৩০ জুলাই ২০১৫

সাকার দণ্ড কার্যকরে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পাওয়ার অপেক্ষা

স্টাফ রিপোর্টার ॥ সুপ্রীমকোর্টের চূড়ান্ত রায়ে সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর ফাঁসির রায় বহাল থাকায় এবার তার দণ্ড কার্যকরে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পাওয়ার অপেক্ষা শুরু হলো। বুধবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহার নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপীল বেঞ্চ এই সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করেন। রায়ের পর রাষ্ট্র ও আসামি- দুই পক্ষই পূর্ণাঙ্গ অনুলিপির জন্য তাদের অপেক্ষার কথা জানিয়েছেন।

ওই অনুলিপি হাতে পাওয়ার পর আসামি রায় পর্যালোচনার আবেদন করতে পারবেন। তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষারও সুযোগ পাবেন। দুটোই নাকচ হয়ে গেলে সরকার দ- কার্যকরের ব্যবস্থা নেবে। যুদ্ধাপরাধী দুই জামায়াত নেতা কাদের মোল্লা ও মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের রায় বাস্তবায়নের আগে পালিত প্রক্রিয়াগুলো এক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হিসেবে থাকছে।

রায়ের পর সাকা চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, আমার বাবা একজন নির্দোষ ব্যক্তি। আশা করি এই বিষয়টা একদিন না একদিন প্রমাণিত হবে। আর আসামির আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, তারা এই রায়ে সন্তুষ্ট নন। রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পেলে ‘অবশ্যই’ রিভিউ আবেদন করবেন। চট্টগ্রাম থেকে সাকা চৌধুরীর ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার প্রসঙ্গে টেনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই নেতাকে ‘নির্দোষ’ বলেন বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা খন্দকার মাহবুব।

অন্যদিকে এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ফুলন দেবীও নির্বাচিত হয়েছিলেন। নির্বাচিত হওয়া কারও ‘অপরাধ না করার’ প্রমাণ নয়। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে সাকা চৌধুরী ‘এখন অপরাধী’ বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, রায়ের পূর্ণ অনুলিপি পেলে তারা চাইলে রিভিউ করতে পারেন। রিভিউয়ের সুযোগ রয়েছে, তবে আমার মনে হয় না, এর মাধ্যমে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হবেন। কারণ রিভিউ আপীলের সমকক্ষ নয়। এটাতে কেবল বড় কোন ভুল হলে সেটা ধরিয়ে দেয়া যেতে পারে।

কাদের মোল্লা ও কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর হয় যেভাবে

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ফাঁসিতে ঝোলানো হয় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লাকে। ওই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর কাদের মোল্লার চূড়ান্ত রায় দেয় আপীল বিভাগ, যাতে ৪ : ১ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় আসামিকে মৃত্যু পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকর করতে বলা হয়।

এর প্রায় আড়াই মাস পর ৫ ডিসেম্বর ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করে আপীল বিভাগ। অনুলিপি পাওয়ার পর ৮ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে। দুই পৃষ্ঠার ওই ‘মৃত্যু পরোয়ানা’ খামে ভরে লাল সালুতে মুড়ে ৭৯০ পৃষ্ঠার নথিসহ পাঠানো হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। ১০ ডিসেম্বর রাত ১২টা ১ মিনিটে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হবে বলে কারা কর্তৃপক্ষ জানালেও আসামিপক্ষের আবেদনে সুপ্রীমকোর্টের চেম্বার জজ রাতে এক আকস্মিক আদেশে তা স্থগিত করে দেন। ওই রাতেই কাদের মোল্লার পক্ষে তার আইনজীবীরা দুটি আবেদন করেন। এর একটিতে রায় পুনর্বিবেচনা আবেদন করা হয় এবং দ্বিতীয় আবেদনে রায় পুনর্বিবেচনা করে কাদের মোল্লার খালাস চাওয়া হয়। এরপর ১১ ও ১২ ডিসেম্বর আসামিপক্ষের আবেদনের শুনানি করে তা নাকচ করে দেয় প্রধান বিচারপতি নেতৃত্বাধীন আপীল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ। ১২ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে কাদের মোল্লার সঙ্গে দেখা করেন পরিবারের সদস্যরা। ওই রাতে ১০টা ১ মিনিটে এই যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

