২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আমাদেরও স্বপ্ন আছে ...

  • সাদিয়া তাবাস্সুম বৃষ্টি

আজ থেকে অনেক বছর পেছনের দিকে যদি ফিরে তাকাই তবে স্পষ্টতই নারী সমাজের এক করুণ দৃশ্য কল্পনা করা যায়। আইয়ামে জাহেলিয়ার যুগে একটি কন্যাসন্তানকে এতটাই বোঝা হিসেবে গণ্য করা হতো যে জীবন্ত কবর দেয়ার প্রথাও চালু ছিল। সেই অন্ধকার প্রথাকে পেছনের ফেলে বহু বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে আসতে হয়েছে আজকের এ যুগে। প্রতিষ্ঠিত করতে হয়েছে নারী অধিকার। বহু বিপ্লবী নারীর আত্মত্যাগে নারীসমাজ খুঁজে পেয়েছে এক আলোকিত পথের দিশা। তবে অনুশোচনার জায়গা আজও থেকে গেছে। কারণ আজকের এ সমাজ সভ্যতার কিছুসংখ্যক মানুষ একজন নারীকে নিছকই মেয়েছেলে বলে যায়। আর এ কুৎসিত মানসিকতার কারণেই বাংলাদেশের মতো এতটা উন্নয়নশীল দেশ থেকেও বাল্যবিয়ের বিষবৃক্ষকে নিধন করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। বাল্যবিয়ের করাল ছোবলে আজও বাংলাদেশের অসংখ্য কন্যাশিশুকে গ্রাস করছে। জাতিসংঘের রীতিতে ১৮ বছরের নিচে সবাইকে শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়Ñ এ কথা জানা আছে প্রায় সবার। তবে আজও বহু প্রত্যন্ত অঞ্চলে কন্যাশিশুদের নিছকই বোঝা ভেবে অথবা অর্থহীন সব কারণ দেখিয়ে ঠেলে দেয়া হচ্ছে এক অন্ধগলির দিকে। এ বাল্যবিয়ের ক্ষতির ভার যে কেবল একজন কন্যাশিশুকেই বহন করতে হয় তা নয়, পুরো পরিবারকেই এর জন্য পদে পদে ঠকতে হয়। আর সেই পরিবারটি দ্বারা এক অশুভ ছায়া পড়ে পুরো সমাজের ওপরই। যে একটি মাত্র ভুল থেকে এত কিছুর সূত্রপাত, আমরা শুধু সে বিষয়টিকে নিয়ে আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকি। তবে যে যার দৃষ্টিকোণ থেকে এ বাল্যবিয়ের ক্ষতিগুলোকে শনাক্ত করাই আমাদের শেষ দায়িত্ব নয়। সমাজের প্রতিটি মানুষকে এ বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে প্রতিটি পদে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতেই হবে। যেসব মানুষ আজকের এ যুগে দাঁড়িয়েও এই অন্যায় সাধন করছে তাদের কাছে এ বার্তা পৌঁছে দিতে হবে যে, আমরা পৃথিবীর এমন একটি দেশে থাকি যে দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একজন নারী, বিরোধী দলীয় নেতা একজন নারী, সংসদ স্পীকার ও সংসদ উপনেতাও নারী।

বাংলাদেশের নারীদূত যদি কারও কথা বলতে হয় তবে যে মানুষটির কথা বলব তিনি হলেন ‘বেগম রোকেয়া’। আজ থেকে প্রায় দেড় শ’ বছর আগের এক ভয়ানক অন্ধকারের যুগে দাঁড়িয়েও তিনি জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করেছিলেন পুরো সমাজকে। পরিবার থেকে সেই যুগে তাকে বিয়ে দিলেও তিনি হাজারও প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে পড়ালেখা চালিয়ে গেছেন। জ্ঞানের আলোর মশাল জ্বেলে তৈরি করেছিলেন এক সভ্যসমাজ। অথচ এতগুলো বছর পেরিয়েও আমরা সে মশালের আলো গ্রহণ করতে পারছি না। পৃথিবী যখন ক্রমশই এগিয়ে চলছে সামনের দিকে তখন আমরা হাঁটছি পেছনের দিকে। লেখাপড়ার এত সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও অল্পবয়সী কন্যাশিশুদের বিয়ের পিঁড়িতে বসানো হচ্ছে। যেসময় একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে নির্মাণ করার সঠিক সময়, যেসময়ে প্রতিটি মেয়ের চোখে থাকবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন, যখন একটি মেয়ের হাতে থাকবে বই, খাতা ও কলম, ঠিক সেই সময় তার হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে একটি নতুন জীবনের চাবি, চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে সংসারের বোঝা। এ বোঝা শুধু ওই কন্যাশিশুটির নয়; পরিবার, সমাজ তথা সারাদেশের। যদি আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে বলতে পারি এখনই বিয়ে নয়, তবেই সমাজ থেকে বাল্যবিয়ের বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলা সম্ভব হবে। তাই পরিশেষে আমি সেসব কন্যাশিশুর পক্ষ থেকে সবাইকে তীব্রকণ্ঠে একটি কথাই বলতে চাই- ‘এখনই বিয়ে নয়, আমাদেরও কিছু স্বপ্ন আছে’।

দেওয়ানপাড়া, জামালপুর থেকে