১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিটিভির ঈদ আনন্দমেলা ॥ বিমুগ্ধ দর্শক

  • সমুদ্র হক

‘নয়নের দৃষ্টি হতে ঘুচবে কালো, যেখানে পড়বে সেথায় দেখবে আলো..... আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে...’। ২৪ বছর পর আবেদ খানের উপস্থাপনায় এবারের ঈদের আনন্দমেলা অনুষ্ঠান দেখে কবিগুরুর গানের সুরটি ভেসে আসে। এই আনন্দমেলা উপভোগ করে দর্শকশ্রোতার সরাসরি মন্তব্য, ‘বিটিভি ফুরিয়ে যায়নি’। সৃষ্টিশীল মেধার ছোঁয়ায় এখনও যে প্রাণবন্ত অনুষ্ঠান উপহার দেয়া যায় এবং দর্শক রিমোটের সুইচ ওভার না করে একটানা অনুষ্ঠান দেখে তার বড় প্রমাণ এবারের আনন্দ মেলা। আয়োজনে মঞ্চের বর্নিল ডিজাইন ও ক্যামেরায় স্পেশাল এফেক্টে শিবলী ও নীপা জুটির সপ্তবর্ণা নাচটি ছিল এক কথায় অসাধারণ যা আগে কখনও এভাবে উপস্থাপিত হয়নি। দুটি গানের মিশ্রণে অতি আকর্ষণীয় কোরিওগ্রাফি এবং সঙ্গীতের তালে নাচের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে গানের ভেতরের অংশ ‘নয়নের দৃষ্টি হতে ঘুচবে আলো ,যেখানে পড়বে সেথায় দেখবে আলো..... কথাগুলো যেন বহুদিন পর বিটিভির প্রাণ ফিরে পাওয়ার কথাগুলোই বলে। অনুষ্ঠানে কথিত আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহন কথা বললে কেমন শোনাত, এই পর্বটি মানুষের চেতনার জায়গাটিতে নাড়া দিয়েছে। ঢাকা মহানগরীতে (বর্তমানে সকল নগর মহানগর ও শহরে) বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার সম্পর্ক, রিকশাভাড়ার দৌরাত্ম্য সম্পর্কে সকলেই অবগত। এমন একটি পর্বে এ্যাঙ্কর আবেদ খান ‘যদি এমন হতো’ বলে ফজলুর রহমান বাবুকে দিয়ে পর্ব শুরু করার পর দর্শকরাও বলল ইস যদি এমন হতো...। নিত্যপণ্য কিনতে গিয়ে সহনশীল দাম ও ভেজালমুক্ত থাকার বিষয়টি পজিটিভ সেন্সে নেয়ার পর্বটি মানবিক দিককে জাগিয়ে তুলেছে। এখানেও দর্শক বলেছে, সকল ব্যবসায়ী এমন হলে কতই না ভাল হতো। এতেই বোঝা যায় দর্শকশ্রোতা আনন্দমেলা কিভাবে নিয়েছে। একটা সময় ড. সানজিদা আখতার আনন্দমেলা উপস্থাপনা করেছেন। আবেদ খান ও সানজিদা আখতার জুটিবদ্ধ হয়েও আনন্দমেলা উপস্থাপনা করেছেন। এবারের একটি পর্বে সানজিদা আখতারও ছিলেন। সফল উপস্থাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে নিয়ে একটি পর্বে সানজিদা আখতার অনেক আগের একটি অনুষ্ঠানে পেছনের দিকে হাঁটলে কেমন হয় তার ছোট্ট ক্লিপিং (রিক্যাপ) দেখালেন। দর্শকরা অভিভূত হয়ে বলেছে, পুরোটাই দেখালে ভাল হতো। মানুষের ভাল কে কিভাবে দেখে, নিজে না বুঝে বন্ধুর কথা শুনলে কী হয়Ñ গাড়ি কেনার এই পর্বটি ছিল আকর্ষণীয়। গাড়ি কেনার