২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পদ্মপাতার জল ॥ এক বাইজির প্রেমের উপাখ্যান রাজীদ সিজন

ঊনবিংশ শতাব্দীর এক জমিদার পুত্রের প্রেমলীলা পদ্মপাতার জল চলচ্চিত্রটিতে রূপায়িত হয়েছে। রিজোয়ান নামের সেই জমিদার পুত্র তার নিজ বাড়ি থেকে দূরের এক শহরের কলেজে পড়তে এসে ফুলেশ্বরী নামের এক বাইজির প্রেমে নিমজ্জিত হতে থাকে! একপর্যায়ে রিজোয়ান তার পড়াশোনা, ক্লাস, পরিবার তথা তার জগত-সংসারের কথা ভুলে উচ্চমূল্যে দিনের পর দিন বাইজি মহলে দিনযাপন করতে থাকে। অবশেষে প্রেম তাদের দু’জনের জীবনেই এক ভিন্ন পরিণতি নিয়ে হাজির হয়। গল্পের বয়ানে উঠে আসে সে সময়কার সামাজিক রীতি-প্রথা, আসবাব, পোশাক-আশাক, যানবাহন এমনকি মুদ্রাও।

কথিত আছে, সম্রাট জাহাঙ্গীরও ঢাকার রাজনর্তকীদের মুঘল শাহী দরবারে নাচিয়েছিলেন! সুলতান, রাজা, জমিদার ও নবাবদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাইজি মহল প্রতিষ্ঠা পেতে থাকে। রঙ্গমহলে নাচে-গানে মুজরোয় বৈচিত্র্যময় এক জীবন অতিবাহিত করেছে সেসব বাইজি। যাদের অধিকাংশই পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিল। তাই হয়ত স্বাধীনতার তৃপ্তি পেতে এরা সত্যি প্রেমের সন্ধানে থাকত। কারণ হয়ত কেউ এদের অর্ধাঙ্গীনি করার সাহস বা ইচ্ছা করত না। এরা শুধু জমজমাট মাহফিল জমিয়ে বা অন্যান্য উপায়ে উচ্চশ্রেণীর মনোরঞ্জন করত। রঙ্গমহলে থেকেও সমাজের মূল স্রোতের বাইরে একরকম প্রান্তিক সীমানায় যেন আবদ্ধ ছিল এসব বাইজি। তাই এদের সাজসজ্জা ও ভারি পোশাক-গহনার ভেতরে লুকিয়ে থাকা আর্তনাদকে অনেক লেখক, সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা তাদের শিল্পকর্মে উপজীব্য করেছেন কালে কালে। বাইজি কেন্দ্রিক বহু চলচ্চিত্র ভারতে বিভিন্ন দশকে তৈরি হয়েছে। সে ক্ষেত্রে পদ্মপাতার জল বাংলাদেশে বাইজি কেন্দ্রিক চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপটে পুরোনো কিছু নয়। সব বাইজি ঘরানার চলচ্চিত্রের মতো এটিও সেরকম প্রথাগত একটি চলচ্চিত্র যেখানে এক বাইজি পরাধীনতার নদী সাচ্চা প্রেম নৌকায় পার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। বলিউডের ‘পাকিজাহ’ (১৯৭২) চলচ্চিত্রে এক বন কর্মকর্তা এক বাইজির প্রেমে পড়ে, ‘উমরাও জান’ (১৯৮১) চলচ্চিত্রে এক তরুণ নবাবও এক বাইজির প্রেমে পড়ে! প্রেম উদ্যানে তাদের করুণ পরিণতিও সেসব চলচ্চিত্র দেখিয়েছে। তাই বলে ‘উমরাও জান’ আর ‘পাকিজাহ’ এক এমন কিছু নয়। তবে আমাদের তথাকথিত বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের প্রথা অনুযায়ী চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গেলেই সবকিছুতেই তরুণ হৃদয়ঘটিত প্রেমের উপস্থিতি যুক্ত করতেই হয়! তবে বাইজি ঘরানার চলচ্চিত্রের মধ্যে শ্যাম বেনেগালের ‘মান্ডি’ (১৯৮৩) হয়ত এসব স্টেরিওটাইপের বাইরে ছিল। তার মানে এই নয় যে পদ্মপাতার জল বাইজি প্রেম উপাখ্যান প্রদর্শন করে মহাভারত অশুদ্ধ করে ফেলেছে! তবে দর্শক হিসেবে যখন সিনেমা দেখতে যাই তখন সবসময় আশা থাকে যে নতুন কোন উপাখ্যান দেখব। বোধ হয় এ চলচ্চিত্রের মধ্যে একমাত্র এর সংলাপই এর বৈশিষ্ট্যকে এক অনন্য মাত্রা প্রদান করেছে। সুন্দর কবিতা ও যথার্থ সংলাপ কাহিনী উপযোগী হয়েছে এবং চলচ্চিত্রে গল্পের গোড়াপত্তনে কিছু রসবোধপূর্ণ সংলাপ ও দৃশ্যও খুব আকর্ষণীয় ঠেকেছে।

