতের উদ্দেশে সাকা চৌধুরী বলেছিলেন, ‘বাবু ওআইসি নিয়ে কথা বলার কে? উনাকে ওআইসি নিয়ে কথা বলতে হলে আমি ছোটবেলায় যে জিনিসটা কেটে ফেলে দিয়েছি আগে ওই জিনিসটা কেটে ফেলতে হবে। তারপর বাবুকে ওআইসি নিয়ে কথা বলতে বলেন।’ এ বক্তব্য দেয়ার কারণে সারাদেশে সমালোচিত হন সাকা।

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালে বিভিন্ন অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় বুধবার সর্বোচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায়ে সাকা চৌধুরীর ফাঁসির আদেশ হয়েছে।

নির্বাচিত সংবাদ