২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাকার দণ্ড যেসব অভিযোগে

স্টাফ রিপোর্টার ॥ কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দায়ের করা ২৩টি অভিযোগের মধ্যে ৯টি প্রমাণিত হয়েছিলো ট্রাইব্যুনালে। আর এর মধ্যে হত্যা ও গণহত্যার চার অপরাধে তাকে দেয়া হয়েছিলো মৃত্যুদ-। তিনটি অপরাধে দেয়া হয়েছিলো ২০ বছর কারাদ-। আর ২ অপরাধে ট্রাইব্যুনাল তাকে পাঁচ বছর কারাদ- দিয়েছিলো। বুধবার সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগের দেয়া চূড়ান্ত রায়ে ২০ বছর কারাদ- হওয়া একটি অপরাধে খালাস দেয়া ছাড়া ট্রাইব্যুনালের রায়ই বহাল রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া ৩, ৫, ৬ ও ৮ নম্বর অভিযোগে সাকা চৌধুরীর মৃত্যুদ- বহাল রেখেছেন আপীল বিভাগ। ট্রাইব্যুনালে ২০ বছর কারাদ- হওয়া ২, ৪, ও ৭ নম্বর অভিযোগের মধ্যে ৭ নম্বরে সাকা চৌধুরীকে খালাস দিয়েছেন আপীল বিভাগ। ২ ও ৪ নম্বর অভিযোগে সাকা চৌধুরীর ২০ বছর কারাদ- বহাল রাখা হয়েছে রায়ে। এছাড়া ট্রাইব্যুনালে পাঁচ বছর কারাদ- হওয়া ১৭ ও ১৮ নম্বর অভিযোগেও ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল রেখেছেন আপীল বিভাগ।

মৃত্যুদ- বহাল থাকা অভিযোগ ॥ অভিযোগ ৩ : ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে রাউজানের গহিরা এলাকায় কু-েশ্বরী ঔষধালয়ের মালিক নূতন চন্দ্র সিংহের বাড়ি ঘিরে ফেলা হয়। সালাউদ্দিন কাদেরের উপস্থিতিতে প্রার্থনারত অবস্থা থেকে নূতন চন্দ্রকে টেনে বাইরে নিয়ে আসা হয়। সালাউদ্দিন কাদেরের নির্দেশে পাকিস্তানী সেনারা নূতন চন্দ্রের ওপর গুলি চালানোর পর তার মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য তাকে গুলি করেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী।

এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন।

অভিযোগ ৫ : ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল দুপুর ১টার দিকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তার সহযোগীরা পথ দেখিয়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে রাউজানের সুলতানপুর গ্রামের হিন্দুবসতিপূর্ণ বণিকপাড়ায় নিয়ে যান। সেখানে হিন্দুদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হলে নেপাল চন্দ্র ধর, মণীন্দ্র লাল ধর, উপেন্দ্র লাল ধর ও অনীল বরণ ধর নিহত হয়। পরে বিভিন্ন বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়। ঘটনার সময় লুকিয়ে থাকা সনাতন বিশ্বাস ও তার পরিবার পরে পালিয়ে ভারতে চলে যান। এ ঘটনায় আনা গণহত্যা ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে বলে আপীল বিভাগের রায়ে বলা হয়।

অভিযোগ ৬ : ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল বিকেল ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে রাউজানের হিন্দু বসতি ঊনসত্তরপাড়া গ্রামে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় সালাউদ্দিন কাদের ও তার কয়েকজন সহযোগী। মিটিংয়ে যোগ দেয়ার কথা বলে গ্রামের ক্ষিতিশ মহাজনের পুকুরপাড়ে নিয়ে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের ওপর ব্রাশফায়ার করে ৭০ জনকে হত্যা করা হয়। এদের মধ্যে চন্দ্র কুমার পাল, গোপাল মালী, সন্তোষ মালী, বলরাম মালীসহ ৫০ জনের পরিচয় জানা গেলেও বাকিদের পরিচয় পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় জানুতি বালা পাল কোমরে গুলিবিদ্ধ হলেও বেঁচে যান। বেঁচে যাওয়া আরও অনেক হিন্দু পরিবারসহ পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এ ঘটনায় গণহত্যা, দেশান্তরে বাধ্যসহ তিনটি অভিযোগ আনা হয় সালাউদ্দিন কাদেরের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ ৮ : ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বেলা ১১টার দিকে চট্টগ্রামের হাটহাজারী এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজাফফর তার পরিবারসহ রাউজান থেকে চট্টগ্রাম শহরে আসার পথে হাটহাজারীর তিন রাস্তার মোড় এলাকায় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে ও সহযোগিতায় শেখ মুজাফফর ও তার ছেলে শেখ আলমগীরকে তাদের প্রাইভেটকার থেকে নামিয়ে হাটহাজারী বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপরে বিভিন্ন সময়ে তাদের মুক্তির জন্য সালাউদ্দিন কাদেরের বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা দু’জন কখনও ফিরে আসেনি। পরে তাদের দুজনকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় সালাউদ্দিন কাদেরের বিরুদ্ধে শেখ মুজাফফর ও শেখ আলমগীরকে অপহরণ ও হত্যায় সহযোগিতার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনাল জানিয়েছে। এ অভিযোগে আপীল বিভাগ ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদ- বহাল রেখেছে।