চলচ্চিত্রের গল্প হোক পরিচিত বা টিপিক্যাল তবে এর বয়ান উপস্থাপন যদি ভিন্ন হয় সে ক্ষেত্রে এটা অনেকটা নতুনত্ব লাভ করে। যদিও পদ্মপাতার জলের ন্যারেটিভ সেভাবে উপস্থাপিত হয়নি।

চলচ্চিত্র যতই বাস্তবতাকে উপস্থাপন করুক না কেন, সেটা কখনও বাস্তবতা না! সেটা হতে পারে বাস্তব সত্য ঘটনা, তবে তা চলচ্চিত্রের বাস্তবতায় উপস্থাপিত হয়। তার মানে এই নয় যে সেটা সবসময় কল্পচিত্র! তবে চলচ্চিত্র যে কল্পচিত্রও উপস্থাপন করে না এমনও নয়। তবে কল্পচিত্র উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও ঠিক আমাদের জানা বাস্তবতা এবং যৌক্তিকতার নিরিখেই কিন্তু সে কল্পনাকে চলচ্চিত্রের ভাষায় এবং বাস্তবতায় নির্মাণ করা হয়। সেরকম পদ্মপাতার জল কোন বাস্তব গল্পের আখ্যান নয়, তবে একটা অঞ্চলের একটা সময় ও সামাজিক বাস্তবতার কল্পচিত্র মাত্র। তাই সেই সময় ও সমাজকে চিত্রায়িত করতে প্রয়োজন যজ্ঞের আয়োজন। সেই আয়োজনে যদি বিচ্যুতি ঘটে, তবে সেটা তখন অবিশ্বাস্য হয়ে ওঠে। এই চলচ্চিত্রে পোশাক নির্বাচনে সেরকম সতর্কতা কেন অবলম্বন করা হয়নি তাই বোধ্যগম্য নয়। গানের দৃশ্য আসলেই পোশাক-পরিচ্ছদ উনবিংশ শতকের বলে মনে হয় না! তার ওপর ফুলেশ্বরীর চুলের স্টাইল আরও ভয়ঙ্কর! উনবিংশ শতকের একটা বাই-এর চুল হালকা লালচে রঙ করা! তবে সেটা মেহেদির রঙও নয়! বর্তমানে চুলে রঙের যে স্টাইল সেটাই প্রতীয়মান হলো! মনে হয় বিদ্যা সিনহা মিমের চুলের ধরন, স্টাইল করে লাগানো রঙ কিছুই পরিবর্তন করা হয়নি! পোশাক-পরিচ্ছদ ও সমসাময়ীক চুলের স্টাইল, সংলাপ প্রক্ষেপণে ও বডি ল্যাংগুয়েজের ধরন দেখে মাঝে মধ্যে বিভ্রান্ত হয়েছি যে, অন্তত এটা শ’ খানেক বছর আগের গল্পের বয়ান হচ্ছে নাকি সমসাময়িক!