পর বন্ধু যখন সন্দেহ ঢুকিয়ে দিয়ে বলে ড্রাইভার অনেক কিছু চেঞ্জ করে পাল্টে ফেলে তখন চলন্ত অবস্থায় বন্ধু ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করে কিছু চেঞ্জ করেছে কি না। ড্রাইভার উত্তর এইমাত্র গিয়ার চেঞ্জ করেছে। বন্ধু ক্ষেপে গিয়ে বলে কার হুকুমে গিয়ার চেঞ্জ করেছে। যারা মূর্খ ও উঠতি ধনী গাড়ি কিনেছে, তাদের প্রতি কতটা চপেটাঘাট পর্বটি তাই বুঝিয়ে দিয়েছে। একদার ‘এখনই’ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের উপস্থাপক আনিসুল হক (বর্তমান ঢাকা সিটি উত্তরের মেয়র) একটি পর্বে বললেন, দুটি ছোট্ট কথা- ১. স্ত্রী স্বামীকে ভালো মানুষ বলে না। স্বামী যখন নির্বাচনে প্রার্থী হন তখন স্ত্রী ভোট চাইবার সময় বলে ‘ভাল মানুষটিকে ভোট দেবেন’। ২. আনিসুল হক মেয়র হওয়ার পর একদিন রাত সাড়ে ১২টায় ফোনে এক নগরবাসী পথে গাড়ি চাপা পড়া মৃত কুকুরকে দ্রুত সরিয়ে নেয়ার কথা বললে বিপাকে পড়ে যান। ৪৫ মিনিট পর পুনরায় একটি এসএমএস আসে মেয়রকে ধন্যবাদ দ্রুত কাজ করার জন্য। আনিসুল হক কিছুই না বুঝে পরে জানতে পারেন দুই কোরিয়ান দ্রুত কুকুরটি সরিয়ে নিয়ে গেছে। বিষয়টি উত্তরাঞ্চলের বগুড়ার দর্শকশ্রোতারা খুব ভাল উপভোগ করেছে। কারণ এই অঞ্চলে ৮০-এর দশকের শেষে কোরয়িানরা বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে মহাসড়ক ও যমুনায় হার্ড পয়েন্টে নির্মাণের সময় এই দৃশ্য তারা দেখেছে। বর্তমানের বিভিন্ন চ্যানেলে ‘টকশো’ নামে যা প্রচারিত হচ্ছে, তা নিয়ে একটি স্যাটায়ার পর্ব ছিল অনবদ্য পরিবেশনা। আবেদ খান বললেন, ‘টকশো, নাটকশো (না টক শো)...’ পর্বে টকশোওয়ালাদের মেধার যা কীর্তি বর্ণিত হলো তাতে কয়েক দর্শকের উপলব্ধি-জনসম্মুখে থাপ্পড় খেয়ে কেউ যদি বলে, যাক বেশি জোর চড় মারেনি তাদের কি বলা যায়! অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী ও তিশার পর্বটিতে ছিল বাস্তবতার ছোঁয়া। অনেক দিন পর ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে জুয়েল আইচকে দেখা দেল। তিনিও একসময় আনন্দমেলা উপস্থাপনা করেছেন। ফেরদৌস ও জয়া আহসানের পর্বটি আরও ভাল হতে পারতো। তবুও ভাল। বাপ্পা মজুমদার, কুমার বিশ্বজিতের পোশাকের সঙ্গে গান বেশ মানানসই ছিল। কুমার বিশ্বজিতের ‘কাউ বয় থেকে রাখাল বয়’ কথাটি অনেকের মনে ধরেছে। মঞ্চে নচিকেতা ঘোষের উপস্থিতি দেখে এবং পরিচিতিতে আবেদ খান যখন বললেন, নচিকেতা ভারতের হলেও ওর বাড়ি বরিশালে তখন মনে হয়েছে- আরে ও তো আমাদের পাশের বাড়ির ছেলে। নচিকেতার গান যে মানুষের হৃদয়ের কোন জায়গাটিতে