যুদ্ধাপরাধের মামলায় ‘রিভিউয়ের সুযোগ’ রয়েছে কি-না, সেই প্রশ্ন সামনে আসে কাদের মোল্লার চূড়ান্ত রায়ের পর। গত বছরের ৩ নবেম্বর আপীল বিভাগ কামারুজ্জামানের মামলা নিষ্পত্তি করে ট্রাইব্যুনালের দেয়া ফাঁসির রায় বহাল রাখলে আবার ফিরে আসে সেই আলোচনা।

এর মধ্যেই ২৫ নবেম্বর কাদের মোল্লার রিভিউ আবেদনের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করে আপীল বিভাগ। যুদ্ধাপরাধের মামলাতেও সর্বোচ্চ আদালতের দেয়া রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) জন্য আবেদন করা যাবে বলে সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ জানায়। এতে বলা হয়, আসামি ও রাষ্ট্র- দুপক্ষই ১৫ দিনের মধ্যে রায় পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করতে পারবে। তবে রায়ের নির্ভরযোগ্যতায় ‘খাদ আছে’ বা ‘বিচার-বিভ্রাটের’ আশঙ্কা আছে বলে মনে করলেই আদালত তা পুনর্বিবেচনার জন্য গ্রহণ করবে। ওই রায়ে বলা হয়, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনে দ-িতদের ক্ষেত্রেও আপীলের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন গ্রহণযোগ্য (মেনটেইনেবল) হবে। তবে তা আপীলের সমকক্ষ হবে না।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি আপীল বিভাগ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদ- বহাল রাখার রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করলে ট্রাইব্যুনাল পরদিন মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে। তার আইনজীবীরা ৫ মার্চ রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করলে ৬ এপ্রিল আপীল বিভাগ তা খারিজ করে দেয়। রায়ে বিচারকদের স্বাক্ষরের পর ৮ এপ্রিল তা আসামি কামারুজ্জামানকে পড়ে শোনানো হয়। রিভিউ আবেদন খারিজের পর প্রাণভিক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আইনজীবীদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান এই যুদ্ধাপরাধী। কিন্তু আসামি প্রাণভিক্ষার জন্য কত সময় পাবেন এবং কতদিনের মধ্যে তার নিষ্পত্তি হবে সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনে সুনির্দিষ্ট কোন সময় বেঁধে দেয়া না থাকায় কামারুজ্জামানের ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা তৈরি হয়।

কাদের মোল্লার রিভিউ খারিজের রায়ে আপীল বিভাগ বলেছিল, যুদ্ধাপরাধ মামলায় মৃত্যুদ- কার্যকরের আগে আসামি সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার সুযোগ পাবেন। তবে প্রাণভিক্ষার জন্য কারাবিধিতে বেঁধে দেয়া ৭ থেকে ২১ দিনের সময়সীমা এ মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। আসামি প্রাণভিক্ষা চাইলে তার নিষ্পত্তির আগে দ- কার্যকর করা যাবে না। কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, তিনি প্রাণভিক্ষার সুযোগ নেননি। এ কারণে রিভিউ খারিজের দিনই তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছিল। কিন্তু কামারুজ্জামান সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য কয়েক দফা সময় নিলে জটিলতা দেখা দেয়। পরে রিভিউ খারিজের পাঁচ দিনের মাথায় গত ১১ এপ্রিল বিকেলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানান, যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত মুহাম্মদ কামারুজ্জামান রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে চাননি। ওই সন্ধ্যায় আবারও কামারুজ্জামানের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের দেখা করতে দেয়া হয়। রাত ১০টার পর দ্বিতীয় যুদ্ধাপরাধী হিসেবে এই জামায়াত নেতার মৃত্যুদ- কার্যকর করে কারা কর্তৃপক্ষ।