২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাকার ফাঁসি বহাল

আরও এক যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির আদেশ বহাল রেখেছে আদালত। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পটুয়া কামরুল হাসান অঙ্কিত পোস্টারে ইয়াহিয়া খানের পশুসুলভ অবয়বের নিচে লেখা ছিল ‘ওরা মানুষ হত্যা করছে, আসুন আমরা জানোয়ার হত্যা করি।’ যুদ্ধশেষে বিজয়ের লগ্নে জানোয়াররা পালিয়ে গিয়েছিল। অথচ নয় মাসজুড়ে ওরা ছিল দ-মু-ের হর্তাকর্তা, গণহত্যাকারী। নির্মমভাবে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগেও লিপ্ত ছিল এই জানোয়াররা। সেই নরঘাতক মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে স্বাধীনতার চার দশক পর। ইতিহাস তাদের যেমন ক্ষমা করেনি, জাতি হিসেবে বাঙালীও করেনি। ইতিহাসের দায় মেটাতে হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে। সর্বোচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায়েও যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া সাজা বহাল থাকায় মুক্তিযুদ্ধকালে চট্টগ্রামের ত্রাস সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীকে ফাঁসিকাষ্ঠেই যেতে হবে। এর মধ্য দিয়ে কেবল চট্টগ্রামের স্বজন ও সম্ভ্রমহারা মানুষ তাদের ওপর সংঘটিত ইতিহাসের জঘন্যতম অপরাধের ন্যায়বিচার পেল তা নয়, খোদ রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিও জোরালো হলো। ঔদ্ধত্যের ও অশালীনতার প্রতিমূর্তি এবং অন্যের প্রতি অবজ্ঞাই যার আচরণের সারবত্তা, সেই সাকা চৌধুরীর বিচার ও মৃত্যুদ-াদেশ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বুড়ো আঙ্গুল দেখানো যার স্বভাব, ফাঁসির আদেশের পরও তার আচরণে কোন গুণগত পরিবর্তন দেখেনি আদালত। মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তি পাকিস্তানের সঙ্গে মতাদর্শিক ঘনিষ্ঠতা, মধ্যপ্রাচ্যের কিছু প্রভাবশালী রাষ্ট্রে বিশেষ গম্যতা, চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভোটব্যাংক এবং ব্যবসা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পারিবারিক প্রভাব বিবেচনায় এই আশঙ্কা বহুদিন বিদ্যমান ছিল যে, তাকে বিচারের কাঠগড়ায় তোলা ও দ- প্রদান কঠিন হবে। কিন্তু সেসব নেতিবাচক অনুমান এই রায়ের মধ্য দিয়ে ভুল প্রমাণ হয়েছে। এটাও এখন স্বীকার্য যে, আইনের উচ্চতার কাছে যে কোন প্রতিবন্ধকই খাটো হতে বাধ্য।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া সাজা বহাল থাকায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল মানুষ এবং একাত্তরে ক্ষতিগ্রস্তদের স্বজন-পরিজন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। তারা আনন্দ-উল্লাস করছেন। বস্তুত এ রায় শুধু একটি মামলার গতানুগতিক বিচারিক ফল ঘোষণা নয়, এ যেন এক কলঙ্কিত ইতিহাসের সত্য উদ্ঘাটন। হানাদার বাহিনীর দোসর হয়ে সাকা চৌধুরী ও তার পিতা ফজলুল কাদের (ফকা) চৌধুরীর মতো স্বাধীনতাবিরোধীরা বাঙালী নিধনে ছিল মত্ত। তাদের চট্টগ্রামের বাসভবন ‘গুডসহিল’ তখন ভয়াবহ টর্চার সেল হিসেবে কুখ্যাতি অর্জন করে। সাক্ষীরা আদালতে যে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন তা যেমন লোমহর্ষক তেমনি আতঙ্কজনক। এক মূর্তিমান দোর্দ-প্রতাপশালী খলনায়কের মতো সে মুক্তিকামী মানুষ, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সামনে আবির্ভূত হয় মুক্তিযুদ্ধকালে। সঙ্গে তার সাঙ্গোপাঙ্গসহ ঘাতক দল। অজাতশত্রু, সমাজসেবক ও মানবতাবাদী চিকিৎসক অধ্যক্ষ নূতন চন্দ্র সিংহকে প্রার্থনারত অবস্থায় মন্দির থেকে টেনেহেঁচড়ে বাইরে এনে গুলি করে হত্যা, একই দিন রাউজানে দুটি গ্রামে শতাধিক নারী-পুরুষকে হত্যা, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মোজাফ্্্ফর ও তাঁর পুত্রকে অপহরণ করে খুন করার মতো ঘৃণ্য কাজ করেছে সে। ২৩টি অভিযোগের মধ্যে ৪টি অভিযোগে ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর ফাঁসির রায় দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ১ বছর ৯ মাস পর আপিলের রায়ে অভিযোগের ৪টিতেই সর্বোচ্চ সাজা বহাল রাখা হয়। অন্য অভিযোগগুলোতেও কারাদ- দেয়া হয়েছে। এখন বাকি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর রায় কার্যকর হবে।

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধ ইতিহাসের কলঙ্ক। এর সঙ্গে জড়িতদের বিচারের মাধ্যমে সেই কলঙ্ক থেকে মুক্তি মিলবে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোর পথে দেশ এগিয়ে যাবে এমনটাই আশা। সাকার ফাঁসির রায় সেই পথের আরেকটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।