বিঁধে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রতিবার ঈদে দেশের প্রায় ২৯টি চ্যানেল কতই না অনুষ্ঠান সাজায়। একটা সময় টিভির সাদাকালো যুগে বিটিভি যে অনুষ্ঠান পরিবেশন করেছে, তার বেশিরভাগই দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়েছে। বিশেষ করে বিটিভির ঈদের আয়োজনে ঈদের বিশেষ নাটকের চেয়েও আকর্ষণীয় ছিল আনন্দমেলা। ঈদে হুমায়ূন আহমেদের বিশেষ নাটক প্রচার শুরু হলে নাটকের সঙ্গে জনপ্রিয়তায় যোগ দেয় আনন্দমেলা। গত শতকের ১৯৮৪ সালে আবেদ খান আনন্দমেলা উপস্থাপনা করেন। জনপ্রিয়তার ধারায় ১৯৮৬ সালে ও ১৯৯১ সালে আবেদ খান ও সানজিদা আখতার পর্যায়ক্রমে একক ও জুটিবদ্ধ হয়ে আনন্দমেলা উপহার দেন। দুই যুগ পর আবেদ খান যে আনন্দমেলা উপহার দিলেন, তা দেখে দর্শকরা বলতে শুরু করেছে আমাদের মেধা ফুরিয়ে যায়নি। হানিফ সংকেত তার ইত্যাদি অনুষ্ঠান এবং বর্তমানে সানজিদা আখতার পুনরায় বর্ণালী অনুষ্ঠান বিটিভিতে শুরু করে বিটিভির স্বর্ণযুগকে বিছুটা হলেও ধরে রেখেছে। আবেদ খান, সানজিদা আখতার, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, জুয়েল আইচ, আনিসুল হক, আসাদুজ্জামান নূর, পিযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়, আফরোজা বানু, রাইসুল ইসলাম আসাদ, জহির উদ্দিন পিয়ার, আফজাল হোসেন, সুবর্ণা মুস্তফা এখনও মাঠে নামলে পুরানো দর্শক ও বর্তমান প্রজন্ম উন্নতমানের অনেক ভাল অনুষ্ঠান দেখতে পারবেন।

ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর আগ্রাসন দূর করতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) এখনই সময় সেই সোনালি যুগকে ধরে রাখতে মেধাগুলোকে টেনে আনা। পার্শ¦বর্তী দেশ ভারতের টিভি চ্যানেলগুলো সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতার অঙ্গনের প্রতিভাবান সৃষ্টিশীল প্রবীণদের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক হিসেবে রেখে দেয়। তারা অনেক ভাবনা-চিন্তা করে সৃষ্টিশীল অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা দেন। এসব অনুষ্ঠান শুরুর আগে ও পরে দর্শক জরিপ করা হয়। কোন অনুষ্ঠান গ্রান্ড ফিনালে (শেষের পর পুনরায় শুরু) হবে, কোন অনুষ্ঠান ডিলিট হয়ে নতুন ক্রিয়েটিভ অনুষ্ঠান শুরু হবে তা নির্ণয় করে থিঙ্ক ট্যাঙ্ক। আমাদের দেশেও সে ব্যবস্থা করা যায়। আমাদেরও রয়েছে অনেক মেধা। অনেক নক্ষত্রের সমন্বয়ে যেমন ছায়াপথ বা মিল্কিওয়ে আকাশে আছে, আমাদের দেশের নক্ষত্রসম মেধাগুলোকে নিয়ে আরও অনেক নক্ষত্র খুঁজে আনতে পারে। তার বড় প্রমাণ দিল বিটিভিতে এবারের ঈদের আনন্দমেলা। জয়তু আবেদ খান, জয়তু বিটিভির আনন্দমেলা।