তবে রঙ্গমহলের মুজরোর আয়োজনে শিল্প নির্দেশক যথার্থ প্রচেষ্টা করেছেন বাইজি মহল ও এর আবহের সৃষ্টিতে। তথাপি পরিচালকের মাথায় রাখার দরকার ছিল কিছু সরাইয়ের পানপাত্র, হাতের আংটি, রঙিন পর্দা-আলপনা, গহনা ও পুরোনো জমিদার ভবন দেখালেই সেটা উনবিংশ শতাব্দির বাংলা মনে হবে এমন নয়! সর্বোপরি ধারাবাহিকতা রক্ষাও সে ক্ষেত্রে একান্ত প্রয়োজনীয়। ঔপনিবেশিক আমলের বাংলার গল্প নির্মাণে পরিচালক যথার্থ লোকেশন ও অনেক বহির্দৃশ্য দেখালেও কোন ইংরেজ-ফিরিঙ্গিকে কোন ফ্রেমে দেখা যায়নি! তার ওপর ফুলেশ্বরীর এক সহকর্মী বাইজি রেজোয়ান ও ফুলেশ্বরীকে তার ঘরে আশ্রয় দেয়ার পরে বলে ‘এত বছর অন্যের জন্য গেয়েছি এবং নেচেছি! আজ নিজেদের জন্য গাইব ও নাচব’। সে সংলাপ শুনে মনে হলো কোন ধ্রুপদ নাচ-গানের মুজরো দেখতে পাব। কিন্তু বলিউড সিনেমার মতো মডার্ন কোরাস ডান্স দেখে হতবিহ্বল হলাম! পরিচালক বলিউডের সিনেমার ও টিভি সিরিয়ালের প্রতি যে অতিভক্ত তা এই চলচ্চিত্রটি দেখলেই বোঝা যায়! বিশেষত ঘরের ভেতরের দৃশ্যগুলোর ক্যামেরার মোশন ভারতীয় টিভি সিরিয়ালের আদলে! যদিও এই চলচ্চিত্রে মাহফুজুর রহমান খান চিত্রগ্রাহক হিসেবে তার সর্বোচ্চ দিয়েছেন। ছোট দৃশ্যে বড় সাহেব হিসেবে শহীদুজ্জামান সেলিমের অভিনয় পর্দা কাঁপিয়েছে। যদিও একটি দৃশ্যে পরিচালক খেয়াল না করার কারণেই হয়ত ‘বড় সাহেবের’ হাতে থাকা নিঃশেষ হয়ে আসা চুরুটটি পরের ফ্রেমে হঠাত বড় হয়ে যায়! এসব ছোটখাটো বিষয় হয়ত বড় বাজেটের বড় যজ্ঞের এই ফিল্মে খেয়াল করার মতো নয়! তবে পুরো চলচ্চিত্রেই আবহ সঙ্গীতের কাজ ভাল মনে হয়েছে। বিদ্যা সিনহা মিমও সুন্দরী আবেদনময়ী বাইজি হিসেবে ভাল অভিনয় করেছে। আবেগঘন দৃশ্যগুলোতেও তার অভিনয় ভাল ছিল তবে চলচ্চিত্রের সার্বিক গঠন, গল্প অগ্রসরের ধরন ও বুননে সেই আবেগঘন দৃশ্যগুলো হয়ত ওই অনুভূতিটা দর্শকের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে সঞ্চারের ক্ষেত্রে ব্যর্থ থেকেছে। তবে তন্ময় তানসেনের সাহস অবশ্যই বিবেচনা করার মতো। তিনি অন্তত চেষ্টা করেছেন পদ্মপাতার জল যেন কচুপাতার জল হয়ে না যায়। সেটা তার চলচ্চিত্র দেখলে অন্তত সেই প্রচেষ্টা উপলব্ধি করা যায়। দর্শকদের ভিন্ন স্বাদ প্রদানে তার এই সাহসী পদক্ষেপ অবশ্যই প্রশংসনীয়।