২০ বছর কারাদ- যেসব অভিযোগে ॥ অভিযোগ ২ : ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল ভোর সাড়ে ৬টা থেকে ৮টার মধ্যে রাউজানের মধ্যগহিরা হিন্দুপাড়ায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামটি ঘিরে ফেলে। পরে ডাঃ মাখনলাল শর্মার বাড়ির আঙিনায় নিরস্ত্র হিন্দুদের একত্রিত করে সালাউদ্দিন কাদেরের উপস্থিতিতেই পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের নির্বিচারে গুলি করে। এ ঘটনায় পঞ্চবালা শর্মা, সুনীল শর্মা, জ্যেতিলাল শর্মা ও দুলাল শর্মা ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। ডাঃ মাখনলাল শর্মা ঘটনার তিন-চারদিন পর মারা যান। জয়ন্ত কুমার শর্মা গুরুতর আহত হন এবং পরবর্তীতে প্রতিবন্ধী হয়ে যান। এ ঘটনায় গণহত্যা, এর পরিকল্পনা ও সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয় ফটিকছড়ির এ সাংসদের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ ৪ : ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীসহ রাউজানের জগৎমল্লপাড়ায় যান সালাউদ্দিন কাদের। ওই দিন সকালবেলায় সালাউদ্দিনের অন্য দুই সহযোগীকে ওই গ্রামে পাঠিয়ে একটি মিটিংয়ে যোগ দেয়ার জন্য বলা হয় গ্রামের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের। পরে গ্রামটি ঘিরে ফেলে কিরণ বিকাশ চৌধুরীর বাড়ির আঙিনায় জমায়েত হওয়া হিন্দুদের ওপর নির্বচারে গুলি চালানো হলে তেজেন্দ্র লাল নন্দী, সমীর কান্তি চৌধুরী, অশোক চৌধুরীসহ ৩২ জন নিহত হন। এছাড়া অমলেন্দ্র বিকাশ চৌধুরী, জ্যোৎস্না বালা চৌধুরী ও ছবি রাণী দাস গুরুতর আহত হন। এরা প্রত্যেকে পরে ভারতে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেন। এরপর গ্রামের বিভিন্ন বাড়িঘর লুটপাট করা হয় এবং আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। এ ঘটনায় সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে পরিকল্পনা, সহযোগিতা, গণহত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও দেশান্তরে বাধ্য করার অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এ অভিযোগে আপীল বিভাগেরও একই মত।

৫ বছর কারাদ- যেসব অভিযোগে ॥ অভিযোগ ১৭ : ১৯৭১ সালের ৫ জুলাই সন্ধ্যা ৭টাÑসাড়ে ৭টার দিকে কয়েকজন সহযোগী ও পাকিস্তানী সেনাকে নিয়ে কোতোয়ালি থানার হাজারী লেনে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর বাড়ি থেকে নাজিমুদ্দিন আহমেদ, সিরাজ, ওয়াহিদ ওরফে জানু পাগলাকে অপহরণ করা হয়। তাদেরকে গুডস হিলে নিয়ে নির্যাতন ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে এক সময় ওয়াহিদ ওরফে জানুকে ছেড়ে দেয়া হয়। তবে নাজিমুদ্দিন ও সিরাজকে স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত আটকে রাখা হয়। এ ঘটনায় অপহরণ, আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে সালাউদ্দিন কাদেরের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ ১৮ : ১৯৭১ সালের জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহে একদিন ভোর সাড়ে ৫টার দিকে চাঁদগাঁও থানাধীন মোহরা গ্রামের মোঃ সালাহউদ্দিনকে তার বাড়ি থেকে অপহরণ করে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর একটি গাড়িতে করে গুডস হিলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে সালাউদ্দিন কাদেরের উপস্থিতিতে আটকে রেখে নির্যাতন করে পাকিস্তানী সেনারা। পরে তাকে হত্যার জন্য নিয়ে যাওয়া হলেও মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। এ ঘটনায় সালাউদ্দিন কাদেরের বিরুদ্ধে অপহরণ, আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে।